তিন ভাষার নীতি

সম্প্রতি সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) নবম, অষ্টম ও সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য তিন ভাষার নীতিতে কিছুটা ছাড় দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। এতে বহু ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবক স্বস্তি পেয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে একটি বড় প্রশ্নও সামনে এসেছে— এমন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন পড়ল কেন? শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কি এভাবে তাড়াহুড়ো করে নীতি নির্ধারণ করা উচিত?
গত ১৫ মে জারি হওয়া একটি নির্দেশিকায় সিবিএসই জানায়, তিনটি ভাষার মধ্যে অন্তত দুটি হতে হবে ‘ভারতের নিজস্ব ভাষা’। এর ফলে বহু পড়ুয়া সমস্যায় পড়ে, যারা আগে থেকেই দুটি বিদেশি ভাষা নিয়ে পড়ছিল। হঠাৎ করে তাদের বিষয় বদলানোর চাপ তৈরি হয়। শুধু ছাত্রছাত্রী নয়, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মধ্যেও এই নিয়ে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ দেখা দেয়। ফলে বোর্ডের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তির দিকে গেলেও, পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এর আগে, ২ এপ্রিল সিবিএসই একটি সংশোধিত শিক্ষাকাঠামো প্রকাশ করেছিল, যেখানে ধাপে ধাপে তিন ভাষার নীতি চালুর কথা বলা হয়। পরিকল্পনা ছিল, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শুরু করে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এই নীতি সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করা হবে। অর্থাৎ, বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট সময় ছিল। তাহলে তার মধ্যেই কেন হঠাৎ করে ১৫ মে-র নির্দেশিকা জারি করা হল? আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বোর্ডের নিজস্ব পরিচালন পর্ষদ নাকি আগেই বলেছিল যে, এনসিইআরটি প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ না করা পর্যন্ত এই নীতি চালু করা উচিত নয়। সেই অবস্থান থেকে সরে এসে এমন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া কেন— এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়।
শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ছাত্রছাত্রীদের উপর তার প্রভাব। তিন ভাষার নীতি নিঃসন্দেহে ভাষাজ্ঞান বাড়ানোর একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি পড়ুয়াদের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে কি না, তা ভেবে দেখা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় ভাষায় অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় পাশ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যদিও বোর্ড পরীক্ষায় সেই বিষয়টি নেই। এতে পড়াশোনার চাপ বাড়ছে, আর শেখার আনন্দ অনেক সময় কমে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে, আজকের বিশ্বে বিদেশি ভাষার গুরুত্ব ক্রমশ বেড়েই চলেছে। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা বা চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ বা জাপানি ভাষার চাহিদা রয়েছে। ফলে ছাত্রছাত্রীরা স্বাভাবিকভাবেই এই ভাষাগুলি শেখার দিকে আগ্রহী হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে তাদের পছন্দের উপর সীমাবদ্ধতা চাপানো কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে ভাবা দরকার।
অন্যদিকে, দেশের দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে এই নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এমন নীতির ফলে আঞ্চলিক ভাষার উপর প্রভাব পড়তে পারে বা ভাষাগত বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এই বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব পক্ষের মতামত শোনা এবং তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, শিক্ষানীতি তৈরি ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং সংলাপ অত্যন্ত প্রয়োজন। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার প্রভাব নেতিবাচক হতে পারে। বারবার নির্দেশিকা জারি করে পরে তা সংশোধন করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার উপর আস্থা কমে যায়।
সিবিএসই-এর সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপ তাই শুধু একটি সংশোধন নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও ভেবে-চিন্তে, ধীরে এবং সকলের মতামত নিয়ে এগোনো উচিত। কারণ, শিক্ষার মূল লক্ষ্য কেবল নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে ছাত্রছাত্রীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিখতে পারে এবং নিজেদের সামগ্রিক বিকাশ ঘটাতে পারে।