দিল্লির এসআইআরের ক্ষেত্রে সমস্যার আকারটি ছোট নয়

প্রতীকী চিত্র

শনিবারের বৈঠকের পরে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত সিদ্ধান্তগুলিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আছে— প্রশ্ন উঠলে তার জবাব দিতে হবে, এবং ভোটারকে শুধু দপ্তরের দরজায় দাঁড় করিয়ে না রেখে প্রয়োজন হলে প্রশাসনকেই তাঁর কাছে পৌঁছতে হবে। এই মনোভাব বজায় রাখা এখন অত্যন্ত জরুরি।

দিল্লির বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআরের ক্ষেত্রে সমস্যার আকারটি ছোট নয়। ৩১ আগস্ট প্রকাশিত খসড়া তালিকায় প্রায় ৯৭.৫ লক্ষ ভোটারের নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩১.৬ লক্ষকে ‘নো ম্যাপিং’ এবং ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’-র মতো কারণে নোটিস দেওয়া হয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে যদি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ইআরও বা এইআরও-র দপ্তরে বারবার যেতে হয়, তা হলে প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে উঠতেই পারে।

এই জায়গায় কমিশনের নতুন নির্দেশ বাস্তবিক স্বস্তি দিতে পারে। নোটিস পাওয়া ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে বিএলও-রা প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করবেন এবং তা ECINET-এ আপলোড করবেন। সাধারণভাবে তাঁদের ব্যক্তিগত শুনানির জন্য দফতরে ডাকার কথা নয়, বিশেষ পরিস্থিতিতে শুনানি প্রয়োজন হলে তা অনলাইনে করার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে কিছুটা হলেও নাগরিকের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ হল, এই সিদ্ধান্ত কাগজে না থেকে বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।


কারণ, দিল্লিতে এই দায়িত্ব সামলানোর জন্য প্রায় ১৪ হাজার বিএলও এবং ১২০০ ইআরও কাজ করছেন। এত বিপুল সংখ্যক নোটিসের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ভোটারের কাছে পৌঁছনো সহজ কাজ নয়। তাই সাহায্যকেন্দ্র এবং বিশেষ শিবিরের ঘোষণা যথেষ্ট নয়; সেগুলি কোথায়, কখন এবং কীভাবে কাজ করছে, তা মানুষকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। বিশেষ করে রাতের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ, শ্রমিক, দরিদ্র, গৃহহীন এবং নথিপত্রের সমস্যায় থাকা নাগরিকদের জন্য ব্যবস্থা কার্যকর হওয়া জরুরি। দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের ওয়েবসাইটেও ইতিমধ্যে বিশেষ শিবিরের ঘোষণা এসেছে।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফর্ম-৬। নতুন ভোটারদের জন্য এই ফর্ম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু এসআইআরের ক্ষেত্রে অতীতের ভোটার তালিকায় বাবা-মা বা ঠাকুরদা-ঠাকুমার নামের মতো তথ্য চাওয়া হলে অনেকের পক্ষেই তা দেওয়া কঠিন হতে পারে। বিশেষত অভিবাসী ও নথির ঘাটতিতে থাকা পরিবারের ক্ষেত্রে পুরনো তথ্য খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। কমিশন জানিয়েছে, এসআইআরের বাইরে নিয়মিত সময়ে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ফর্ম-৬ ব্যবহার করা হবে।

প্রযুক্তি নিয়েও একই সতর্কতা প্রয়োজন। ECINET-এ ক্ষেত্র পর্যায়ের আধিকারিকদের ক্ষমতা অনুযায়ী প্রবেশাধিকার রয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে। সেই ব্যবস্থা আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করতে একজন স্বাধীন আইআইটি বিশেষজ্ঞকে নিয়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও হয়েছে। এই পর্যালোচনা দ্রুত এবং বিশ্বাসযোগ্য ভাবে সম্পন্ন হলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার উপর আস্থা বাড়বে।

নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু নিয়ম মেনে চলা নয়, সেই নিয়ম নাগরিকের কাছে বোধগম্য ও বাস্তবসম্মত করে তোলাও। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়েছে, প্রশ্ন উঠলে ব্যাখ্যা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে পদ্ধতিতে সংশোধন আনা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক দায়িত্ব। তাই শনিবারের সিদ্ধান্তের আসল পরীক্ষা এখন বাস্তবায়নে। সাহায্যকেন্দ্র, বিএলও-র বাড়ি-বাড়ি যাওয়া এবং ECINET-এর সুরক্ষা— প্রতিটি প্রতিশ্রুতিই কার্যকর হলে তবেই ভোটারের আস্থা দৃঢ় হবে।