সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে নেমে নিহত তিন শ্রমিক

Police Inspector Mysterious Death Photo-Representative

দিল্লির মুন্ডকা শিল্পাঞ্চলে একটি সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে নেমে তিন শ্রমিকের মৃত্যু— এই সংবাদ আর নতুন নয়, কিন্তু প্রতিবারই এটি আমাদের বিবেককে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। অরুণ, সন্দীপ ও চাঁদ— তিনজন মানুষ, তিনটি পরিবার, তিনটি জীবন— এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল বিষাক্ত গ্যাসের দমবন্ধ অন্ধকারে। তাঁদের মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি সংগঠিত অবহেলার ফল। ভারতে ‘ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং’ বা মানুষের হাত দিয়ে মলমূত্র পরিষ্কারের প্রথা আইনত নিষিদ্ধ। ২০১৩ সালের আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনও মানুষকে সেপটিক ট্যাঙ্ক বা নর্দমায় নামিয়ে পরিষ্কার করানো যাবে না। তবুও বাস্তবে এই নিষিদ্ধ প্রথা আজও বহাল তবিয়তে চলছে। প্রশ্ন হল, আইন থাকলে কাজ হচ্ছে না কেন?
প্রাথমিক তদন্ত বলছে, ওই তিন শ্রমিক একে একে ট্যাঙ্কে নেমেছিলেন এবং বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান। এই চিত্র অত্যন্ত পরিচিত। প্রায় প্রতিটি এমন ঘটনায় দেখা যায়, একজন অসুস্থ হলে তাঁকে বাঁচাতে আরেকজন নামেন, তারপর আরও একজন— এভাবেই মৃত্যু চক্রাকারে গ্রাস করে। অথচ এই কাজ সম্পূর্ণ যান্ত্রিক পদ্ধতিতে করার কথা। তাহলে কেন এখনও মানুষকে মৃত্যুকূপে নামানো হচ্ছে?এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং দায়িত্ব এড়ানোর সংস্কৃতিতে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, শিল্পাঞ্চলের সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের দায়িত্ব একটি নির্দিষ্ট সংস্থার। কিন্তু বাস্তবে ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ করানো হয় এবং সেই ঠিকাদাররা আবার সস্তা শ্রমিক খুঁজে এনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করান। এই চক্রে শ্রমিকের জীবনের কোনও মূল্য নেই।
এই ঘটনায় কারখানার মালিক, ঠিকাদার এবং এক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, শুধু গ্রেফতার করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরনের মামলা দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হয়, এবং দোষীরা শেষ পর্যন্ত শাস্তি এড়িয়ে যায়। ফলে এই মৃত্যুগুলি একের পর এক পরিসংখ্যান হয়ে জমা পড়ে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয় না।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে দিল্লিতে নর্দমা ও সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে অন্তত ৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটি কেবল একটি শহরের হিসাব। গোটা দেশের চিত্র আরও ভয়াবহ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, অভিযোগের সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে। অর্থাৎ সমস্যা কমছে না, বরং বাড়ছে।
এই প্রেক্ষিতে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, প্রযুক্তির অভাব নেই। আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নিরাপদে এই কাজ করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, সচেতনতারও অভাব নেই— কারণ আইন, নির্দেশিকা এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ সবই রয়েছে। তবুও বাস্তবে পরিবর্তন হচ্ছে না, কারণ বাস্তবায়নের ইচ্ছাশক্তির অভাব।এই ঘটনায় মানবিক দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা এই কাজ করেন, তাঁরা সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক অংশের মানুষ। প্রায়শই তাঁদের নির্দিষ্ট জাতিগত পরিচয়ের কারণে এই পেশায় ঠেলে দেওয়া হয়। ফলে এটি শুধু শ্রমিক সুরক্ষার প্রশ্ন নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।
অতএব, এখন সময় এসেছে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার।
প্রথমত, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিষ্কার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বেআইনি ভাবে শ্রমিক নামালে তাৎক্ষণিক কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দিতে হবে। এবং সর্বোপরি, এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে সমাজব্যাপী সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। মুন্ডকার এই মৃত্যু আমাদের আবার মনে করিয়ে দিল—উন্নয়নের আলো যতই উজ্জ্বল হোক, যদি তার নীচে অন্ধকারে মানুষ মরতে থাকে, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। প্রশ্নটি তাই শুধুমাত্র প্রশাসনের নয়, আমাদের সকলের— আমরা কি সত্যিই এই অমানবিক প্রথা বন্ধ করতে চাই, নাকি কেবল পরবর্তী দুর্ঘটনার জন্য অপেক্ষা করব?