ঝাড়গ্রামের জঙ্গল মানেই শুধু শাল, মহুয়া, পিয়াল আর লাল মাটির গল্প নয়। এই জঙ্গলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা। আর সেই জীবিকার নেপথ্যে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেও যাঁদের নাম প্রায়শই সামনে আসে না, তাঁরা হলেন গ্রামের মহিলারা। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঝুড়ি, বস্তা হাতে জঙ্গলের পথে হাঁটা, শালপাতা কুড়িয়ে আনা, বাছাই করা, পরিষ্কার করা, শুকোনো, সেলাই করে থালা-বাটি তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা— এই দীর্ঘ শ্রমের প্রতিটি ধাপেই তাঁদের হাত। অথচ প্রশ্নটি থেকে যায়— এই শ্রমের মূল্য কত?
শালপাতা ঝাড়গ্রামের কাছে নিছক একটি বনজ সম্পদ নয়; এটি বহু পরিবারের রান্নাঘরের আগুন জ্বালানোর অর্থ, সন্তানের পড়াশোনার খরচ, সংসারের দৈনন্দিন বাজার এবং কখনও-বা বিপদের সময় একমাত্র ভরসা। পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শালপাতার থালা-বাটির বাজারও তৈরি হয়েছে। সামাজিক অনুষ্ঠান, পুজো, ভোজ, মেলা কিংবা স্থানীয় হাটে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে শালপাতার ব্যবহার এখনও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাজার বাড়লেও সেই বাজারের লাভের কতটা পৌঁছচ্ছে শালপাতা সংগ্রহকারী মহিলার হাতে? এখানেই সমস্যার আসল জায়গা।
একটি শালপাতার থালা বাজারে যখন একটি নির্দিষ্ট দামে বিক্রি হয়, তখন তার উৎপাদনের পেছনে যে শ্রম রয়েছে, তার হিসাব খুব কম ক্ষেত্রেই করা হয়। জঙ্গল থেকে পাতা সংগ্রহের শ্রমের মূল্য নেই, বাছাই ও পরিষ্কারের মূল্য নেই, সেলাই করার শ্রমের মূল্য নেই, পরিবহনের মূল্য নেই। যেন এই সমস্ত কাজ স্বাভাবিকভাবেই মহিলাদের করার কথা। সংসারের কাজের মতোই তাঁদের এই শ্রমও অদৃশ্য। অথচ অর্থনীতির ভাষায় এটি উৎপাদন; কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় তা এখনও ‘ঘরের মেয়েদের অতিরিক্ত কাজ’! এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।
শালপাতার অর্থনীতি নিয়ে কথা বললেই প্রথমে বনজ সম্পদের কথা বলা হয়, বাজারের কথা বলা হয়, পরিবেশবান্ধব পণ্যের কথা বলা হয়। কিন্তু সেই পাতার সঙ্গে যুক্ত নারীশ্রমের কথা কতটা বলা হয়? একটি পণ্যকে ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ বললেই সেটি ন্যায়সঙ্গত অর্থনীতির প্রতীক হয়ে যায় না। যদি সেই পণ্য উৎপাদনকারী মহিলা নিজের শ্রমের ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে পরিবেশবান্ধবতার আড়ালে আমরা আরেকটি বৈষম্যের অর্থনীতিই তৈরি করছি। সবচেয়ে বড় সমস্যা মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থা। গ্রামের বহু মহিলা সরাসরি বড় বাজারে পৌঁছতে পারেন না। ফলে তাঁদের উৎপাদিত সামগ্রী কম দামে কিনে নিয়ে অন্যরা বেশি দামে বিক্রি করেন। উৎপাদক ও চূড়ান্ত বাজারের মধ্যে যত বেশি স্তর বাড়ে, উৎপাদকের অংশ তত কমে। এই ব্যবস্থায় ঝুঁকি বহন করেন সংগ্রাহক ও কারিগর, অথচ তুলনামূলকভাবে বেশি লাভ করেন বাজারের মধ্যবর্তী স্তরের ব্যবসায়ীরা।
প্রশ্ন উঠতেই পারে— মহিলারা নিজেরাই বাজারে যাচ্ছেন না কেন? উত্তরটি এত সহজ নয়। অনেকের হাতে পর্যাপ্ত পুঁজি নেই। নিয়মিত পরিবহনের ব্যবস্থা নেই। বড় ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। বাজারদর সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। বড় অর্ডার এলে তা পূরণ করার মতো সংগঠিত উৎপাদন ব্যবস্থা নেই। আবার বন থেকে পাতা সংগ্রহের অধিকার, বনসম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় বন-নির্ভর মানুষের সঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামোর সম্পর্কও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে উৎপাদক যতক্ষণ বিচ্ছিন্ন থাকবেন, ততক্ষণ বাজারে তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বলই থাকবে। তাহলে সমাধান কী?
প্রথমত, শালপাতা সংগ্রহকারী ও শালপাতার সামগ্রী প্রস্তুতকারী মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর আওতায় এনে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একা একজন মহিলা যে দর পান, একটি সংগঠিত গোষ্ঠী সেই দর পাবে না— এমন নয়। বরং একসঙ্গে উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং এবং বিক্রির ব্যবস্থা থাকলে তাঁদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বাড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, সরাসরি বাজার সংযোগ তৈরি করা জরুরি। শুধু গ্রামের হাটে বিক্রি করলেই হবে না। শহরের বাজার, মেলা, সরকারি অনুষ্ঠান, পর্যটনকেন্দ্র, রেস্তরাঁ, ক্যাটারিং সংস্থা এবং অনলাইন বিপণনের সঙ্গে এই উৎপাদকদের যুক্ত করতে হবে। শালপাতার তৈরি থালা-বাটি ছাড়াও এখন নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করা সম্ভব। সঠিক প্রশিক্ষণ, নকশা, প্যাকেজিং ও বিপণন কৌশল থাকলে একই কাঁচামাল থেকে বেশি মূল্য সংযোজন করা যায়। তৃতীয়ত, সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে এই জীবিকাকে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। প্রশিক্ষণের সঙ্গে ঋণ, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ব্যবস্থাপনা, বাজার সংযোগ, ব্র্যান্ডিং এবং বিপণনের পরিকাঠামো যুক্ত করতে হবে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে সরকারি ও বেসরকারি ক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে নিয়মিত বাজার তৈরি হতে পারে। চতুর্থত, দর নির্ধারণে স্বচ্ছতা দরকার। একটি শালপাতার থালা তৈরি করতে কত সময় লাগে, কত শ্রম লাগে, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ কত— তার ভিত্তিতে ন্যূনতম ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের আলোচনা হওয়া দরকার। শুধু ‘পাতা তো জঙ্গল থেকে পাওয়া যায়’ বলে তার দাম কমিয়ে দেওয়া যায় না। প্রাকৃতিক সম্পদ বিনামূল্যে পাওয়া গেলেও মানুষের শ্রম বিনামূল্যে নয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বন সংরক্ষণ। শালপাতার অর্থনীতি টিকবে জঙ্গল টিকলে। অতিরিক্ত পাতা সংগ্রহ, অনিয়ন্ত্রিত বনসম্পদ ব্যবহার কিংবা বাণিজ্যিক চাহিদার চাপে বনভূমির ক্ষতি হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেই মানুষগুলিই, যাঁদের জীবিকা জঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত। তাই বনকে শুধু রাজস্বের উৎস হিসেবে নয়, স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের অংশ হিসেবেও দেখতে হবে। বন সংরক্ষণ এবং বননির্ভর জীবিকা— এই দুটিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সমন্বিতভাবে এগোতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, শালপাতার অর্থনীতিকে ‘গরিব মানুষের ছোটখাটো কাজ’ হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। এটি একটি স্থানীয় সবুজ অর্থনীতি। এখানে রয়েছে কাঁচামাল, শ্রম, উৎপাদন, মূল্য সংযোজন, বাজার এবং সম্ভাব্য রপ্তানি— অর্থাৎ একটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক শৃঙ্খল। সেই শৃঙ্খলের কেন্দ্রে থাকা নারী শ্রমিকদের যদি ন্যায্য অংশ না দেওয়া হয়, তবে উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
ঝাড়গ্রামের শালপাতা আমাদের সামনে তাই একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে— জঙ্গল থেকে যে সম্পদ আসে, তার মালিকানা ও সুবিধা কার? যে নারী ভোরে জঙ্গলে যান, তাঁর শ্রমের দাম কে ঠিক করেন? যে হাতে পাতা সেলাই হয়ে থালা তৈরি হয়, সেই হাত কেন বাজারদরের নিয়ন্ত্রক নয়? পরিবেশবান্ধব পণ্যের নামে বাজার যখন নতুন মূল্য তৈরি করছে, তখন সেই মূল্যের ন্যায্য অংশ কি উৎপাদক মহিলাদের কাছে পৌঁছচ্ছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সময় শেষ।
ঝাড়গ্রামের শালপাতাকে যদি সত্যিই অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হয়, তবে শুধু পাতার বাজার বাড়ালেই হবে না— পাতা সংগ্রহকারী নারীর ক্ষমতাও বাড়াতে হবে। তাঁদের সংগঠিত করতে হবে, প্রশিক্ষিত করতে হবে, সরাসরি বাজারে পৌঁছে দিতে হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভরতার শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। কারণ শালপাতা জঙ্গলের দান হতে পারে, কিন্তু সেই পাতাকে অর্থে পরিণত করার পেছনে যে শ্রম— সেটি নারীর। আর শ্রমের ন্যায্য মূল্য কোনও দয়া নয়, অধিকার। ঝাড়গ্রামের জঙ্গলে প্রতিদিন যে মহিলারা ঝুড়ি-বস্তা হাতে হাঁটেন, তাঁদের গল্প তাই দারিদ্র্যের গল্প নয়। এটি সম্ভাবনার গল্প। প্রশ্ন শুধু একটাই— সেই সম্ভাবনার মালিকানা কি তাঁদের হাতেই থাকবে, নাকি জঙ্গলের পাতা থেকে তৈরি সম্পদের বড় অংশও চলে যাবে অন্যের ঝুলিতে?