বদলে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গ্রাফ, নজরে ভারত-জাপান

Photo: File Photo

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একদিকে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা— এই দুইয়ের চাপে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চরিত্র বদলে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও জাপানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ভারত সফর শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে।

এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দুই দেশ তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বহুপাক্ষিক জোট বা কাঠামোর সীমাবদ্ধতার বাইরে রাখতে আগ্রহী। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক জোটগুলির ওঠানামা বা অনিশ্চয়তার প্রভাব যেন ভারত-জাপান সম্পর্কের উপর না পড়ে, সে বিষয়ে তারা সচেতন। বর্তমান সময়ে ‘কোয়াড’ বা ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণা নিয়ে বিভিন্ন দেশের অবস্থান পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা দ্বিধা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও জাপান নিজেদের পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরও দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড় করাতে চাইছে।

দুই দেশের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, যার মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি বড় প্রশ্ন। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি অস্থির হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে ভারত ও জাপানের মতো জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতির উপর। তাই সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। এই কারণেই দুই দেশ ‘মেরিটাইম এনার্জি ট্রান্সপোর্ট ভ্যালু চেইন’-এ যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, সমুদ্রপথের নিরাপত্তাও আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।


এছাড়া সামুদ্রিক নজরদারি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। দক্ষিণ চিন সাগর ও পূর্ব চিন সাগরের পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ স্পষ্ট। এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে।

ভারত-জাপান সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা এই সহযোগিতার একটি বড় অংশ। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে জাপানের বিনিয়োগ রয়েছে। এই প্রকল্পগুলিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে একটি শক্তিশালী শিল্প ও বাণিজ্যিক করিডর গড়ে উঠতে পারে। এতে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও বাড়বে।

এই প্রসঙ্গে বিমস্টেকের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ভারত ও জাপান যদি এই মঞ্চকে আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করে, তবে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। এতে ছোট দেশগুলিও লাভবান হবে এবং একটি বহুমুখী সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে।

তবে এই সম্পর্কের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ভারত ও জাপান দুই দেশকেই একদিকে চিনের সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে। এই ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনই দূরত্বও সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাই অত্যন্ত সতর্ক ও বিচক্ষণ কূটনীতি প্রয়োজন।

সে কারণেই ভারত ও জাপান একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পথ বেছে নিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, অস্থির আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্বই সবচেয়ে বড় শক্তি। এই সম্পর্ক যদি সঠিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তবে তা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বর্তমান বিশ্বে যেখানে অনিশ্চয়তাই একমাত্র নিশ্চিত সত্য, সেখানে ভারত-জাপান সহযোগিতা একটি স্থিতিশীল ও আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে আসছে।