শোভনলাল চক্রবর্তী
সময় বদলে যায়, বদলে যায় মানুষের মন। সময়ের সরণিতে ইতিহাসের পালাবদল ঘটে। কৃষি বনাম শিল্পের দ্বৈরথে আজও বহমান। অথচ তার চাহিদায় আমূল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। বছর কুড়ি আগে এ রাজ্যে কৃষি বনাম শিল্প নিয়ে যে ভয়ঙ্কর পরিণতি তৈরি হয়েছিল, তা আজও জীবন্ত ইতিহাস। সেখানে কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনে যে তীব্র প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছিল,তা আজ আর নেই। অনিচ্ছুক কৃষকরাই আজ শিল্পায়নের পক্ষপাতী। সিঙ্গুর থেকে বিতাড়িত টাটা শিল্পগোষ্ঠীর পরিত্যক্ত অফলা জমিতেই এখন টাটাকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষির ভিত্তিতে শিল্পের ভবিষ্যৎ দেখতে চাওয়া মানুষের মনেও শিল্পের সাঁঝবাতির রূপকথা জেগে উঠেছে। সেক্ষেত্রে সেদিনের রক্তাক্ত ইতিহাস অবিস্মরণীয় হলেও তাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন ইতিহাস প্রত্যাশা জাগিয়ে চলেছে। আসলে সরকারি উদ্যোগে শিল্পস্থাপন নিয়ে হুগলি জেলার সিঙ্গুর থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে কৃষি বনাম শিল্পের বুনিয়াদি চেতনায় যেভাবে জনমানসে তীব্র আন্দোলনের পরিসর সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা ইতিপূর্বে কখনও লক্ষ করা যায়নি।
বিশেষ করে যেখানে কৃষি থেকে শিল্পমুখী আধুনিক চেতনা আপনাতেই সক্রিয়তা লাভ করে, সেখানে শিল্পপ্রতিস্থাপনে সরকারি সক্রিয় উদ্যোগেও জনসমর্থন লাভে ব্যর্থ হওয়াই শুধু নয়, তা প্রতিরোধে আপ্রাণপ্রয়াস তীব্র আন্দোলনে পরিণত হয়। বিশেষ করে উন্নয়নের নামে ভিটেছাড়া করার বার্তায় আত্মসংকটের তীব্রতা শুধু জনসাধারণ্যে সরকারবিরোধী মানসিকতাকে উচ্চকিত করেনি, সেইসঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিও প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে। তার ফলে তার পরিসর শুধুমাত্র আঞ্চলিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, রাজনীতির বৃহত্তর আঙিনায় তা সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। শিল্পের জন্য জোর করে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সময়ান্তরে দ্রুতগতিতে সরকারে থাকার নির্ণায়ক শক্তির আধারে সক্রিয়তা লাভ করে। সেক্ষেত্রে জমি দিতে ইচ্ছুকের চেয়ে অনিচ্ছুকের পাল্লা ভারী না-হলেও বাইরের রাজনৈতিক শক্তির সক্রিয়তায় সেই আন্দোলন মুখরতায় সারা রাজ্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
শুধু তাই নয়, সরকারের পাশাপাশি শাসকদলের তৎপরতায় সেই আন্দোলনকে দমন-পীড়নের নির্মম প্রয়াসে সেই আন্দোলন আরও গতিলাভ করে। এজন্য স্বল্পসময়ের মধ্যে সেই আন্দোলন রঙিন গণমাধ্যমের দৌলতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ থেকে সুধীজনের সংবেদনশীলতাকে সক্রিয় করে তোলে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গণমাধ্যমের সরাসরি সংযোগের বিষয়টি ইতিপূর্বের আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত ছিল না। সেক্ষেত্রে দ্রুতগতিতে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের সংবাদভাষ্য যেভাবে সরাসরি দূরদর্শনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে শুধু জনমত গড়ে তোলাই সহজসাধ্য হয়নি, সেইসঙ্গে সেই আন্দোলন নিয়ে জনমানসে অস্তিত্ব-সংকটের সোপানে পক্ষ-প্রতিপক্ষের অবস্থানজনিত পরিসরটিকেও নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
২০০৬-এর ডিসেম্বরের সূচনায় টাটাকে গাড়ি শিল্প গড়ে তোলার জন্য জমি অধিগ্রহণের জন্য বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হওয়ায় অনিচ্ছুক গ্রামবাসীদের প্রতিরোধ ক্রমে প্রতিবাদের পথে অগ্রসর হয়। সেক্ষেত্রে অচিরেই সেই কৃষিজমি রক্ষা কমিটির আন্দোলনকে দমনের জন্য আন্দোলনকারীদের উপর নির্মম পাশবিকতা নেমে আসে। ১৮ ডিসেম্বর আন্দোলনে সামিল হওয়া কিশোরী তাপসী মালিক ধর্ষিত হয়ে রেহাই পায়নি, প্রমাণ লোপাটে কিশোরীর জীবনদীপ নেভাতেও বাধ্য হয়। অবশ্য এই নৃশংস হত্যালীলাই অনিচ্ছুক কৃষিজীবীদের যেমন আরও বেশি সক্রিয় করে তোলে, তেমনই জনসমর্থনের পরিসরকে বিস্তৃতি দান করে। সেই সমর্থন আজ কঠোর বাস্তবতায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছে, জেগে উঠেছে শিল্পায়নের তীব্র আকুতি।
অন্যদিকে, সিঙ্গুরের কৃষিজমি রক্ষা কমিটির আন্দোলনের দৃষ্টান্তে জোর করে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি জনমানসে যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল, তা তার অব্যবহিত পরিসরে নন্দীগ্রামের ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির পরের মাস তথা জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস টানা আন্দোলনের মধ্যেই প্রতীয়মান। ইন্দোনেশিয়ার সালিম গ্রুফের কেমিক্যাল হাবের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তথা ‘সেজ’-এর মাধ্যমে সরকারিভাবে দশ হাজার একর কৃষিজমি অধিগ্রহণের বার্তারই বিরুদ্ধে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আবির্ভাব ছিল তাই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে জনমানসের তীব্র প্রতিবাদের ঐকতান। আর সেই প্রতিবাদকে নির্মমভাবে দমন করতে গিয়ে
২০০৭-এর ১৪ মার্চ যেভাবে চোদ্দোজন গ্রামবাসীকে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হয়, তা শুধু সেই আন্দোলনকে রক্তাক্ত ইতিহাসে সামিল করেনি, বরং সেই আগ্নেয় অস্ত্রে ঝলসানো আলোই জনমানসে প্রতিবাদী মশাল হয়ে ওঠে। যার প্রতিফলন সমাজের প্রায় সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য তা শুধু প্রতিবাদী চেতনাতেই সীমায়িত থাকে না, তার বিপ্রতীপে জনমত গড়ে তোলার প্রয়াসও সক্রিয় হয়। সেখানে পক্ষ-প্রতিপক্ষের দ্বন্দ্ব অপেক্ষা মানবিক সাপেক্ষই প্রাধান্য লাভ করায় তার রাজনৈতিক মেরুকরণ অপেক্ষা জনগণের স্বাধিকারের প্রশ্নটিই জনমানসে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সেক্ষেত্রে শাসকবিরোধী অবস্থানে শুধু বিরোধী দলই নয়, শাসকদলের আদর্শপুষ্ট সমর্থকের সরে আসার বিষয়টিও বিশেষভাবে স্মরণীয়। নন্দীগ্রামের ১৪ মার্চের গণহত্যায় বিশ্বাস ও ভালোবাসার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মাঝে যেভাবে ফাটল ধরিয়ে সেই আদর্শবোধে আঘাত হেনেছে, তাতে সিঙ্গুরের কৃষিজমি রক্ষণ আন্দোলনের অভিমুখটি মানবতা সুরক্ষার বিপ্লবের দিকে ধাবিত হয়।
সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক অবস্থান থেকে সংগঠিত আন্দোলনই সময়ান্তরে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে গণআন্দোলনের রূপ লাভ করে, তা শুধু অভাবিতই নয়, অভিনবও বটে। স্বাভাবিকভাবেই এরূপ আন্দোলনমুখর পরিসরে বাংলা ছোটগল্পের সাময়িক অনুবাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কেননা ছোটগল্পের ইতিহাসে তার পরিচয় বারেবারেই ফিরে এসেছে। এখানে বরং আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা লক্ষণীয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে বুদ্ধদেব বসুর প্রকট অভিমতেই তা প্রতীয়মান। শেষের জন তো তাঁর ‘ছোটগল্পের কথা’ প্রবন্ধে বলেই দিয়েছেন, ‘বাঙলাদেশ ছোটগল্পের দেশ নয়, ইহা কবিতার দেশ।’ শুধু তাই নয়, কবির সংখ্যাবৃদ্ধিতে বুদ্ধদের বসুর অনুসিদ্ধান্ত, ‘ইহাতেই বুঝা যায় যে, ছোটগল্প জিনিষটি বাংলার মাটিতে ভালো ফলে না।’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় ‘কল্লোল’-এর ১৩৩৪-এর ভাদ্র সংখ্যায়। ফলে সময়ান্তরে ভাবুক বাঙালি কবিপ্রকৃতির মধ্যেও বাংলা ছোটগল্পের সজীবতা বর্তমান তা তার ফলনের প্রাচুর্যে ও তার গুণমানের উৎকর্ষেই প্রতীয়মান। শুধু তাই নয়, বাংলা সাহিত্যের ধারায় ছোটগল্পের বনেদিয়ানা অগ্রসরমান। সেখানে কবিতার পাশে গল্পের সহাবস্থান অত্যন্ত স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, কবিতার আধারের গল্পবীজও শাখা-প্রশাখা মেলেধরেছে। সময়ের সংযোগে তার স্বভাবিক অধিকার ইতিমধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত। গণমাধ্যমের দৌলতে জনমানসে তার তীব্র প্রতিক্রিয়ার আঁচের আগুনে শুধু উত্তাপ নয়, মাঝে মাঝে আলোও নিষ্কাশিত হয়েছ।
সেক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো ছোটগল্পও জনসংযোগে গণমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে। কবিতার পাশে গল্পের আবেদনও মুখর মনে হয়। অন্যদিকে আন্দোলনের অভিঘাত এতটাই তীব্রতা লাভ করেছিল যে তার অব্যবহিত পরিসরেই তা সংবেদনশীল কবি-সাহিত্যকদের সক্রিয় করে তোলে। ১৪ মার্চের নৃশংস হত্যালীলার পর প্রতিবাদের অভিব্যক্তি নানাভাবে সংবাদপত্রে সংবাদের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে। অবশ্য সিঙ্গুরের আন্দোলন দানা বাঁধার পূর্বেই মহাশ্বেতা দেবীর মতো কথাসাহিত্যিকের প্রতিবাদী কলাম ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’-এ প্রকাশিত হয়েছে। কবীর সুমনের কবিতাও তাতে প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে জয় গোস্বামীর কবিতা তো জনমানসে সাড়া জাগিয়ে তোলে। আন্দোলনের প্রভাব জনমানসকে কতটা প্রভাবিত করেছিল, তার পরিচয় সাহিত্যের মাধ্যমে প্রতীয়মান। বাস্তবতার নিষ্ঠুরতায় ক্ষতবিক্ষত মনে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন জেগে ওঠে বলেই ইতিহাস বদলে যায়। তারই আয়োজনে কৃষিমুখী মনেই আজ শিল্পের দাবি সোচ্চার হয়ে ওঠে।
২০০৬-এর ডিসেম্বরে সিঙ্গুর আন্দোলনের অব্যহিত পরিসরেই ২০০৭-এর জানুয়ারিতে গৌতম সরকার সম্পাদিত ‘এখন বিসংবাদ’-এ প্রকাশিত কবিতা ও গদ্যের সংকলন ‘ভূমিরাক্ষস এবং রাজকুমার’ গ্রন্থটি লক্ষ্যের কথাও প্রচ্ছদে মুদ্রিত হয়েছে, ‘কৃষি জমি রক্ষা আন্দোলনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপক সাহিত্য সংকলন’। এই সংকলনে গদ্যাংশে তিনটি গল্পও রয়েছ। অবশ্য সেগুলিতে উচ্ছেদের কথাই প্রাধান্য লাভ করেছে। শুধু তাই নয়, সরাসরি সিঙ্গুরে কীভাবে জোর করে জমিঅধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চলেছে তার পরিচয়ের পাশাপাশি বাইরের প্রতিবাদী মানুষের সাহচর্যে কীভাবে প্রতিরোধী গ্রামবাসীদের ভূমিকা সক্রিয়তা লাভ করেছে, তার কথাও উঠে এসেছে। শর্মিলা ঘোষের ‘হেই সামালো’, সৌমেন্দ্র গোস্বামীর ‘বপন’ও বিষ্ণু বিশ্বাসের ‘ছোট বকুলপুরের পরের স্টেশন’ গল্পত্রয়ের মধ্য তার পরিচয় বর্তমান। অন্যদিকে ২০০৭-এর ১৪ মার্চে নৃশংস প্রাণহানির পর তার প্রতিবাদের পক্ষে-বিপক্ষে জনমত গড়ে তোলার লড়াই বাংলা সাহিত্যের বহু শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, সেই ধারা আজও বহমান।
কৃষি জমি রক্ষা আন্দোলন থেকে শিল্প বনাম কৃষির দ্বৈরথে জনমানসে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঐতিহাসিক প্রতিবাদী আন্দোলন আজও যেমন বিতর্কিত, তেমনই সমান প্রাসঙ্গিক ও বিপ্লবী কণ্ঠস্বর। যেখানেই জমি দখলের বিরোধিতা উঠে আসে, সেখানেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনে কথা মুখে মুখে ফেরে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষি জমি রক্ষা আন্দোলন চলমান ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে, ভাবা যায়! অথচ সেই ইতিহাসই সময়ান্তরে প্রয়োজনের স্বার্থে সময়ের দাবির প্রতি আনত হয়ে শিল্পায়নের পথে ধাবিত হতে চায় । এই চাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়,বরং জীবন জীবিকার স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি। সিঙ্গুরের অচাষযোগ্য অফলা জমিতেই শিল্পের চাষ যে জীবিকাকে শুধু সমৃদ্ধ করবে না, জীবনকেও নবজীবন দান করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না । সেই স্বপ্নে বিভোর হতে চাওয়া সেদিনের অনিচ্ছুক কৃষক আজ নতুন ভোরের অধীর প্রতীক্ষায় জেগে আছে, সেটাও ভাবা যায়!