শিক্ষা কোনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক সদিচ্ছা ও অংশগ্রহণের এক যৌথ দলিল। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে শুধু সরকারি পরিকাঠামো বা বরাদ্দের উপর ভরসা করে শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান রাতারাতি বাড়ানো কঠিন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই কেন্দ্রীয় স্তরে আনা হয়েছিল ‘বিদ্যাঞ্জলি’ প্রকল্প। নতুন সরকারের জমানায় এই প্রকল্পটিকে দেশজুড়ে আরোও বেশি করে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ওঠে— পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান স্কুলশিক্ষার মানচিত্র; আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় এই প্রকল্প কতটা সময়োপযোগী? আর এর কার্যকারিতাই বা ঠিক কতখানি?
সহজ কথায় ‘বিদ্যাঞ্জলি’ হল এমন একটি মঞ্চ যা সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে বিদ্যালয়ের আঙিনায় টেনে আনে। এখানে কোনও আর্থিক অনুদানের কথা বলা হচ্ছে না। বরং সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তি— যেমন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, সরকারি বা বেসরকারি চাকুরিজীবী, প্রবাসী ভারতীয়, বৈজ্ঞানিক, খেলোয়াড় বা স্বনামধন্য শিল্পীরা যদি কোনও সরকারি বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের পাশে দাঁড়াতে চান, তবে তাঁরা সরাসরি তা করতে পারেন। তাঁরা তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা কিংবা কোনও বস্তুগত সাহায্য (যেমন বই, কম্পিউটার, খেলার সরঞ্জাম) সরাসরি নির্দিষ্ট বিদ্যালয়কে দিতে পারেন। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ সালের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ‘কমিউনিটি পার্টনারশিপ’ বা সামাজিক অংশীদারিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই এই উদ্যোগ।
পশ্চিমবঙ্গের স্কুল শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে বোঝা যাবে, এই প্রকল্প কেন এই মুহূর্তে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—
রাজ্যের বহু প্রত্যন্ত এলাকার প্রাথমিক বা উচ্চ- প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষকের অভাব একটি বড় সমস্যা। বহু স্কুল চলছে মাত্র একজন বা দু’জন শিক্ষক দিয়ে। এমন অবস্থায় যদি এলাকার কোনও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বা শিক্ষিত যুবক-যুবতী ‘বিদ্যাঞ্জলি’ পোর্টালের মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য স্বেচ্ছায় শিক্ষকতা করতে এগিয়ে আসেন, তবে তা ধুঁকতে থাকা স্কুলগুলোর জন্য লাইফ-লাইন হয়ে উঠতে পারে।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা অনেকাংশে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। স্মার্ট ক্লাসরুম, কম্পিউটার ল্যাব বা উন্নত প্রজেক্টর আজকের শিক্ষার অন্যতম অঙ্গ। সরকারি স্তরে ‘আইসিটি স্কুল’ প্রকল্প থাকলেও সব স্কুলে তার সুফল পৌঁছায়নি। সমাজের কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা কর্পোরেট সংস্থা (CSR ফান্ডের মাধ্যমে) যদি কোনও গ্রামীণ স্কুলে কম্পিউটার বা প্রজেক্টর দান করেন, তবে প্রান্তিক শিক্ষার্থীরাও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পাবে।
নতুন শিক্ষানীতিতে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই বৃত্তিমূলক বা ভোকেশনাল শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। আমাদের রাজ্যের বিদ্যালয়গুলিতে প্রথাগত সিলেবাসের বাইরে কোডিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, মাটির কাজ বা স্থানীয় কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো পরিকাঠামো কম। ‘বিদ্যাঞ্জলি’ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় স্তরের দক্ষ কারিগর বা প্রযুক্তিবিদরা স্কুলে এসে ছাত্র-ছাত্রীদের বাস্তবমুখী কাজ শেখাতে পারেন, যা ভবিষ্যতে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবে।
রাজ্যের বাজেটে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ থাকলেও, পরিকাঠামো উন্নয়নের বিপুল চাহিদার তুলনায় তা অনেক সময়ই কম পড়ে। বেঞ্চ মেরামত, শৌচাগারের আধুনিকীকরণ বা লাইব্রেরীর বই কেনার মতো ছোট কিন্তু জরুরী কাজে বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্পের মাধ্যমে আসা অ- আর্থিক বস্তুগত সাহায্য অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
কাগজে-কলমে এই প্রকল্প যতটা আকর্ষণীয়, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে এর সফল বাস্তবায়ন কিন্তু বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কার্যকারিতার নিরিখে বিচার করলে কয়েকটা দিক বিশেষভাবে উঠে আসে।
ইতিবাচক দিক বা সম্ভাবনার ক্ষেত্রে— ১. জন- অংশগ্রহণ: প্রাক্তনীদের স্কুলের সঙ্গে আবার যুক্ত হওয়ার সহজ সুযোগ। ২. বৈচিত্র্যময় পাঠ: বাইরের জগতের সফল মানুষদের অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপ্রেরণা। ৩. পরিকাঠামো বৃদ্ধি: বাজেট বহির্ভূত উপায়ে স্কুলের বৈষয়িক উন্নতি।
নেতিবাচক দিক বা চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে: ১. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: পোর্টাল রেজিস্ট্রেশন ও অনুমতি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। ২. সমন্বয়ের অভাব: বিদ্যালয় পরিদর্শক এবং প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে প্রকল্প নিয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাব। ৩. রাজনৈতিক ছায়া: বিদ্যালয় পরিচালন সমিতিতে রাজনীতির প্রভাবের কারণে বহিরাগতদের প্রবেশে দ্বিধা।
পশ্চিমবঙ্গের বহু বিদ্যালয়েরই নিজস্ব গৌরবোজ্জল ইতিহাস ও প্রাক্তন ছাত্র-সংসদ রয়েছে। কলকাতার একাধিক নামী স্কুল থেকে শুরু করে মফস্বলের শতাব্দী প্রাচীন স্কুলগুলোর প্রাক্তনীরা বিদ্যাঞ্জলির ছাতার তলায় এসে নিজেদের স্কুলের রূপান্তর ঘটাতে পারেন। কিন্তু বাস্তব বলছে, গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া জেলাগুলিতে যেমন (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া বা উত্তরবঙ্গের কিছু অংশ) যেখানে শিক্ষিত বা সচ্ছল মানুষের সংখ্যা এমনিতেই কম, সেখানে এই স্বেচ্ছাসেবী খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। ফলে এই প্রকল্প শহর ও গ্রামের স্কুলের মধ্যেকার বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে কিছুটা আলাদা। তাই এখানে এর কার্যকারিতা বাড়াতে হলে কয়েকটি কাঁটা উপড়ে ফেলা দরকার—
১. সরকারি নিয়ন্ত্রণ বনাম স্বায়ত্তশাসন:
শিক্ষাক্ষেত্রে যে কোনও কেন্দ্রীয় বা বহিরাগত হস্তক্ষেপকে রাজ্যের প্রায়শই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ‘বিদ্যাঞ্জলি’ যাতে কোনোভাবেই বিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনে আঘাত না করে এবং কোনও বিশেষ রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতাদর্শের প্রচারের চারণভূমি না হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করা জরুরী। স্বেচ্ছাসেবী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কড়া স্ক্রীনিং বা যাচাইকরণ দরকার।
২. পরিকাঠামোর অপব্যবহারের ভয়:
অনেক সময় দেখা যায়, বাইরে থেকে কেউ এসে সাহায্য করতে চাইলে বিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতি বা স্থানীয় স্তরে অসহযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। এই ‘ইগো’ বা প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ‘বিদ্যাঞ্জলি’ শুধু একটি অকেজো পোর্টাল হয়েই থেকে যাবে।
পথের দিশা: কি করা উচিত?
নতুন সরকারের জমানায় এই প্রকল্পকে যদি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয় গুলিতে সফল ও ফলপ্রসূ করে তুলতে হয়. তবে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন— ১. রাজ্য ও কেন্দ্রের যৌথ সমন্বয়: শিক্ষা যেহেতু যৌথ তালিকাভুক্ত বিষয়, তাই কেন্দ্রীয় প্রকল্পের গাইডলাইন মেনেও রাজ্য শিক্ষাদপ্তর নিজস্ব উপায়ে এর তদারকি করতে পারে। বাংলা পোর্টাল তৈরি করে স্থানীয় ভাষায় প্রচার বাড়ানো দরকার।
২. প্রধান শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন: কোনও স্কুলে কী প্রয়োজন (শিক্ষক নাকি ব্ল্যাকবোর্ড); তা সবচেয়ে ভালো জানেন সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বিদ্যাঞ্জলি পোর্টালে রিকোয়েস্ট বা চাহিদা আপলোড করার প্রক্রিয়াটাকে একদম সহজ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করতে হবে। ৩. স্বেচ্ছাসেবীদের স্বীকৃতি: যাঁরা নিজের সময় ও মেধা দিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের সাহায্য করছেন, তাদের ব্লক বা জেলাস্তরে করে সরকারি শংসাপত্র বা সম্মাননা দেওয়া উচিত। এতে সমাজের অন্য মানুষেরাও উৎসাহিত হবেন।
‘বিদ্যাঞ্জলি’ কোনও জাদুদণ্ড নয় যে, সরকারি খামতি রাতারাতি দূর করে দেবে। একে দেখতে হবে সরকারের পরিপূরক শক্তি হিসাবে। সরকার তার নিজের দায়িত্ব পালন করবে— শিক্ষক নিয়োগ করবে; মিড- ডে মিল দেবে; বই দেবে। কিন্তু শিক্ষার মানকে যদি আরোও একধাপ ওপরে নিয়ে যেতে হয়, তবে সমাজের সফল এবং সংবেদনশীল নাগরিকদের এগিয়ে আসতেই হবে। পশ্চিমবঙ্গের মতো শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থানে যেখানে ‘পাড়ার লাইব্রেরি’ বা ‘নৈশ বিদ্যালয়ের’ এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল, সেখানে ‘বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প’ আসলে সেই পুরনো সামাজিক দায়বদ্ধতা কেই নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার সুযোগ। নতুন সরকারের এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক চশমা সরিয়ে রেখে যদি সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে বাংলার পিছিয়ে পড়া সরকারি স্কুলগুলোর ছাত্রছাত্রীদের সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে
সহজ কথায় ‘বিদ্যাঞ্জলি’ হল এমন একটি মঞ্চ যা সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে বিদ্যালয়ের আঙিনায় টেনে আনে। এখানে কোনও আর্থিক অনুদানের কথা বলা হচ্ছে না। বরং সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তি— যেমন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, সরকারি বা বেসরকারি চাকুরিজীবী, প্রবাসী ভারতীয়, বৈজ্ঞানিক, খেলোয়াড় বা স্বনামধন্য শিল্পীরা যদি কোনও সরকারি বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের পাশে দাঁড়াতে চান, তবে তাঁরা সরাসরি তা করতে পারেন। তাঁরা তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা কিংবা কোনও বস্তুগত সাহায্য (যেমন বই, কম্পিউটার, খেলার সরঞ্জাম) সরাসরি নির্দিষ্ট বিদ্যালয়কে দিতে পারেন। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ সালের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ‘কমিউনিটি পার্টনারশিপ’ বা সামাজিক অংশীদারিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই এই উদ্যোগ।
পশ্চিমবঙ্গের স্কুল শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে বোঝা যাবে, এই প্রকল্প কেন এই মুহূর্তে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—
রাজ্যের বহু প্রত্যন্ত এলাকার প্রাথমিক বা উচ্চ- প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষকের অভাব একটি বড় সমস্যা। বহু স্কুল চলছে মাত্র একজন বা দু’জন শিক্ষক দিয়ে। এমন অবস্থায় যদি এলাকার কোনও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বা শিক্ষিত যুবক-যুবতী ‘বিদ্যাঞ্জলি’ পোর্টালের মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য স্বেচ্ছায় শিক্ষকতা করতে এগিয়ে আসেন, তবে তা ধুঁকতে থাকা স্কুলগুলোর জন্য লাইফ-লাইন হয়ে উঠতে পারে।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা অনেকাংশে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। স্মার্ট ক্লাসরুম, কম্পিউটার ল্যাব বা উন্নত প্রজেক্টর আজকের শিক্ষার অন্যতম অঙ্গ। সরকারি স্তরে ‘আইসিটি স্কুল’ প্রকল্প থাকলেও সব স্কুলে তার সুফল পৌঁছায়নি। সমাজের কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা কর্পোরেট সংস্থা (CSR ফান্ডের মাধ্যমে) যদি কোনও গ্রামীণ স্কুলে কম্পিউটার বা প্রজেক্টর দান করেন, তবে প্রান্তিক শিক্ষার্থীরাও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পাবে।
নতুন শিক্ষানীতিতে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই বৃত্তিমূলক বা ভোকেশনাল শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। আমাদের রাজ্যের বিদ্যালয়গুলিতে প্রথাগত সিলেবাসের বাইরে কোডিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, মাটির কাজ বা স্থানীয় কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো পরিকাঠামো কম। ‘বিদ্যাঞ্জলি’ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় স্তরের দক্ষ কারিগর বা প্রযুক্তিবিদরা স্কুলে এসে ছাত্র-ছাত্রীদের বাস্তবমুখী কাজ শেখাতে পারেন, যা ভবিষ্যতে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবে।
রাজ্যের বাজেটে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ থাকলেও, পরিকাঠামো উন্নয়নের বিপুল চাহিদার তুলনায় তা অনেক সময়ই কম পড়ে। বেঞ্চ মেরামত, শৌচাগারের আধুনিকীকরণ বা লাইব্রেরীর বই কেনার মতো ছোট কিন্তু জরুরী কাজে বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্পের মাধ্যমে আসা অ- আর্থিক বস্তুগত সাহায্য অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
কাগজে-কলমে এই প্রকল্প যতটা আকর্ষণীয়, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে এর সফল বাস্তবায়ন কিন্তু বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কার্যকারিতার নিরিখে বিচার করলে কয়েকটা দিক বিশেষভাবে উঠে আসে।
ইতিবাচক দিক বা সম্ভাবনার ক্ষেত্রে— ১. জন- অংশগ্রহণ: প্রাক্তনীদের স্কুলের সঙ্গে আবার যুক্ত হওয়ার সহজ সুযোগ। ২. বৈচিত্র্যময় পাঠ: বাইরের জগতের সফল মানুষদের অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপ্রেরণা। ৩. পরিকাঠামো বৃদ্ধি: বাজেট বহির্ভূত উপায়ে স্কুলের বৈষয়িক উন্নতি।
নেতিবাচক দিক বা চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে: ১. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: পোর্টাল রেজিস্ট্রেশন ও অনুমতি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। ২. সমন্বয়ের অভাব: বিদ্যালয় পরিদর্শক এবং প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে প্রকল্প নিয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাব। ৩. রাজনৈতিক ছায়া: বিদ্যালয় পরিচালন সমিতিতে রাজনীতির প্রভাবের কারণে বহিরাগতদের প্রবেশে দ্বিধা।
পশ্চিমবঙ্গের বহু বিদ্যালয়েরই নিজস্ব গৌরবোজ্জল ইতিহাস ও প্রাক্তন ছাত্র-সংসদ রয়েছে। কলকাতার একাধিক নামী স্কুল থেকে শুরু করে মফস্বলের শতাব্দী প্রাচীন স্কুলগুলোর প্রাক্তনীরা বিদ্যাঞ্জলির ছাতার তলায় এসে নিজেদের স্কুলের রূপান্তর ঘটাতে পারেন। কিন্তু বাস্তব বলছে, গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া জেলাগুলিতে যেমন (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া বা উত্তরবঙ্গের কিছু অংশ) যেখানে শিক্ষিত বা সচ্ছল মানুষের সংখ্যা এমনিতেই কম, সেখানে এই স্বেচ্ছাসেবী খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। ফলে এই প্রকল্প শহর ও গ্রামের স্কুলের মধ্যেকার বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে কিছুটা আলাদা। তাই এখানে এর কার্যকারিতা বাড়াতে হলে কয়েকটি কাঁটা উপড়ে ফেলা দরকার—
১. সরকারি নিয়ন্ত্রণ বনাম স্বায়ত্তশাসন:
শিক্ষাক্ষেত্রে যে কোনও কেন্দ্রীয় বা বহিরাগত হস্তক্ষেপকে রাজ্যের প্রায়শই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ‘বিদ্যাঞ্জলি’ যাতে কোনোভাবেই বিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনে আঘাত না করে এবং কোনও বিশেষ রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতাদর্শের প্রচারের চারণভূমি না হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করা জরুরী। স্বেচ্ছাসেবী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কড়া স্ক্রীনিং বা যাচাইকরণ দরকার।
২. পরিকাঠামোর অপব্যবহারের ভয়:
অনেক সময় দেখা যায়, বাইরে থেকে কেউ এসে সাহায্য করতে চাইলে বিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতি বা স্থানীয় স্তরে অসহযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। এই ‘ইগো’ বা প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ‘বিদ্যাঞ্জলি’ শুধু একটি অকেজো পোর্টাল হয়েই থেকে যাবে।
পথের দিশা: কি করা উচিত?
নতুন সরকারের জমানায় এই প্রকল্পকে যদি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয় গুলিতে সফল ও ফলপ্রসূ করে তুলতে হয়. তবে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন— ১. রাজ্য ও কেন্দ্রের যৌথ সমন্বয়: শিক্ষা যেহেতু যৌথ তালিকাভুক্ত বিষয়, তাই কেন্দ্রীয় প্রকল্পের গাইডলাইন মেনেও রাজ্য শিক্ষাদপ্তর নিজস্ব উপায়ে এর তদারকি করতে পারে। বাংলা পোর্টাল তৈরি করে স্থানীয় ভাষায় প্রচার বাড়ানো দরকার।
২. প্রধান শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন: কোনও স্কুলে কী প্রয়োজন (শিক্ষক নাকি ব্ল্যাকবোর্ড); তা সবচেয়ে ভালো জানেন সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বিদ্যাঞ্জলি পোর্টালে রিকোয়েস্ট বা চাহিদা আপলোড করার প্রক্রিয়াটাকে একদম সহজ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করতে হবে। ৩. স্বেচ্ছাসেবীদের স্বীকৃতি: যাঁরা নিজের সময় ও মেধা দিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের সাহায্য করছেন, তাদের ব্লক বা জেলাস্তরে করে সরকারি শংসাপত্র বা সম্মাননা দেওয়া উচিত। এতে সমাজের অন্য মানুষেরাও উৎসাহিত হবেন।
‘বিদ্যাঞ্জলি’ কোনও জাদুদণ্ড নয় যে, সরকারি খামতি রাতারাতি দূর করে দেবে। একে দেখতে হবে সরকারের পরিপূরক শক্তি হিসাবে। সরকার তার নিজের দায়িত্ব পালন করবে— শিক্ষক নিয়োগ করবে; মিড- ডে মিল দেবে; বই দেবে। কিন্তু শিক্ষার মানকে যদি আরোও একধাপ ওপরে নিয়ে যেতে হয়, তবে সমাজের সফল এবং সংবেদনশীল নাগরিকদের এগিয়ে আসতেই হবে। পশ্চিমবঙ্গের মতো শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থানে যেখানে ‘পাড়ার লাইব্রেরি’ বা ‘নৈশ বিদ্যালয়ের’ এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল, সেখানে ‘বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প’ আসলে সেই পুরনো সামাজিক দায়বদ্ধতা কেই নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার সুযোগ। নতুন সরকারের এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক চশমা সরিয়ে রেখে যদি সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে বাংলার পিছিয়ে পড়া সরকারি স্কুলগুলোর ছাত্রছাত্রীদের সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে
যেতে পারে।