রবীন রায়
গণতন্ত্রে হিংসার কোনও স্থান নেই, এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু অন্য রাজ্যে নির্বাচনে কোনও অশান্তি না হলেও, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন ও হিংসা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সম্প্রতি আসাম, কেরালা এবং পুদুচেরিতে নির্বিঘ্নে বিধানসভা নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। দু’টি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটের হারও সন্তোষজনক বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এমনকী মারামারি-খুনোখুনি এখন আর বিহার, উত্তরপ্রদেশেও হয় না। এখন ত্রিপুরা আর পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া কোথাও নির্বাচনী সংঘর্ষ হয় না। পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ অঞ্চল গ্রাম। এখনকার অর্থনীতি কৃষিভিত্তিক। ফলে রাজ্যে কর্মসংস্থানের মূল উৎস হল কৃষিকাজ ও তার সঙ্গে যুক্ত জীবন ও জীবিকা। তাই পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ রাখতে গেলে গ্রামাঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরি। সেকথা মাথায় রেখেই, গ্রামাঞ্চলকে দখলে রাখতে হিংসার আশ্রয় নেয় সব রাজনৈতিক দলই।
শুধু বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচন নয়, এ রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনেও প্রচুর খুন খারাপি হয়। কারণ এখানে ভোট হয় মাইক্রো লেভেলে। প্রার্থীরা হয় পরস্পর পরস্পরের চেনা, নয়তো পড়শি অথবা একই পরিবারের। ফলে রাজনৈতিক লড়াইটা একেবারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেমে আসে। রাজনৈতিক বৈরীও তৈরি হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে। তবে পঞ্চায়েত নির্বাচনে হানাহানির আরও একটি বড় কারণ হল অর্থ। অনেক দিন ধরেই পঞ্চায়েত ব্যবস্থার উপর গ্রামীণ অর্থনীতি নির্ভর করতে শুরু করেছে। তাছাড়া গত কয়েক বছরে পঞ্চায়েতের জন্য সরকারি অনুদান বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। প্রতি বছর গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি দুই থেকে পাঁচ কোটি টাকা পেয়ে থাকে। এর মধ্যে আবার ১০০০টি এমন গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে যারা বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রকল্পে আরও অনেক বেশি টাকা পায়। এই বিপুল পরিমাণ টাকার দখল নিতে রাজনৈতিক দলগুলির কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে, শুরু হয় মারামারি, লাশ পড়ে, রক্তগঙ্গা বয়ে যায়। তাই রাজনৈতিক দলগুলির শুভবুদ্ধির উদয় না হলে, এবং রাজ্য সরকার ও পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই হানাহানি চলতেই থাকবে।
কোনও অঞ্চলের অর্থনীতি যত অন্নুনত, সেখানে সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তত কম। সেই অঞ্চলের মানুষকে তাই অসংগঠিত ক্ষেত্রের কাজের উপর নির্ভর করতে হয়। আর অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিজের কাজ তখনই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব, যদি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকা যায়। তাই মুখে যে যাই বলুক না কেন, ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে হিংসার আশ্রয় নিতে কোনও রাজনৈতিক দলই দ্বিধা করে না। শহরে এখন প্রোমোটারি, তোলাবাজি করে অর্থ সংগ্রহ করতে রাজনীতির আশ্রয় নিতেই হয়। ১৯৭২ সালে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের আমলে, কংগ্রেসের হাত ধরে এ রাজ্যে নির্বাচনে প্রথম রক্তস্নাত অধ্যায়ের শুরু। সিপিআইএম এর যোগ্য উত্তরসূরি। সিপিআইএম তিন দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে বজায় রেখেছিল গা জোয়ারি রাজনীতি। গায়ের জোরে বিরোধীদের মুখবন্ধ রাখা, ভিটে মাটি ছাড়া করা তখন ছিল জলভাত। মোটরবাইকে চড়ে হাতে দলীয় পতাকা নিয়ে ঘোরা ভৈরববাহিনীকে দেখে, প্রাণ কাঁপতো বিরোধী দলের কর্মী থেকে সাধারণ মানুষ সবার।
তখন সিপিএম ছাড়া অন্য দল করা মানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকা। বিরোধী দল করার অপরাধে অথবা রাজনৈতিক নেতাদের অমান্য করার অপরাধে কত মানুষের যে প্রাণ গিয়েছে তার কোনও হিসেব নেই। তাদের ঠেকানোর মতো কোনও শক্তি যেমন বাইরে ছিল না, তেমনই দলের ভিতরেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কোনও প্রবণতা ছিল না। তখন যেহেতু ২৪ ঘণ্টা ধরে টেলিভিশন চ্যানেল চলত না, সমাজমাধ্যম ছিল না, তাই অনেক খবরই তখন মানুষের অজানা থেকে যেত। তৃণমূল আসার পরও অবস্থার উন্নতি তো হয়নি, বরং আরও বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তাই খুনোখুনির ট্রাডিশন সমানে চলছে।