শতাব্দী মালিতা
এক সময় খেলাধুলা মানেই ছিল উন্মুক্ত মাঠ, কপালে ঘাম, বন্ধুদের কলরব আর হার-জিতের মধ্য দিয়ে অর্জিত জীবনবোধের শিক্ষা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই ধুলোমাখা মাঠের জায়গা নিয়েছে চারকোণা এক স্ক্রিন। আঙুলের স্পর্শে খুলে যাচ্ছে এক বিশাল ভার্চুয়াল জগৎ, যেখানে রোমাঞ্চ আছে, যুদ্ধ আছে, তথাকথিত ‘জয়’ আর ‘পুরস্কার’ও আছে— নেই শুধু বাস্তবতা। প্রযুক্তি জীবনকে গতিময় করেছে, তবে সমান্তরালে তৈরি করেছে এক ফাঁদ, অনলাইন গেম। বিনোদনের ছদ্মবেশে এই মারণনেশা মানুষের মন, শরীর এবং দীর্ঘদিনের সমাজবোধকে গ্রাস করে ফেলছে। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের লোনি এলাকায় দুই বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সামনে এক চরম আতঙ্ক এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মাত্র চৌদ্দ ও বারো বছর বয়সী দুই বোন অনলাইন গেম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে এতটাই ডুবে গিয়েছিল যে, বাস্তবের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরিবারের বাধা এবং ফোনের প্রতি আসক্তিতে সৃষ্ট মানসিক বিকৃতি তাদের আত্মহননের পথে ঠেলে দেয়, যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে আমরা শিশুদের হাতে নিছক কোনো খেলনা দিচ্ছি না, বরং তুলে দিচ্ছি এক ধ্বংসাত্মক ‘রিমোট কন্ট্রোল’।
অনলাইন গেম এখন আর কেবল সময় কাটানোর মাধ্যম নয়; প্রতিটি গেম এক একটি জটিল ‘সিমুলেশন’ বা বাস্তব জীবনের বিকল্প এক কৃত্রিম জগৎ। বাস্তব জীবনে যে কিশোর বা কিশোরী হয়তো লাজুক, অন্তর্মুখী কিংবা হতাশ, ভার্চুয়াল জগৎ তাকে ‘নায়ক’, ‘বিজয়ী’ বা ‘ক্ষমতাবান’ হওয়ার স্বাদ দেয়। বাস্তবের অপূর্ণতা, ব্যর্থতা আর একাকীত্বকে ঢেকে দিয়ে এই ডিজিটাল মায়া এমন আসক্তি তৈরি করে, যা মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকায় শিশুদের মধ্যে বাড়ছে অস্থিরতা, অনিদ্রা, স্থূলতা এবং খিটখিটে মেজাজ। তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, হারিয়ে ফেলছে সহমর্মিতা আর ধৈর্য। গাজিয়াবাদের ঘটনাটি কোনও বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। এই ভয়ংকর আসক্তি থেকে আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে কেবল প্রযুক্তিকে দোষারোপ করলে চলবে না, বরং সচেতনতা এবং শিশুদের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানোর অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার হোক শিক্ষার প্রয়োজনে। মনোবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনলাইন গেমের আকর্ষণ কেবল গ্রাফিক্স বা গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মূলে রয়েছে মস্তিষ্কের এক জটিল রাসায়নিক খেলা। গেমের প্রতিটি ছোট-বড় জয়, প্রতিটি নতুন লেভেল পার করা কিংবা কোনো ভার্চুয়াল পুরস্কার জেতা— আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক এক বিশেষ রাসায়নিকের নিঃসরণ ঘটায়। এই ডোপামিন আমাদের মনে এক ধরনের তাৎক্ষণিক আনন্দ ও সাফল্যের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। মানুষ যখনই কোনও গেমে বিজয়ী হয়, তার মস্তিষ্ক এই ‘পুরস্কার’ পাওয়ার আশায় বারবার সেই কাজটির পুনরাবৃত্তি করতে চায়। ঠিক এই প্রক্রিয়াই মানুষকে বারবার স্ক্রিনের সামনে টেনে আনে। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি কেবল বিনোদন বা সময় কাটানোর মাধ্যম মনে হলেও, ধীরে ধীরে তা মানসিক নির্ভরতায় পরিণত হয়। একসময় ডোপামিন নিঃসরণের এই কৃত্রিম চক্রটি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, গেম ছাড়া অন্য কোনো স্বাভাবিক কাজে মানুষ আর আনন্দ খুঁজে পায় না। এভাবেই জন্ম নেয় এক ভয়ংকর আসক্তি।
বিশ্বজুড়ে এই গেমিং আসক্তির ভয়াবহ উদাহরণ অসংখ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ইতিমধ্যেই ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’-কে একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া বা চীনের মতো দেশগুলোতে অনেক কিশোর-কিশোরীকে দেখা গেছে যারা টানা কয়েক দিন খাওয়া-দাওয়া ও ঘুম ত্যাগ করে গেম খেলার ফলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বা শারীরিক অবসাদে মৃত্যুবরণ করেছে। ব্লু হোয়েল বা এই ধরনের মারণ চ্যালেঞ্জগুলোর কথা আমরা জানি, যা বহু প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আসক্তির এই স্তরে পৌঁছলে মানুষের বাস্তব আর কল্পনার মধ্যকার পার্থক্য মুছে যায়। তারা অতিপ্রাকৃত হিংস্রতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা ও আত্মহননের হার বাড়ছে। গেমিং কেবল একটি ডিজিটাল বিনোদন নয়; এর সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে অকেজো করে তাকে একটি যান্ত্রিক দাসে পরিণত করতে পারে। তাই সময় থাকতেই এই ‘ডিজিটাল ড্রাগ’ সম্পর্কে আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি।
‘পোক মোন গো’ চালাতে গিয়ে বহু মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। রাস্তা পার হতে গিয়ে, গাড়ি চালাতে চালাতে, রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এমনকি গবেষণায়ও উঠে এসেছে, গেমের প্রতি অন্ধ মনোযোগ বাস্তব জগতের বিপদ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা কমিয়ে দেয়।
এখানেই সাহিত্যের ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের চমকে দেয়। ‘দ্য মেশিন স্টপস’— এক শতাব্দীরও বেশি আগে ই এম ফর্স্টার এমন এক পৃথিবীর ছবি এঁকেছিলেন, যেখানে মানুষ যন্ত্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। তারা মাটির নিচে ছোট ছোট ঘরে বন্দি, সব প্রয়োজন মেটায় ‘মেশিন’। ফলে মানুষ হাঁটতে ভুলে যায়, চিন্তা করতে ভুলে যায়, সরাসরি সম্পর্ক গড়তে ভুলে যায়। শেষ পর্যন্ত যখন মেশিন থেমে যায়, মানুষও থেমে যায়। কারণ তারা আর মানুষ হিসেবে বাঁচতে শেখেনি।
এটি শুধু কল্পকাহিনি নয়— এটি আমাদের বর্তমানের প্রতিচ্ছবি। ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’-এ অল্ডাস হাক্সলি দেখিয়েছিলেন এমন এক সভ্যতা, যেখানে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম সুখ মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে হত্যা করে। মানুষ আর প্রশ্ন করে না, অনুভব করে না, শুধু ভোগ করে।
‘প্লেয়ার পিয়ানো’-তে কার্ট ভোনেগাট দেখিয়েছেন, যন্ত্র যখন মানুষের কাজ কেড়ে নেয়, তখন মানুষ নিজের প্রয়োজনীয়তাই হারিয়ে ফেলে। এসব সাহিত্যকর্মের সতর্কবার্তা একটাই— যন্ত্র মানুষের সেবক থাকলে ভালো, প্রভু হয়ে উঠলে ভয়ংকর।
আজকের শিশুরা ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। তারা মাঠে যায় না, বন্ধুদের সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলে না, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায় না। তাদের সম্পর্ক এখন হেডফোন, চ্যাটবক্স আর ডিজিটাল অবতারে সীমাবদ্ধ। ফলে সামাজিক দক্ষতা কমছে, সহানুভূতি কমছে, ধৈর্য কমছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো শারীরিক অবক্ষয়।
ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা শরীরকে দুর্বল করে। চোখের সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত, স্থূলতা, মেরুদণ্ডের ব্যথা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা— এসব এখন শিশু-কিশোরদের মধ্যে বাড়ছে। শরীরের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বাস্তব দৌড়ঝাঁপের জায়গা নিয়েছে ভার্চুয়াল দৌড়। কিন্তু সমস্যা শুধু শরীরে নয়— চিন্তাতেও।
গেমের জগৎ মানুষের সিদ্ধান্তকে পূর্বনির্ধারিত করে দেয়। কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কীভাবে জিততে হবে— সব ঠিক করা থাকে। ফলে স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়। মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে নির্দেশ মেনে চলতে। নিজের মতো চিন্তা করার শক্তি কমে যায়। এ যেন আধুনিক ‘মেশিন স্টপস’-এর পুনর্জন্ম।
আজ এআই, অটোমেশন, গেমিফিকেশন— সব মিলিয়ে মানুষ এমন এক জগতে ঢুকছে, যেখানে বাস্তবতা কম, সিমুলেশন বেশি। ভয় এখানেই— যদি একদিন মানুষ বাস্তব কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে? যদি বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে? যদি শিশুরা জীবনকে গেমের মতো ভাবতে শুরু করে?
তাহলে সমাজের ভবিষ্যৎ কোথায়?
প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করার কথা নয়। গেমও শত্রু নয়। সমস্যা তখনই, যখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। বিষ যেমন ওষুধ হতে পারে, তেমন ওষুধও বিষ হতে পারে মাত্রা ছাড়ালে।
অভিভাবকদের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বড়। সন্তানের হাতে শুধু ফোন তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার স্ক্রিন টাইম, মানসিক অবস্থা, বন্ধু-বান্ধব, আচরণ— সব দিকে নজর রাখতে হবে। বাস্তব জীবনের আনন্দ ফিরিয়ে আনতে হবে— বই, মাঠ, সঙ্গীত, শিল্প, পরিবার। স্কুলকেও প্রযুক্তি-সচেতনতার পাশাপাশি প্রযুক্তি-সংযম শেখাতে হবে।
কারণ প্রযুক্তি যদি মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তবে সেই উন্নয়ন আসলে অবনতি।
সাহিত্য, বিজ্ঞান ও বাস্তবতা— সব জায়গা থেকেই একই সতর্কবার্তা আসছে: যন্ত্রের সঙ্গে থাকো, কিন্তু যন্ত্রের ভেতরে হারিয়ে যেও না। আজকের শিশু যদি স্ক্রিনের মধ্যে বড় হয়, কাল সে হয়তো পৃথিবীর আলো সহ্য করতে পারবে না।
আর তখন প্রশ্ন উঠবে— মানুষ কি গেম খেলছিল, নাকি গেমই মানুষকে খেলছিল?