বায়ু দূষণকে বুড়ো আঙুল?

শোভনলাল চক্রবর্তী

এই মুহূর্তে শহরের কোনও প্রান্তে এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স (একিউআই) কত, জানার জন্য কোনও পরিশ্রম করতে হয় না। হাতে ধরা স্মার্ট ফোনের পর্দায় কার্যত না-চাইতেই সেই তথ্য ভেসে ওঠে। এবং, সেখানেই জানা যায়, কখন একিউআই ‘খারাপ’, কখন ‘খুব খারাপ’ আর কখন ‘ভয়াবহ’। অর্থাৎ, কোন বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে হচ্ছে, তা শরীরে পক্ষে কতখানি বিপজ্জনক, সে বিষয়ে নিখুঁত তথ্য আক্ষরিক অর্থেই নাগরিকের হাতের মুঠোয়। বাতাসের গুণগত মানের অবনতি কেন ঘটে, সে তথ্যও মানুষের কাছে আছে, নানাবিধ আলোচনায় সে তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে— অতএব, দূষণ যখন এমন ভয়াবহ স্তরে পৌঁছয়, তখন তো মানুষেরই স্বপ্রবৃত্ত হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ করার কথা, বিশেষত শিক্ষিত আলোকপ্রাপ্ত মানুষের। নিজের ভাল তো সবাই বোঝে। যত তথ্য, ততই বোধের স্পষ্টতা, এবং যত স্পষ্টতা, ততই সচেতন প্রয়াস— এই ‘আধুনিক’ ভাবনাটি বৈশ্বিক পরিবেশ আন্দোলনের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে। সেই রাজনীতির অন্যতম দাবি, পরিবেশ সচেতনতার প্রসার ঘটলেই বিপদে রাশ টানা যাবে।

একিউআই-এর উদাহরণটি যেহেতু হাতে-কলমে এই দাবির অসারতা দেখিয়ে দেয়, তাই এই ‘আধুনিক’ অবস্থানটিকে খানিক নেড়েচেড়ে দেখা বিধেয়। তথ্য এবং সচেতনতার গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন নেই— কী ঘটছে, তা না জানলে সেই ঘটনাকে প্রতিহত করার কাজ শুরুই করা চলে না। বাতাস কেন দূষিত হয়, দূষণের মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছলে তা কতখানি ক্ষতিকর, এবং কোন পথে চললে সেই দূষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে— সবই তথ্য, এবং অতি জরুরি তথ্য। প্রশ্ন হল, এই তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই কি যথেষ্ট? শুধু তথ্য থাকলেই কি মানুষ নিজের আচরণ পাল্টায়? প্রশ্নটির বাস্তব উত্তর আমাদের জানা। ঘন ধোঁয়াশায় ঢাকা চার পাশ, কাশি, শ্বাসকষ্ট, চোখের সমস্যা— গত ডিসেম্বরে দিল্লির নাভিশ্বাস উঠেছে। অথচ এই অবস্থাতেও সংসদের শীতকালীন অধিবেশনের আলোচনায় ব্রাত্য থেকে গেছে দিল্লির বায়ুদূষণ। অধিবেশনের শেষ দিকের কার্যসূচিতে দিল্লির দূষণ নিয়ে আলোচনা জায়গা করে নিয়েছিল,এ কথা ঠিক। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর দাবি মেনে আলোচনায় সায় দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি।


‘বিকশিত ভারত জি-রাম জি’ বিল নিয়ে বিরোধীদের বিক্ষোভ, অতঃপর সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে সরকারের বিল পাশ এবং অচিরেই গোটা দিনের জন্য অধিবেশন মুলতুবি। শেষ দিনের পরিস্থিতিও কিছু আলাদা ছিল না। উল্টে সংসদে সরকার দাবি করল, বায়ুদূষণের কারণে ফুসফুস বা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা তৈরি হচ্ছে, এমন তথ্য সরকারের কাছে নেই। ইতিপূর্বেও বিভিন্ন সমীক্ষায় বিশ্বের দূষণ তালিকায় ভারতের ক্রম অবনমনের প্রমাণ মিলেছে, এই সরকার আগাগোড়া তাকে অস্বীকার করেছে। এই অধিবেশনেও সংসদে দূষণ বিষয়ক আলোচনাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল একেবারে শেষ পর্যায়ে— হয়তো ‘অনির্দিষ্ট কালের জন্য মুলতুবি’ করার সম্ভাবনার কথা ভেবেই। সরকারপক্ষ বলল, বিরোধীদের হল্লার কারণেই অধিবেশন মুলতুবি করে দিতে হয়েছে। বাদ পড়েছে দূষণ বিষয়ক আলোচনা। অবশ্য এই কুযুক্তি প্রদান ভিন্ন কেন্দ্রের অন্য পথ নেই। দিল্লিতে এখন তাদেরই সরকার। বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে যে দলের অন্যতম প্রচার হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল দিল্লির ধারাবাহিক বায়ুদূষণ। অথচ, রেখা গুপ্তের সরকারের বর্ষপূর্তির পথে চমকটুকুই সার— কখনও কৃত্রিম ভাবে বৃষ্টি নামানোর প্রচেষ্টা, কখনও দশ হাজার সরকারি স্কুলের ক্লাসরুমে বাতাস পরিশোধক যন্ত্র বসানোর কথা ঘোষণা। কিন্তু যে সমস্যা দীর্ঘকালীন, তার মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা কোথায়?

কেন নির্মল শ্বাস নেওয়ার দাবিতে মানুষকে পথে নেমে বিক্ষোভ দেখাতে হবে? সংসদে দূষণের প্রসঙ্গ উঠলে এই চূড়ান্ত ব্যর্থতার খতিয়ানও প্রকাশ্যে আসত। শাসকদল সচেতনভাবেই বিরোধীদের ‘হল্লা’কে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছে। দূষণের সমস্যা দিল্লিতে সর্বাধিক হলেও অন্য শহরগুলিতে কিছু কম নয়। সেখানে দূষণ সংক্রান্ত নীতি তবে কী হবে? ভারতবর্ষের বেশির ভাগ মানুষ একটি সত্য কথা জানেন এবং বিশ্বাস করেন যে, তাঁর একার চেষ্টায় কিছু হওয়ার নয়। কিন্তু, নিজের চেষ্টার ব্যয়ভার নিজেকেই বহন করতে হয়। যে ব্যয় অন্তত আপাতদৃষ্টিতে ফলহীন, মানুষ স্বভাবতই তাতে অনাগ্রহী। অর্থশাস্ত্রের পরিভাষায় বাতাস একটি বিশুদ্ধ পাবলিক গুড। তার ট্র্যাজেডি স্নাতক স্তরের ছাত্রদের পাঠ্য। দ্বিতীয় কথা হল, যত ক্ষণ না রাষ্ট্রীয় স্তরে পরিবেশ নীতির প্রশ্নে সততা তৈরি হচ্ছে, যত ক্ষণ না শিল্পক্ষেত্রের প্রতি দূষণের প্রশ্নে সত্যিই কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে, তত ক্ষণ ব্যক্তির চেষ্টায় খুব বেশি কিছু পরিবর্তিত হয় না। মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী। ফলে, ফাটা ডিমে তা দিয়ে ফল পাওয়ার চেষ্টা করে না। কিন্তু, তথ্যের প্রতুলতার ‘আধুনিক’ যুক্তির সঙ্গে বাস্তবের বিরোধ শুধু এটুকুতেই আটকে নেই। সবচেয়ে বড় কথা হল, রক্তমাংসের মানুষ সর্বদা যুক্তিবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের অনুকূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে তাৎক্ষণিক বিবিধ চাপ, আবেগ, যুক্তিহীনতা।

অর্থশাস্ত্রের পরিসরে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে আচরণবাদী অর্থনীতির বিরোধ ঠিক এখানেই। পরিবেশের প্রশ্নও তাই। যে মানুষের পক্ষে রোজকার নুন-ভাতের ব্যবস্থা করা কঠিন, জৈব জ্বালানির বিপদ, এবং তাঁর নিজের স্বাস্থ্যের উপরেই সেই জ্বালানির কুপ্রভাবের কথা তাঁকে পইপই করে বুঝিয়ে বলেই বা কী লাভ— তাঁর পক্ষে এই মুহূর্তে কাঠকুটো জোগাড় করে রান্না করাই পথ। অথবা, অফিসে পৌঁছে যাকে টানা দশ ঘণ্টা বিবিধ কাজের চাপে নাজেহাল হতে হবে, পরিবেশ দূষণের বিপদের কথা জেনেও তিনি বাসে চাপার বদলে নিজস্ব বাইকই ব্যবহার করতে চাইবেন। উদাহরণের তালিকা বাড়িয়ে যাওয়া চলে, কিন্তু মূল কথাটি স্পষ্ট— মানুষের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ তার দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। দূষণ যতই বাডুক, স্মার্টফোন যতই একিউআই-এর ভয়াবহতার সাক্ষ্য দিক, এই বাস্তবটি পাল্টায় না।

ভারত এমনই এক দেশ, যেখানে বিভিন্ন সময়ে পরিবেশ সংক্রান্ত ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা, পরামর্শ দিলেও তাকে গ্রাহ্য করা হয় না সঙ্কীর্ণ রাজনীতির প্রয়োজনে। বিরোধীরাও হামেশাই নীরব দর্শক হয়ে থাকেন। বিরোধীদের ভূমিকা শুধুমাত্র দূষণ বিষয়ে সংসদে আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পরিবেশ নিয়ে এ দেশে সরকার যা করছে, যা করছে না, এবং যা করা উচিত— সামগ্রিক ভাবে তার পর্যালোচনাটিও তাঁদেরই দায়িত্ব, বছরভর। প্রয়োজনে পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে পথে নেমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিও তাঁদের দায়িত্ব। অথচ, ২০২২-২৫ সালের মধ্যে দিল্লির ছ’টি সরকারি হাসপাতালে দু’লক্ষের বেশি মানুষ শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন, এমন তথ্য হাতে থাকা সত্ত্বেও, তাঁরা মূলত নিন্দা-কটাক্ষেই নিজেদের আবদ্ধ রেখেছেন। বিষবাষ্প রাজনীতির গণ্ডি মানে না, শাসক-বিরোধী বিভেদও করে না— ভারতের বিরোধী রাজনীতি তা জানে কি?