রতন ভট্টাচার্য
পিএম শ্রী বা প্রধানমন্ত্রী স্কুল ফর রাইজিং ইন্ডিয়া প্রকল্পটি সমসাময়িক ভারতের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর এক উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা। এই প্রকল্পের লক্ষ্য দেশের নির্বাচিত সরকারি ও সরকারি-সহায়তাপ্রাপ্ত প্রায় চৌদ্দ হাজার পাঁচশো স্কুলকে এমন এক মডেল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা, যা জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর মূল দর্শনকে বাস্তবে রূপ দেবে। স্বাধীনতার পর থেকে ভারত বহু শিক্ষানীতি দেখেছে, বহু সংস্কার হয়েছে, কিন্তু বাস্তবের শ্রেণিকক্ষে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন সবসময় দেখা যায়নি। পিএম শ্রী প্রকল্প সেই দীর্ঘদিনের ব্যবধান ভরাট করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে— যেখানে শিক্ষা হবে অভিজ্ঞতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সর্বোপরি মানবিক। কিন্তু প্রতিটি বড় স্বপ্নের মতোই এই প্রকল্পের মধ্যেও রয়েছে নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জ, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা। তাই এর প্রতিশ্রুতি ও চ্যালেঞ্জকে বুঝতে হলে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষক-সংকট, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং নীতিনির্ধারণের বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দক্ষতাভিত্তিক করে তোলার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকার পিএম শ্রী প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো দেশের নির্বাচিত সরকারি বিদ্যালয়গুলিকে মডেল স্কুল হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে তারা জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০–এর আদর্শ অনুযায়ী শিক্ষার মান উন্নত করতে পারে।দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গ এই প্রকল্পে যোগ দেয়নি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করে প্রকল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গ এখন সেই রাজ্যগুলির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, যারা পিএম শ্রী-র অধীনে বিদ্যালয় উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সহায়তা পাবে। পিএম শ্রী প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো— বিদ্যালয়গুলিতে উন্নত পরিকাঠামো, স্মার্ট ক্লাসরুম, বহুভাষিক শিক্ষণ, পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করা। এই প্রকল্পে কেন্দ্র ও রাজ্যের অর্থায়ন সাধারণত ৬০:৪০ অনুপাতে হয়, ফলে রাজ্যের সরকারি বিদ্যালয়গুলি অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা পাবে। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বহু বিদ্যালয় আধুনিক প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ল্যাব, গ্রন্থাগার, ক্রীড়া সুবিধা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী পরিবেশ পাবে। এর ফলে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে এবং বিদ্যালয়গুলি স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য শিক্ষাগত উৎকর্ষের কেন্দ্র হয়ে উঠবে। পিএম শ্রী প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের সরকারি বিদ্যালয়গুলিকে নতুন দিশা দেখাতে পারে। পিএম শ্রী প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হলো— বিদ্যমান সরকারি স্কুলগুলিকেই উন্নত করে মডেল স্কুলে পরিণত করা। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বহু বছর ধরে সরকারি শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শহর ও গ্রামের মধ্যে, রাজ্য ও রাজ্যের মধ্যে, সুবিধাভোগী ও বঞ্চিত শ্রেণির মধ্যে শিক্ষার গুণগত ব্যবধান ক্রমশ বেড়েছে। এই প্রকল্প সেই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে। নতুন স্কুল তৈরি না করে পুরনো স্কুলগুলিকেই উন্নত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত, কারণ ভারতের মতো বিশাল দেশে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা অনেক বেশি কার্যকর। এই স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই পড়বে না, বরং প্রকল্পভিত্তিক কাজ, দলগত অনুসন্ধান, শিল্প-সংস্কৃতি, ক্রীড়া, কারিগরি শিক্ষা এবং জীবনদক্ষতার মাধ্যমে নিজেদের বিকশিত করবে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পিএম শ্রী সেই মানসিকতা বদলাতে চায়— শিক্ষাকে আনন্দময়, অনুসন্ধানমূলক এবং বাস্তবজীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়।
এই প্রকল্পের আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি হলো প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভারত দেখেছে ডিজিটাল বিভাজন কত গভীর। লক্ষ লক্ষ শিশু অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে পারেনি, কারণ তাদের কাছে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট ছিল না। পিএম শ্রী স্কুলে স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল ল্যাব, ইন্টারঅ্যাকটিভ বোর্ড, অনলাইন রিসোর্স লাইব্রেরি ইত্যাদি স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তি শুধু শেখার উপকরণ নয়, এটি শিক্ষকদেরও ক্ষমতায়িত করতে পারে— নতুন পদ্ধতি শেখাতে পারে, মূল্যায়নকে সহজ করতে পারে, এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী শেখার পথ তৈরি করতে পারে। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে প্রযুক্তি সরকারি স্কুলগুলির মানোন্নয়নে বিপ্লব ঘটাতে পারে।
পরিবেশবান্ধব স্কুল গড়ে তোলাও পিএমশ্রী-র একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সবুজ উদ্যান, জীববৈচিত্র্য কর্নার— এসব শুধু অবকাঠামো নয়, শিক্ষার্থীদের পরিবেশসচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার উপায়। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পরিবেশশিক্ষা শুধু পাঠ্যসূচির বিষয় নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। পিএম শ্রী স্কুলগুলি যদি সত্যিই পরিবেশবান্ধব মডেল তৈরি করতে পারে, তবে তা দেশের অন্যান্য স্কুলের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।
এই প্রকল্পের আরেকটি প্রতিশ্রুতি হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক, স্থানীয় প্রশাসন এবং শিক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্কুল পরিচালনার মান উন্নত করার কথা বলা হয়েছে। তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, নিয়মিত পর্যালোচনা, এবং সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে স্কুলকে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে। বহু সরকারি স্কুলে প্রশাসনিক উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা এবং পর্যবেক্ষণের অভাব শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পিএম শ্রী সেই সংস্কৃতি বদলাতে চায়। কিন্তু প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি রয়েছে কঠিন বাস্তব। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো ভারতের বিশালতা ও বৈচিত্র্য। দেশে প্রায় পনেরো লক্ষ স্কুল এবং ২৫ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী। তার মধ্যে মাত্র চৌদ্দ হাজার পাঁচশো স্কুলকে মডেল স্কুলে পরিণত করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু এটি মোট স্কুলের এক শতাংশেরও কম। প্রশ্ন হলো— এই মডেল কি সত্যিই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে, নাকি এটি কয়েকটি নির্বাচিত স্কুলেই সীমাবদ্ধ থাকবে? প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে এই মডেল কতটা পুনরুত্পাদনযোগ্য এবং কতটা বাস্তবসম্মতভাবে অন্যান্য স্কুলে প্রয়োগ করা যায় তার ওপর।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষক-সংকট। শিক্ষকই শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ। কিন্তু দেশে বহু স্কুলে শিক্ষকসংখ্যা অপর্যাপ্ত, অনেক শিক্ষককে প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত। পিএম শ্রী স্কুলে আধুনিক প্রশিক্ষণ, নতুন পদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা— সবই প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো— শিক্ষকদের কি পর্যাপ্ত সময়, সম্পদ এবং প্রেরণা দেওয়া হবে? প্রশিক্ষণ যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, তবে প্রকল্পের লক্ষ্য পূরণ হবে না। শিক্ষককে ক্ষমতায়িত না করে কোনো শিক্ষানীতি সফল হতে পারে না। অবকাঠামোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বহু সরকারি স্কুলে এখনও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, শৌচাগার নেই, পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, সুরক্ষিত সীমানা নেই। পিএম শ্রী স্কুলে উন্নত অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন নির্ভর করবে কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়ের ওপর। অর্থ বরাদ্দ, টেন্ডার প্রক্রিয়া, নির্মাণের গতি—সবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা শিক্ষার মানোন্নয়নের একমাত্র শর্ত নয়। পরিকাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষণ-পদ্ধতি, মূল্যবোধ, নেতৃত্ব এবং সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল শিক্ষার ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইন্টারনেট সংযোগ, বিদ্যুৎ, ডিভাইস, ডিজিটাল সাক্ষরতা— সবই অসমভাবে বিতরণ। গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা বাড়িতে ডিজিটাল শিক্ষার সুবিধা পায় না।
শিক্ষকরাও অনেক সময় প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ নন। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে অসম হয়ে পড়তে পারে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাও একটি বড় প্রশ্ন। সরকারি স্কুলে পড়ে সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত শ্রেণির শিশুরা— দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, দরিদ্র, প্রথম-প্রজন্মের শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী শিশু। পিএম শ্রী স্কুল যদি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, তবে তুলনামূলকভাবে সুবিধাভোগী পরিবারগুলি সেখানে ভিড় করতে পারে, আর বঞ্চিত শিশুরা পিছিয়ে পড়তে পারে। তাই প্রকল্পকে এমনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে যাতে সমতা ও অন্তর্ভুক্তি বজায় থাকে। প্রশাসনিক সমন্বয়ও একটি চ্যালেঞ্জ। তবুও, সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও পিএম শ্রী প্রকল্পের সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। যদি এই স্কুলগুলি সত্যিই উদ্ভাবনী শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তবে তা দেশের অন্যান্য স্কুলের জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে।