দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি (ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি বা এনইপি) ২০২০ এবং জাতীয় পাঠ্যক্রম কাঠামো (ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক ফর স্কুল এডুকেশন বা এনসিএফ-এসই) ২০২৩-এর আলোকে সিবিএসই (সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন) যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। নবম ও দশম শ্রেণির জন্য তিনটি ভাষা পড়া বাধ্যতামূলক করা— এবং তার মধ্যে অন্তত দুটি ভারতীয় ভাষা রাখা— একদিকে যেমন ভাষাগত বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেয়, অন্যদিকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রশ্নও তুলে দেয়।
ভারত বহুভাষিক দেশ। এখানে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং পরিচয়ের বাহক। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের একাধিক ভারতীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দেশের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পাবে, যা জাতীয় সংহতি গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। মাতৃভাষা ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষার গুরুত্ব বাড়ানো জাতীয় শিক্ষানীতির অন্যতম লক্ষ্য, এবং সিবিএসই-র এই পদক্ষেপ সেই দিকেই এগিয়ে চলার ইঙ্গিত দেয়।
তবে বাস্তব সমস্যা এখানেই শেষ নয়। দেশের বহু স্কুলেই পর্যাপ্ত সংখ্যক ভাষা-শিক্ষক নেই, বিশেষ করে আঞ্চলিক বা কম প্রচলিত ভারতীয় ভাষার ক্ষেত্রে। সিবিএসই এই সমস্যার সমাধানে ‘ইন্টার-স্কুল রিসোর্স শেয়ারিং’, ভার্চুয়াল বা হাইব্রিড শিক্ষার মতো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এসব ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে? গ্রামীণ বা মফস্বল অঞ্চলের স্কুলগুলিতে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে এই নীতি বাস্তবায়নে বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিক্ষার্থীদের উপর চাপের বিষয়টি। সিবিএসই জানিয়েছে যে তৃতীয় ভাষা (R3)-এর জন্য দশম শ্রেণিতে কোনও বোর্ড পরীক্ষা হবে না এবং মূল্যায়ন হবে সম্পূর্ণ স্কুলভিত্তিক। এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে এর ফলে মূল্যায়নের মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিভিন্ন স্কুলে মূল্যায়নের মানদণ্ড এক হবে কি না, তা নিশ্চিত করা সহজ নয়। ফলে সার্বিক মূল্যায়নে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।
বিদেশি ভাষার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম কিছুটা সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। এখন শিক্ষার্থীরা বিদেশি ভাষা বেছে নিতে পারবে শুধুমাত্র তৃতীয় ভাষা হিসেবে, যদি তারা আগে দুটি ভারতীয় ভাষা পড়ে, অথবা অতিরিক্ত চতুর্থ ভাষা হিসেবে। বিশ্বায়নের যুগে বিদেশি ভাষা শেখার গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে এই সীমাবদ্ধতা কিছু শিক্ষার্থীর জন্য অসুবিধাজনক হতে পারে, বিশেষ করে যারা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কাজ করতে চায়।
তবে সিবিএসই যে কিছু ছাড়ের কথাও বলেছে, তা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং বিদেশ থেকে ফিরে আসা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনে ছাড় দেওয়া হবে। এই নমনীয়তা নীতির মানবিক দিকটিকে তুলে ধরে।
সবশেষে বলা যায়, তিন ভাষার বাধ্যতামূলক শিক্ষা একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফল। এর মাধ্যমে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও জাতীয় ঐক্যকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এই নীতির সাফল্য নির্ভর করবে তার সঠিক ও সমতাভিত্তিক বাস্তবায়নের উপর। শিক্ষকসংকট, পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং মূল্যায়নের স্বচ্ছতা— এই বিষয়গুলি যদি যথাযথভাবে সমাধান না করা যায়, তবে ভালো উদ্যোগও ব্যর্থ হতে পারে।
নীতির উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এখন প্রয়োজন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তা কার্যকর করা, যাতে শিক্ষার্থীরা সত্যিই উপকৃত হয় এবং ভাষার মাধ্যমে দেশের বৈচিত্র্যময় আত্মাকে আরও গভীরভাবে চিনতে পারে।