উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য মণিপুর আবার সংবাদ শিরোনামে, আর সেই একই কারণে– হিংসা। গত কয়েক বছরে এই রাজ্য বারবার জাতিগত সংঘর্ষ, অবিশ্বাস এবং অস্থিরতার সাক্ষী থেকেছে। এপ্রিলের শুরুতে দুই শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে নতুন হিংসার পর্ব শুরু হয়েছে, তা দ্রুত আরও প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক কারণ, এই অশান্তি শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন রাজ্যটি ধীরে ধীরে শান্তির পথে ফিরতে শুরু করেছিল।
মণিপুরের সমাজ কাঠামো বহুস্তরীয়। এখানে মেইতেই, কুকি এবং নাগা—এই তিনটি প্রধান জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন রয়েছে। অতীতে মেইতেই ও কুকিদের সংঘর্ষ ছিল প্রধান, কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে কুকি ও নাগাদের মধ্যে সংঘাত নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই পরিবর্তনই প্রমাণ করে যে সমস্যা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বহুস্তরীয় এবং গভীর।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ইউম্নাম খেমচন্দ সিং দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তিনি সংলাপ, সমঝোতা এবং প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে চাইছেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এই প্রচেষ্টা এখনও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। কারণ সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।
এই হিংসার একটি বড় কারণ হল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি। এই গোষ্ঠীগুলি নিজেদের নিরাপত্তার অজুহাতে অস্ত্র হাতে নিয়ে গ্রাম ও অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। ফলে একটি অদৃশ্য ভয় ও উত্তেজনা সবসময় বিরাজ করে। সামান্য জমি নিয়ে বিরোধ, সীমান্ত সংক্রান্ত মতবিরোধ বা গুজব— এই সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায়? আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু যখন সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মিলিশিয়ার উপর নির্ভর করতে শুরু করে, তখন তা স্পষ্ট যে প্রশাসনের প্রতি আস্থা কমে গেছে। এই আস্থাহীনতা দূর না হলে শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে রাজ্যের সংকটময় সময়ে কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন সেই ভুল শুধরে নেওয়ার সময়। কেন্দ্রকে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করে নিশ্চিত করতে হবে যে, রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলে সরকারের আইনই শেষ কথা— কোনও গোষ্ঠীর নয়। একই সঙ্গে, সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সংলাপ বাড়াতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এখানে রাজ্যের রাজ্যপাল অজয় কুমার ভল্লার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অতীতে প্রশাসনিক দৃঢ়তা দেখিয়ে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে পারেন।
তবে শুধুমাত্র প্রশাসনিক কড়া পদক্ষেপেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তনেরও। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করতে হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে একটি সহাবস্থানের পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রই নিশ্চিত করবে, তাহলে তারা আর অস্ত্রের উপর নির্ভর করবে না। সেই আস্থা তৈরি করতে সরকারকে স্বচ্ছতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং দৃঢ়তা— এই তিনটি গুণ একসঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে।
মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি শুধুমাত্র একটি রাজ্যের সমস্যা নয়, এটি ভারতের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকার, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়— সকলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
হিংসা কোনও সমস্যার সমাধান নয়, বরং তা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। তাই এখনই সময়, সব পক্ষকে সংযম দেখিয়ে শান্তির পথে এগিয়ে আসার। মণিপুরের মানুষ বহুদিন ধরে অশান্তির মধ্যে বসবাস করছেন, তাঁদের প্রাপ্য একটি নিরাপদ ও শান্ত জীবন। সেই লক্ষ্যেই এগোতে হবে, এখনই।