আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু: সত্য ও মানবিকতার প্রশ্ন

Image: IANS

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু শুধু রাজনৈতিক দলের বিবাদের বিষয় নয়, এটি আমাদের রাজনীতির সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এনে দিয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একজন প্রবীণ নেতা, প্রাক্তন মন্ত্রী, প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার এবং রামপুরহাটের পাঁচ বারের বিধায়কের এভাবে চলে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই শোকের। তার থেকেও বড় কথা, তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, সেগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে যেন রাজনৈতিক স্বার্থ সত্য অনুসন্ধানের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন অধ্যাপনা থেকে রাজনীতিতে আসা একজন মানুষ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জীবনে তাঁর দলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠলেও, তাঁর পরিচিতির একটি বড় অংশ ছিল তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং পাশে একটি দীর্ঘ চিঠি পাওয়া— এই দুই ঘটনা স্বাভাবিক ভাবেই বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

চিঠিটি আদৌ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কি না, সেটিই এখনও তদন্তের বিষয়। চিঠিতে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কথা বলেছেন বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু কোনও চিঠি পাওয়া গেলেই তার ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। পুলিশি তদন্ত, ময়নাতদন্ত এবং ফরেন্সিক পরীক্ষার ফলই প্রকৃত সত্য সামনে আনতে পারে। তাই এই মুহূর্তে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নয়, প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত।


এই কারণেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে একজন ‘সজ্জন’ রাজনীতিবিদ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি পুলিশ ও প্রশাসনকে যথাযথ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আশিসের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করার কথাও বলেছেন। বিশেষ করে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরির পর কোনও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা তাঁকে ফোন বা বার্তা পাঠিয়েছিলেন কি না, তাঁকে কোনও ভাবে চাপ বা ব্ল্যাকমেলের মুখে পড়তে হয়েছিল কি না— সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, বিজেপির পক্ষ থেকে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, এমন কোনও তথ্য তাঁর কাছে নেই। অর্থাৎ তদন্তের সব সম্ভাবনাই খোলা রাখা উচিত— মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য এখানেই।

তবে এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হওয়া মোটেই কাম্য নয়। তৃণমূলের নেতারা যেমন অভিযোগের রাজনীতি এবং মানসিক চাপের কথা বলছেন, তেমনই বিরোধী শিবিরের নেতারাও দলের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও সাংগঠনিক ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুলছেন। প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্য তদন্তকারীদের কাছে প্রাসঙ্গিক হতে পারে, কিন্তু কোনও পক্ষের রাজনৈতিক অভিযোগই প্রমাণের বিকল্প নয়।
আজকের রাজনীতিতে অভিযোগ অনেক সময় তদন্তের আগেই মানুষের কাছে ‘সত্য’ হয়ে যায়।

সামাজমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমে একজন মানুষের দীর্ঘদিনের অর্জন মুহূর্তেই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। পরে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও সেই ক্ষত সহজে মুছে যায় না। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুকে ঘিরে এই প্রবণতা নিয়ে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার।একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তাঁর পরিবার, তাঁর অসমাপ্ত জীবন এবং তাঁর আপনজনেদের শোক।

তাই এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলির কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সংযম দেখানো। দোষী কেউ থাকলে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। আবার নির্দোষ কাউকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করা হলেও তার বিচার হওয়া দরকার। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, সেই উত্তর তদন্তই দিক। কোনও পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। কারণ সত্যের কোনও দল নেই। একজন মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও নেই। আর সেই সত্য উদ্ঘাটনের মধ্যেই তাঁর পরিবার এবং বৃহত্তর সমাজের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব।