জন্ম নিল টিএমসি ২.০, কিন্তু তা কি নিজের জায়গা করে নিতে পারবে?

জয়ন্ত রায়চৌধুরী–

 তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে যে গিয়েছে, এখন এটি একেবারেই নিশ্চিত। ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৯ জনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত দলটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।তবে বড় প্রশ্ন হল— এই নতুন দলটি কি নিজের জায়গা করে নিতে পারবে? সাধারণত কোনও রাজনৈতিক দল টিকে থাকতে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন— প্রথমত একটি আদর্শ, দ্বিতীয়ত একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা এবং তৃতীয়ত জনসমর্থন।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন— এই টিএমসি ২.০, যদিও তা নিঃসন্দেহে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মূল তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে, তা কি জনপ্রিয় হতে পারবে? শেষ নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল যে ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, সেই সমর্থন কি ধরে রাখতে পারবে এই নতুন দলটি?
আরও প্রশ্ন উঠছে— প্রায় অচেনা নতুন নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও আত্মীয় নন) কি যথেষ্ট ক্যারিশম্যাটিক, যাতে এমন এক নেত্রীর বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহকে টিকিয়ে রাখতে পারেন, যাঁর এখনও লক্ষ লক্ষ অনুগামী রয়েছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— নতুন টিএমসি-র আদর্শটাই বা কী?
মূল তৃণমূল কংগ্রেস কখনওই কমিউনিস্ট বা বিজেপির মতো আদর্শনির্ভর দল ছিল না। তাদের মূল আদর্শ ছিল বামফ্রন্টের বিরোধিতা এবং পরবর্তী সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রকল্প। দলের জনমুখী নীতি, বাঙালি আঞ্চলিক গর্ব, সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী দলগুলির থেকে ধার করা কল্যাণমূলক কর্মসূচি, ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান এবং সিপিআই(এম)-বিরোধী ঐতিহ্য— সবকিছুই তাঁর নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে একসূত্রে গাঁথা হয়েছিল।
টিএমসি ২.০-র সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা ছাড়া তারা ঠিক কীসের প্রতিনিধিত্ব করছে, তা বোঝানো।
যদি নতুন নেতৃত্ব দাবি করে যে, তারা তৃণমূলের একটি আরও দক্ষ, কম ব্যক্তিনির্ভর, কম পরিবারকেন্দ্রিক সংস্করণ— তাহলে তা একটি সাংগঠনিক যুক্তি হতে পারে, কিন্তু আদর্শ নয়। সমস্যা হল, ভোটাররা সাধারণত দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রশ্নে সংগঠিত হন না। তারা সংগঠিত হন পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষোভ বা বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে।
নতুন দলটি যদি বিজেপি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির— দুইয়ের থেকেই আলাদা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বক্তব্য তৈরি করতে না পারে, তবে তারা একটি আন্দোলনের বদলে কেবল একটি গোষ্ঠী হিসেবেই থেকে যেতে পারে।সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হল, তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক শেষ পর্যন্ত কাকে সমর্থন করবে? যে ৫৯ জন বিধায়ক দল ছেড়েছেন, তাঁরা তৃণমূলের টিকিটে জিতেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই ভোট সবসময় ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের জন্য পড়েনি। অনেক ক্ষেত্রেই ভোট পড়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব, তাঁর কল্যাণমূলক প্রকল্প, দলের প্রতীক এবং রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের জন্য।
প্রতিটি দলভাঙনের ক্ষেত্রে এটিই মূল প্রশ্ন— যখন আইনসভায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রতিষ্ঠাতা নেতার থেকে আলাদা হয়ে যান, তখন ভোটব্যাঙ্কের প্রকৃত মালিক কে?
ভোটাররা কি সংগঠনের সঙ্গে থাকবে, না নেতার সঙ্গে থাকবে, না দু’পক্ষকেই ছেড়ে দেবে— তার উত্তর মিলবে নির্বাচনের ময়দানেই। যদি টিএমসি ২.০ পুরসভা, পঞ্চায়েত এবং উপনির্বাচনে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে পারে, তবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। আর যদি বিধায়কদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ভোটে রূপান্তরিত করতে না পারে, তবে তাদের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা শুধুমাত্র কাগজে-কলমে হয়ে যেতে পারে।
ভারতের রাজনীতিতে এই বিষয়ে বিপরীতমুখী উদাহরণ রয়েছে। ২০২২ সালে শিবসেনার ভাঙন দেখিয়েছে যে দলীয় সংগঠন, বিধায়ক এবং প্রতীকের নিয়ন্ত্রণ বড় সুবিধা এনে দিতে পারে। তবে সেখানেও নির্বাচনী বৈধতা এখনও বিতর্কিত।অন্যদিকে, বহু দলভাঙনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে— বিধানসভায় সাময়িক নিয়ন্ত্রণ পেলেও ভোটাররা শেষ পর্যন্ত মূল নেতৃত্বের কাছেই ফিরে গিয়েছেন এবং ভাঙা দলগুলি হারিয়ে গিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— প্রতিষ্ঠাতা নেতার ব্যক্তিগত আকর্ষণ কতটা অটুট থাকে। ইতিহাস বলছে, কংগ্রেস দল একাধিকবার ভেঙেছে, এবং প্রত্যেকবার যে অংশ আদর্শ, ক্যারিশম্যাটিক নেতা ও জনসমর্থন হারিয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অপ্রাসঙ্গিকতায় হারিয়ে গিয়েছে।
এমনকি সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকও তাঁর মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট আদর্শের অভাবে গুরুত্ব হারায়। পুরাতন কংগ্রেস, যা ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল, ১৯৬০-এর দশকে আদর্শ ও নেতৃত্বের সন্ধান করতে করতে শেষ পর্যন্ত গুরুত্ব হারায়— যদিও তখন ইন্দিরা গান্ধীর দল সরকারি প্রতীক পায়নি।
অন্যদিকে, ইন্দিরা গান্ধীর সাফল্যের মূল ছিল তাঁর সমাজতান্ত্রিক নীতি, শক্তিশালী কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ এবং তাঁর ব্যক্তিগত আকর্ষণ।
পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের বাংলা কংগ্রেস ১৯৬৬ সালে গঠিত হয়ে স্বল্প সময়ে দু’বার সরকার গড়েছিল, সেটিও পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ইতিহাস থেকে মুছে যায়।
তাৎক্ষণিক প্রশ্ন হল— টিএমসি ২.০ আগামী মাস বা আগামী বছর টিকে থাকবে কি না। আসল প্রশ্ন হল— এই নতুন দলটি কি কেবল বিধায়কদের একটি জোট হয়ে থাকবে, নাকি তার থেকেও বড় কিছু হয়ে উঠতে পারবে?যদি তারা নাম ও প্রতীক পায়, তবে তৃণমূলের সংগঠনগত সম্পদ— সম্ভবত বিশাল তহবিলও— তাদের হাতে আসবে। কিন্তু নাম ও প্রতীক শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বৈধতার দাবিমাত্র। সেই দাবিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নতুন নেতৃত্বকে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বিষয়বস্তু তৈরি করতে হবে।নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে এবং ভোটারদের মধ্যে জায়গা করে নিতে হলে, নতুন দলকে এমন একটি রাজনৈতিক আদর্শ তৈরি করতে হবে, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজেপি বা বামফ্রন্ট— কারও সঙ্গেই যেন না মেলে।সাধারণ মানুষ, রাজনীতিবিদ এবং বিশ্লেষকরা এখন লক্ষ্য রাখবেন— ঋতব্রত, ৪৭ বছর বয়সী এই নেতা, যিনি আগে সিপিআই(এম) থেকে বহিষ্কৃত হন এবং রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন এবং যাঁর এক্স প্রোফাইলে লেখা আছে—’একজন গর্বিত বাঙালি ও ভারতীয়। ঘটনাক্রমে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের উলুবেড়িয়া পূর্ব কেন্দ্রের বিধায়ক এবং দু’বারের প্রাক্তন সাংসদ।’ —তিনি কি বাঙালির তর্কপ্রিয় সমাজে এমন এক নেতা হিসেবে উঠে আসতে পারবেন, যিনি কেবল বিধায়কদের সংখ্যা নয়, ভোটারদেরও আনুগত্য অর্জন করতে সক্ষম হবেন?