মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠাৎ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা বিশ্বকে আপাত স্বস্তি দিলেও, এই স্বস্তির ভিত যে কতটা নড়বড়ে, তা বোঝা কঠিন নয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই যেখানে সমগ্র ইরানি সভ্যতাকে লক্ষ্য করে প্রলয়ঙ্করী হুমকি দেওয়া হয়েছিল, সেখানে আচমকা শান্তির বার্তা নিঃসন্দেহে এক পুরনো কূটনৈতিক কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি। ফলে প্রশ্ন উঠছে— এ কি প্রকৃত শান্তির সূচনা, নাকি কেবলমাত্র সাময়িক বিরতি?
গত চল্লিশ দিনের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে যে গভীর সমস্যার মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতির এই যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির শিরায় শিরায় অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। তেলের দাম, সরবরাহ শৃঙ্খল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য— সবকিছুতেই অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তির নিশ্বাস এনে দিয়েছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের অভাবে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তার সামরিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতার প্রদর্শন ঘটাতে পেরেছে। আকাশপথে আধিপত্য কিংবা ইরানের মাটিতে দুঃসাহসিক অভিযান, সবই শক্তির প্রকাশ। কিন্তু এই শক্তি প্রদর্শনের আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা হল— এটি এক অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ, যেখানে ইরান পরাজিত হয়নি। বরং তার স্থিতিস্থাপকতা এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ইরান শুধু প্রতিরোধেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সে একাধিক আরব দেশকে সংঘাতে টেনে এনে তাদের তেল অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। এর ফলে পশ্চিম এশিয়ার তথাকথিত নিরাপদ অঞ্চলগুলিও আর নিরাপদ রইল না। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি বদলেছে— এটি আর শুধু সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপের এক জটিল সমন্বয়।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার। যে ব্যবস্থায় অবাধ বাণিজ্য ও পণ্যের চলাচল ছিল তুলনামূলকভাবে নির্বিঘ্ন, তা ভেঙে পড়েছে ইরানের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের ফলে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে এক বড় ধাক্কা দেয়। এই কৌশলগত পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, অসম লড়াইয়েও কৌশলগত অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা স্পষ্ট। বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে তার স্থিতিশীলতা এবং বিচক্ষণতার উপর প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের চোখে এই নেতৃত্ব এখন একরকম আবেগপ্রবণ ও অনির্দেশ্য সিদ্ধান্তের প্রতিচ্ছবি, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।
এই প্রেক্ষাপটে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকাও কম বিতর্কিত নয়। লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতার বাইরে রাখার ইজরায়েলি অবস্থান ভবিষ্যতের শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ফলে এই সংঘাত যে সহজে মীমাংসার পথে যাবে না, তা অনুমান করা কঠিন নয়।ভারতের অবস্থানও এখানে উল্লেখযোগ্য। ‘কৌশলগত নিরপেক্ষতা’ বজায় রেখে ভারত হয়তো সংঘাতে সরাসরি জড়ায়নি, কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার প্রভাব কিছুটা কমেছে বলেই মনে হচ্ছে। বিপরীতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসে কূটনৈতিক চমক সৃষ্টি করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার
ভূ-রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।ইরানের অবস্থানও নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। এই সংঘাতের পর সে নিজেকে এক বিশ্বশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন ও রাশিয়ার সমকক্ষ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের প্রচেষ্টাও সেই দিকেই ইঙ্গিত করে।
তবে এই সমস্ত কৌশল ও শক্তির প্রদর্শনের মাঝখানে যে বাস্তবতা উপেক্ষিত হচ্ছে, তা হল সাধারণ মানুষের জীবন। ইরানের জনগণ এখনও একটি ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অধীনে, যেখানে স্বাধীনতার পরিসর সীমিত। কিন্তু সেই বাস্তবতা পরিবর্তনের দায় কি বাইরের শক্তির? এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধবিরতি যতই স্বস্তিদায়ক হোক, প্রকৃত শান্তির পথ এখনও বহু দূর। আমেরিকা যদি তার প্রযুক্তিগত আধিপত্যের প্রদর্শন থেকে সরে এসে বাস্তবসম্মত সমঝোতার পথে না হাঁটে এবং ইজরায়েলকে সংযত না করে, তবে এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে। বিশ্বকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন সংলাপ, সহনশীলতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব— শুধু শক্তির প্রদর্শন নয়।