দাদা ভাঁড়ে একটা চা দিন— বলতেই বাজারের চায়ের দোকানি বললেন, ভাঁড় নেই। কাগজের কাপ চলবে? এ শহরের বহু দোকান এখন এই পথেই হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ, রাতারাতি মাটির ভাঁড় উধাও। বদলে জায়গা করে নিয়েছে কাগজের কিংবা প্লাস্টিকের কাপ। বেশির ভাগ চায়ের দোকানদাররের একই বক্তব্য। তাঁদের কথায়, নিয়মিত ভাঁড় মিলছে না বলেই বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হচ্ছে। অনেক চায়ের দোকানদার দাবি করছেন ভাঁড় না পাওয়ায় ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। কারণ, ভাঁড় ছাড়া অনেকেই চা খান না।
শহর জুড়ে হঠাৎ কেন এই সঙ্কট? উত্তর মিলতে পারে উল্টোডাঙা ও তিলজলার ভাঁড়পট্টিতে। শহরের চায়ের দোকানগুলিতে ভাঁড় যায় মূলত এই সব এলাকা থেকেই। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কারিগরদের হাতে কাজ থাকলেও নেই পর্যাপ্ত কাঁচামাল। অধিকাংশ কারখানায় এক বা দু’দিনের বেশি সরবরাহ করার মতো ভাঁড় মজুত নেই। কারিগররা বলছেন, মাটি না থাকলে ভাঁড় বানাব কী করে? যে মাটি দিয়ে ভাঁড় তৈরি হয়, সেটাই আসছে না। একই সুর তিলজলা ভাঁড়পট্টিতেও, অর্ডার আছে, মাটি নেই। ফলে দোকানদারেরা ভাঁড় চাইলেও দিতে পারছেন না তাঁরা। এ দিকে, বহু পরিবার এই কাজে নির্ভরশীল। কারিগরদের দাবি, এত দিন ডায়মন্ড হারবার, ক্যানিং-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাঁড় তৈরির উপযোগী মাটি আসত। পুকুর খনন, জমি কাটা-সহ নানা উপায়ে সেই মাটি সংগ্রহ হত।
সম্প্রতি প্রশাসনের কড়াকড়িতে মাটি সংগ্রহ কার্যত বন্ধ। মাটি কাটা ‘অবৈধ’ বলে চিহ্নিত করে তা বন্ধ করা হয়েছে। ফলে, কাঁচামালের জোগানে ধাক্কা লেগেছে। এর প্রভাব পড়েছে গোটা শৃঙ্খলে। এক দিকে চায়ের দোকানদারেরা ভাঁড় পাচ্ছেন না, তাই অন্য ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। তাঁদের দাবি, আগে ভাঁড়-পিছু লাগত আট আনা থেকে এক টাকা। এখন দ্বিগুণ দামে বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। অন্য দিকে, ভাঁড়পট্টির শত শত শ্রমিক ও কারিগরের রুজিরুটিও সঙ্কটে। তাঁদের মতে, গঙ্গার মাটি নয়, এ কাজে এঁটেল মাটিই দরকার। যা ওই অঞ্চল থেকে বেশি পাওয়া যেত। মাটি নেই, তাই কাজ নেই।
পশ্চিমবঙ্গ মৃৎশিল্পী কল্যাণ সমিতির রাজ্য সভাপতি জানিয়েছেন মাটির সমস্যা নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এমনকি জেলাশাসকের সঙ্গেও কথা হয়েছে। লিজ়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে মাটি কাটার ব্যবস্থা হলে অন্তত দু-তিন মাসের জন্য কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দ্রুত সমাধানের আশায় রয়েছেন সবাই। চা-প্রেমীদের মতে, ভাঁড়ে চা খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। প্লাস্টিক বা অন্য কিছুর কাপ পরিবেশের পক্ষেও ভালো নয়। অনেকের মতে আবার, ভাঁড়ে চা খাওয়ার আলাদাই অনুভূতি। ক্রেতা থেকে বিক্রেতা— শহর জুড়ে একটাই দাবি, চায়ের দোকানগুলিতে দ্রুত ভাঁড় ফিরে আসুক। প্রকৃতির উপহারকে নিত্যজীবনের সঙ্গে যুক্ত করা বরাবরই এ দেশের ঐতিহ্য। যেমন ভাঁড়ে চা-পান, শালপাতার থালা, কলাপাতায় ভোজ, মাটির হাঁড়ি-কলসি ব্যবহার, তালপাতার পাখার বাতাস ইত্যাদি। এগুলো পরিবেশবান্ধব, জৈববিয়োজ্য জীবনশৈলী হিসাবে সমাদৃত।
কারণ, এগুলি ব্যবহার শেষে প্রকৃতিতে মিশে যায়, বর্জ্য কমায়। আজ সেই গৌরবের সংস্কৃতির সঙ্গেই ভারতীয়দের যোগাযোগ ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার ও সংরক্ষণে দীর্ঘ অবহেলা এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। যখন বাকি পৃথিবী, বিশেষত উন্নত দেশগুলি প্লাস্টিকমুক্ত ভবিষ্যতের কথা বলছে, তখন দেশের এই অপরিণামদর্শিতা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের, উদ্বেগের। উন্নত শহরগুলিতে বাঁশ, কাঠ বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য ধাতুকে পাত্র হিসাবে নির্বাচিত করা হচ্ছে। অথচ, ভারত মাটির ভাঁড়ের বদলে ক্রমশ কাগজের কাপে চা-পানে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। কারণ, ভাঁড়ের মতো এগুলি সরবরাহের সময় ভাঙার ভয় নেই, জোগান প্রচুর, ফলে সস্তা। কিন্তু গরম চা যাতে ঠিক ভাবে থাকে, তার জন্য এগুলিতে অনেক সময়ই প্লাস্টিকের আস্তরণ থাকে। যে কাপ পুরোপুরি প্লাস্টিকের, তার ক্ষতির পরিমাণ অবশ্যই আরও বেশি।
গবেষণা জানিয়েছে, ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা নানা রাসায়নিক উপাদান উত্তাপের সংস্পর্শে পানীয়ে মিশে যেতে পারে। ফেলে দেওয়ার পরে এগুলি নর্দমায়, নদীতে, জমিতে জমে ও দূষণ বাড়ে। খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে আবার ফেরে মানবশরীরে। জীবাণুমুক্ত রাখার সমস্যা, মাটিতে ধাতুর উপস্থিতি ইত্যাদি কিছু প্রশ্ন উঠলেও অধিকাংশ পরিবেশবিদই মাটির ভাঁড়ের পক্ষে। এটি ব্যবহারের পর মাটিতেই মিশে যায়, দূষণ বাড়ায় না। তা ছাড়া কুমোরদের জীবিকা সুরক্ষিত থাকে, পুষ্ট হয় গ্রামীণ অর্থনীতি।
তবে, নদী, জলাভূমি বা কৃষিক্ষেত্রের ক্ষতি করে মাটি তোলাও সমর্থনযোগ্য নয়। ফলে মৃৎশিল্পের কাঁচামাল কোথা থেকে আসবে, সেই বিকল্প ব্যবস্থাটিরও বিষয়ে ভাবা জরুরি। যেভাবে বাণিজ্যিক প্রয়োজন মেটাতে বালি, পাথর বা অন্যান্য খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে সমীক্ষা, চুক্তি ও নিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের নিয়ম করা হয়েছে সে ভাবেই ভাঁড়শিল্পের পুনরুজ্জীবনের স্বার্থে উপযুক্ত এঁটেল মাটির উৎস স্থির করতে হবে। কোথায় এই মাটি সংরক্ষিত হবে, কী ভাবে পরিবেশের ক্ষতি না করে সংগ্রহ করা যাবে, কী ভাবে মৃৎশিল্পীদের কাছে পৌঁছবে— এই সকল পরিকল্পনা নিয়ে স্পষ্ট প্রশাসনিক নীতির প্রয়োজন। নয়তো কুটিরশিল্প সমানেই অস্তিত্বসঙ্কটে পড়বে।
কলকাতার বহু চায়ের দোকানেই মাটির ভাঁড়ের আকাল দেখা দিয়েছে, চা ঢালা হচ্ছে কাগজের কাপে। একে শুধু চা-প্রেমীদের তৃপ্তিতে ব্যাঘাত, অতএব তুচ্ছ সমস্যা হিসাবে গুরুত্বহীন ভাবলে চলবে না। প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে মাটি সংগ্রহ বন্ধ হওয়ায় ভাঁড়পট্টিগুলিতে কাঁচামাল, অর্থাৎ উপযুক্ত এঁটেল মাটির জোগান আটকে গিয়েছে। ফলে শিল্পীদের জীবিকা-সমস্যা দেখা দিয়েছে। আগেও প্রবল বৃষ্টি, বন্যার কারণে, রোদের অভাবে মাটি শুকানো যায়নি, ফলে মরসুমি ভাঁড়ের আকাল দেখা দিয়েছিল। ভারতীয় রেলও বহু বার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে মাটির ভাঁড়ে আস্থা রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু নিয়মিত জোগান সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ, মাটির ভাঁড়ের জোগান বরাবরই সমস্যাদীর্ণ, ফলত প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা জারি-মাত্র রাজ্যে শিল্পটি কার্যত থমকে গিয়েছে। এর সুদূর প্রসারী ফল শেষমেশ মৃৎশিল্পীদের কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। পুজোর মরশুমে ঠাকুর তৈরিতে আসতে পারে সময়ের চাপাচাপি।