ডিজিটাল পর্দার আড়ালে কুৎসিত বাণিজ্য: এআই-অ্যাপের ভয়ংকর কারসাজি

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে মানব সভ্যতার নতুন সোপান হিসেবে উদযাপন করছি, ঠিক তখনই এর একটি কুৎসিত এবং অন্ধকার দিক আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। যে প্রযুক্তি দিয়ে জটিল রোগ নির্ণয় কিংবা মহাকাশ গবেষণা সহজ হচ্ছে, সেই একই প্রযুক্তির অপব্যবহারে আজ বিপন্ন হচ্ছে নারীর সম্মান এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। সম্প্রতি ‘টেক ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্ট’ (TTP)-এর একটি গবেষণা বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রযুক্তির নৈতিকতা নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের মধ্যে টেক ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্ট ( TTP) বর্তমানে অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি নাম। এটি আমেরিকার একটি ইনভেস্টিগেটিভ গ্রুপ, যারা প্রযুক্তির অপব্যবহার ধরিয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের ডিজিটাল অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করে। সেখানে দেখা গেছে, অ্যাপল এবং গুগলের মতো বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্মে এমন শতাধিক অ্যাপ বুক ফুলিয়ে ব্যবসা করছে, যার মূল কাজই হলো সাধারণ নারীর ছবি থেকে কৃত্রিম উপায়ে পোশাক সরিয়ে ফেলা বা নগ্নতা তৈরি করা। প্রযুক্তির এই ‘ব্লাইন্ড স্পট’ আজ এক বৈশ্বিক সংকটের রূপ নিয়েছে।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধুমাত্র গুগল প্লে স্টোর এবং অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে এ ধরনের প্রায় ১০২টি অ্যাপ পাওয়া গেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অ্যাপগুলো এ পর্যন্ত ৭০ কোটি ৫০ লক্ষ বারের বেশি ডাউনলোড করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে ডেভেলপাররা আয় করেছে প্রায় ১০০০ কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ, নারীর সম্মানকে পণ্য বানিয়ে একটি বিশাল কালোবাজারি ব্যবসা গড়ে উঠেছে খোদ মূলধারার প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর নাকের ডগায়।


যেখানে একটি সাধারণ গেম বা শিক্ষামূলক অ্যাপের জন্য কঠোর যাচাই-প্রক্রিয়া পার হতে হয়, সেখানে এই ‘undressing’ অ্যাপগুলো কীভাবে বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের নাগালে থাকে, সেই প্রশ্নটিই এখন প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অ্যাপগুলো মূলত ‘জেনারেটিভ এআই’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এটি এমন এক পদ্ধতি যেখানে এআই-কে কোটি কোটি ছবির ডাটাবেস দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

একজন ব্যবহারকারী যখন কোনও নারীর একটি সাধারণ বা মার্জিত পোশাক পরা ছবি এই অ্যাপে আপলোড করেন এবং একটি সাধারণ কমান্ড দেন, তখন এআই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই ছবির পোশাকের জায়গায় কৃত্রিম ত্বক বা নগ্ন অবয়ব বসিয়ে দেয়। একে বলা হচ্ছে ‘নন-কনসেনসুয়াল সেক্সুয়ালাইজড ইমেজ’ বা বিনা সম্মতিতে তৈরি করা যৌন উত্তেজক ছবি। এর ভয়াবহ দিকটি হলো, এর জন্য কোনো উচ্চতর কারিগরি জ্ঞান লাগে না; সাধারণ একটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী যে কেউ কয়েক ক্লিকেই এই অপরাধটি করতে পারছেন।

সবচেয়ে ভয়ের জায়গা হলো এই অ্যাপগুলোর রেটিং এবং সহজলভ্যতা। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু জনপ্রিয় অ্যাপ গুগল প্লে স্টোরে ১৩+ এবং অ্যাপল স্টোরে মাত্র ৯+ রেটিং নিয়ে দিব্যি চলছে। অর্থাৎ, একটি ৯ বছরের শিশুর হাতে থাকা ফোনেও এই বিকৃত রুচির অ্যাপটি থাকার আইনি বৈধতা পাচ্ছে। যদিও এই অ্যাপগুলোর নীতিমালায় বলা থাকে যে তারা অশালীন কন্টেন্ট সমর্থন করে না, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর ফিল্টার বা মর্ডারেশন সিস্টেম কাজ করছে না। তদন্তে দেখা গেছে, যখন একটি এআই-কে কোনো নারীর পোশাক সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি শুধু অপরাধ নয়, এটি একটি প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চরম আঘাত।

এই সংকটের আঁচ লেগেছে খোদ সিলিকন ভ্যালিতেও। ইলন মাস্কের প্ল্যাটফর্ম ‘X’-এর চ্যাটবট ‘Grok’ ব্যবহার করে যখন সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে সাধারণ স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের বিকৃত ছবি তৈরি করা শুরু হলো, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আমেরিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নড়েচড়ে বসে। ব্রিটেন, ক্যালিফোর্নিয়া এবং ইইউ-এর পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হলেও আইনি জটিলতা অনেক। কারণ, প্রযুক্তির গতি যে হারে বাড়ছে, আইন সেই হারে আধুনিক হতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, কারণ এই ছবিগুলো কোনো স্টুডিওতে তৈরি নয়, বরং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সৃষ্ট এক ধরনের ডিপফেক ।

নারীর প্রতি অবমাননার এই নতুন রূপটি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। এই অ্যাপগুলো মূলত এশীয় এবং কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ছবিকে বেশি লক্ষ্যবস্তু করছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এটি বর্ণবাদ এবং লিঙ্গবৈষম্যের এক নতুন মিশেল। যখন একজন নারী জানবেন যে ইন্টারনেটে তার যেকোনো ছবি যে কেউ বিকৃত করতে পারে, তখন তার ডিজিটাল স্বাধীনতা সংকুচিত হতে বাধ্য। এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করছে এবং সুস্থ বিনোদনের আড়ালে এক বিকৃত রুচিকে উৎসাহিত করছে।

এআই-প্রযুক্তির এই ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্তির পথটি সহজ নয়, তবে সুনির্দিষ্ট এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে এই ডিজিটাল অরাজকতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সমাজ— এই তিন পক্ষকেই সমানভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রথমত, টেক জায়ান্ট বা প্রযুক্তি জায়ান্টদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অ্যাপল এবং গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে কোটি কোটি ডলার আয় করলেও ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা এখনো যথেষ্ট উদাসীন।

কোনও অঘটন ঘটার পর বা অভিযোগ পাওয়ার পর অ্যাপ সরিয়ে নেওয়া কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। বরং, প্রতিটি অ্যাপ স্টোরে উন্মুক্ত করার আগেই উন্নত এআই-ভিত্তিক ‘প্রো-অ্যাক্টিভ স্ক্রিনিং’ বা আগাম যাচাইকরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রযুক্তির মাধ্যমেই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করতে হবে, যাতে কোনো ক্ষতিকর অ্যালগরিদম সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছানোর আগেই আটকে যায়।

​দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন কঠোর আইনি কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়। প্রযুক্তির বিবর্তন যে গতিতে ঘটছে, প্রচলিত আইন তার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনগুলোকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আধুনিকায়ন করতে হবে এবং এআই-ঘটিত অপরাধকে সুনির্দিষ্টভাবে এর আওতায় আনতে হবে। যেহেতু ইন্টারনেটের কোনও ভৌগোলিক সীমানা নেই, তাই অপরাধীরা এক দেশে বসে অন্য দেশের নাগরিকের ক্ষতি করছে। এই ‘ডিজিটাল মরীচিকা’ বা দৃশ্যমান প্রতারণা রুখতে দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং সাইবার অপরাধীদের হস্তান্তরের বিষয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চুক্তি থাকা প্রয়োজন। আইনি কঠোরতা নিশ্চিত না হলে এই প্রযুক্তিগত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে।

​সর্বোপরি, এই লড়াইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলো সচেতনতা ও নৈতিক শিক্ষা। কোনো আইন বা প্রযুক্তিই কার্যকর হবে না যদি না সাধারণ মানুষ এর কুফল সম্পর্কে সচেতন হয়। আমাদের বুঝতে হবে যে, ডিজিটাল স্বাধীনতার অর্থ অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা মর্যাদা হরণ করা নয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত করতে হবে। তাই প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ডিজিটাল এথিক্স’ বা ডিজিটাল নৈতিকতা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এখন অপরিহার্য। যখন সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা গড়ে উঠবে এবং মানুষ এই ধরণের বিকৃত রুচির অ্যাপ বা কন্টেন্টকে সামাজিকভাবে বয়কট করবে, তখনই কেবল প্রযুক্তির এই অন্ধকার থাবা থেকে আমরা মুক্তি পেতে পারি।