আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক চলছেই

বাংলায় উৎসবে বা তীর্থে আমিষ-নিরামিষ নিয়ে লড়াই আগে তেমন চোখে পড়ত না। কিন্তু গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক আবহে আমিষ-নিরামিষ দ্বন্দ্ব বড় আকার নিয়েছে। ব্রিগেডে গীতা পাঠের আসরে চিকেন প্যাটিস বিক্রেতার উপর হামলার অভিযোগও উঠেছিল। পুরীর গোবর্ধন পীঠের শঙ্করাচার্য নিশ্চলানন্দ সরস্বতী সাংবাদিক বৈঠকে জানুয়ারি মাসে গঙ্গাসাগর মেলাকে পুরোদস্তুর নিরামিষ করে তোলার পক্ষেই মত দিয়েছিলেন। তবে আমিষ বা মাংস খাওয়াকে পুরোপুরি বাতিল করেননি তিনি, ঘুরিয়ে বলেছিলেন যে, ক্ষেত্রবিশেষে আমিষ খাবার দেশ রক্ষায় কাজে লাগে।

তাৎপর্যপূর্ণ, এ বারের গঙ্গাসাগর মেলায় একটি মন্দির ট্রাস্টের উদ্যোগে নিরামিষ খাবার বিলির কথা শোনা গিয়েছে মেলা কর্তৃপক্ষের মাইক থেকেও। তবে আমজনতার আমিষ-নিরামিষ নিয়ে বাড়াবাড়ি নেই, ছিলনা। উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার হনুমানগড়ি আখড়া থেকে মেলায় এসেছিলেন একদল সাধু। আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক নিয়ে জিজ্ঞাসা করায় তাঁরা সাংবাদিককে বলেছিলেন যে, দুই-ই থাক। আজকাল বহু মানুষ এক-এক দিন নিরামিষ খায়। পুরোটা মানতে বললে অনেকেই পারবেন না।

গঙ্গাসাগরে এ বার কুম্ভের ছায়া যতই থাক, বাংলার এই তীর্থে আমিষ-নিরামিষের দ্বন্দ্ব ছিল না। গঙ্গা আরতির প্রাঙ্গণ থেকে মন্দিরের দিকে এগোনোর পথে ডান হাতের গলিতে সার দিয়ে কম্বল, জামা, কাপড়ের দোকান। ওই সব দোকান ছাড়িয়ে এগোলেই সার দিয়ে খাবারের দোকান। মিষ্টির পাশাপাশি চাউমিন, মোগলাই, এমনকি, বিরিয়ানি পর্যন্ত। আবার মেলা মাঠের মূল রাস্তার পাশেই জ্বলজ্বল করছে, সুরুচি হিন্দু হোটেল। নিরামিষ খাবারের পসরা তাদের। চাউমিনে অবশ্য নিরামিষ-আমিষ ভেদ ছিল।


শোনা গেল একটি কাউন্টারে এগ চাউ বিক্রি হচ্ছে, নিরামিষ কাউন্টার থেকে নিরামিষ। কিছু দূরেই ছিল ‘পাঞ্জাবি ধাবা’। নামেই ধাবা, আদতে ছোট মাপের খাবারের দোকান। মালকিন বাঙালি মেয়ে শান্তি। স্বামী পঞ্জাবি। মিলছে রুটি, তরকারি। তবে দেওয়া হচ্ছে পেঁয়াজ। অবাঙালি মহলে পেঁয়াজ নিয়ে অত ছুতমার্গ চোখে পড়েনি। উনিশ শতকে হিন্দুত্ব শব্দটা প্রথম লেখেন বাঙালি প্রাবন্ধিক ডেপুটি ম‍্যাজিস্ট্রেট চন্দ্রনাথ বসু।

কিন্তু রাজনৈতিক হিন্দুত্বের ছবিটা সাভারকর ক্রমশ স্পষ্ট করেছেন, সাভারকরপন্থীরা নিরামিষ খেলেও সাভারকর কিন্তু বিলেতে নিরামিষাশী গান্ধীকে চিংড়ি খেতে জোর করেন। এই গৌরচন্দ্রিকার প্রয়োজন হল এই কারণে যে সম্প্রতি বিহারে মাংস বিক্রিতে রাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যে রাজ্যের একটা বড় অংশের খাদ্যাভ্যাসে আমিষের স্থান, প্রতি বছর যে রাজ্যে প্রায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার টন মাংস ও প্রায় ১০ লক্ষ টন মাছ উৎপাদন হয়, সেখানে এর বিক্রিবাটা সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার সুচিন্তিত।

মনে রাখা দরকার, বিহারে মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলের বাসিন্দা, সিংহভাগই বসবাস করেন গ্রামে, এবং
মাছ-মাংস-সহ নিত্যপণ্যের খুচরো তথা অসংগঠিত বিক্রেতাদের একটা বিরাট অংশ নিত্য গ্রাম থেকে শহরে যাতায়াত করেন। লাইসেন্সধারী বিক্রেতার সংখ্যা এঁদের পাশে স্পষ্টতই নগণ্য। হঠাৎ চালু হওয়া সরকারি নিয়মে কেনাবেচার এই গোটা প্রক্রিয়াটিই ব্যাহত হবে, এমনকি পরিবহনও— বিজেপি-শাসিত ভারতে বাণিজ্যিক যানবাহনে মাংস নিয়ে যাওয়ার ‘অপরাধ’-এও সাধারণ বিক্রেতা তথা মানুষের হেনস্থার ঘটনা অগুনতি।

বিহার সরকারের অস্পষ্ট ঘোষণায় এই ঝুঁকি আরও বাড়বে। অন্য দিকে, পুর-এলাকা পরিষ্কার, স্বাস্থ্যকর রাখার লক্ষ্যপূরণ কঠিন কিছু নয়: পুরসভা ধরে ধরে মাংস বিক্রির লাইসেন্স-প্রক্রিয়া, বিক্রয়স্থান ও তার পরিকাঠামোয় নজর দেওয়া চাই। উত্তরপ্রদেশের পথেই বিহারও হাঁটছে কি না, এই ধন্দ ও প্রশ্ন এই মুহূর্তে অসঙ্গত নয়। যত্রতত্র প্রকাশ্যে, রাস্তার পাশে বা খোলা জায়গায় মাংস বিক্রি করা যাবে না, শুধু লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিক্রেতাদেরই নির্দিষ্ট জায়গায় মাংস বিক্রির অনুমতি থাকবে— বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রীর মুখে সম্প্রতি এই নতুন নিয়মের ঘোষণা আরও স্পষ্ট ও তার ব্যাখ্যা আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন ছিল, কারণ নিয়মটি শুধু বিহারের পুরসভা এলাকায় প্রযোজ্য হওয়ার কথা।

শহর পরিষ্কার রাখা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম পদক্ষেপ হিসাবে এই নিয়ম হলে সে যুক্তি তবু সঙ্গত; খোলা জায়গায় মাংস কেন, যে কোনও পচনশীল খাদ্যবস্তুর বিক্রিবাটাই নানা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং করেও: তাতে দৃশ্যদূষণ ঘটে, জায়গাটি নোংরা হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায়, আবর্জনা জমে নর্দমা বন্ধ হয়, সর্বোপরি খোলা জায়গায় বিক্রি হওয়া মাংস মাছি ও ব্যাক্টিরিয়ার চারণভূমি— আবহাওয়া-ভেদে তার পরিণাম মারাত্মক হতে পারে। এগুলিই যদি সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণ হত, তবে তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলাও প্রশাসনেরই কর্তব্য ছিল।

প্রকাশ্যে মাংস বিক্রি নিষেধ, এ কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী এও বলেছেন, কারও ভাবনায় আঘাত দেওয়া চলবে না। পুর-স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের রক্ষাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে হঠাৎ ভাবনা তথা ভাবাবেগে আঘাতের কথা উঠল কেন? উত্তরপ্রদেশ ও বিজেপি-শাসিত অন্য অনেক রাজ্যের মতোই বিহারের এই সরকারি সিদ্ধান্তটিও শেষাবধি বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে বেসাতি, এটাই কি তবে বুঝতে হবে?নতুন সরকারি নিয়মের সঙ্গে যদি আমিষ-নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসের প্রশ্ন, বা কোনও বিশেষ ধর্মের দিকে ঠারেঠোরে ইঙ্গিতও না-ই থাকে, তা হলে কারও ভাবাবেগে আঘাত লাগল কি না তাতে সরকারের কী আসে যায়?

আবহমান কাল চলে আসা জন-খাদ্যাভ্যাস ও তার দৃশ্যমান বাস্তব যদি আজকের জমানায় কারও ভাবাবেগ আহত করে, তা সেই ভাবাবেগের সমস্যা। রাজনৈতিক দলগুলি বরং অব্যবস্থায় ভরা নাগরিকজীবন উন্নত করার দিকে মন দিক, যত দিন অন্তত শাসনক্ষমতায় আছে।এর আগে বিতর্কের মুখে পরে সাধারণতন্ত্র দিবসে মাছ, মাংস, ডিম বিক্রির উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে পরে তা প্রত্যাহার করে নেয় ওড়িশার কোরাপুট জেলা প্রশাসন। একটি নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বলা হয় যে, যথাযথ বিবেচনার পরে পূর্বের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

কেন নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছিল, কেনই বা প্রত্যাহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত কোনও ব্যাখ্যা অবশ্য দেওয়া হয়নি।বিতর্কের সূত্রপাত হয় বিগত ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে কোরাপুটের জেলাশাসক মনোজ সত্যবন মহাজনের একটি নির্দেশিকাকে ঘিরে। কোরাপুটের প্রত্যেক তহসিলদার, বিডিও এবং পুর এলাকার সরকারি নির্বাহী আধিকারিকদের উদ্দেশে একটি চিঠি পাঠান জেলাশাসক। বলা হয়, দেশের ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবসে কোরাপুটে মাছ, মাংস, ডিম এবং অন্য আমিষ খাবার বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে।

সেইমতো প্রত্যেক আধিকারিককে নিজ নিজ এলাকায় বিজ্ঞপ্তি জারি করার জন্য বলা হয় ওই চিঠিতে। জেলাশাসকের এমন নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসার পরেই বিতর্ক দানা বাঁধে। কেন আমিষ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে সাধারণতন্ত্র দিবসে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে বিভিন্ন মহলে। সমালোচনাও শুরু হয়। এরপরই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়, কিন্তু কেন ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হল তা জেলাশাসকের দপ্তর থেকে স্পষ্ট করা হয়নি। দু’লাইনের নতুন বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে, সাধারণতন্ত্র দিবসের জেলাস্তরের প্রস্তুতি কমিটির পরামর্শের ভিত্তিতেই ওই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এখন তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কারণ জেলা প্রশাসন স্পষ্ট না করলেও এটা স্পষ্ট যে, বিতর্কের জেরেই এটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। স্বেচ্ছাচারী ও অসাংবিধানিক নির্দেশিকা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে ভালো কথা, কারণ, সাংবিধানিক স্বাধীনতাকে ইচ্ছামতো দমিয়ে দেওয়া যায় না। সাধারণতন্ত্র দিবস স্বাধীনতার প্রতীক, জোর জবরদস্তির নয়।বাংলায় উৎসবে বা তীর্থে আমিষ-নিরামিষ নিয়ে লড়াই আগে তেমন চোখে পড়ত না। কিন্তু গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক আবহে আমিষ-নিরামিষ দ্বন্দ্ব বড় আকার নিয়েছে। ব্রিগেডে গীতা পাঠের আসরে চিকেন প্যাটিস বিক্রেতার উপর হামলার অভিযোগও উঠেছিল।

পুরীর গোবর্ধন পীঠের শঙ্করাচার্য নিশ্চলানন্দ সরস্বতী সাংবাদিক বৈঠকে জানুয়ারি মাসে গঙ্গাসাগর মেলাকে পুরোদস্তুর নিরামিষ করে তোলার পক্ষেই মত দিয়েছিলেন। তবে আমিষ বা মাংস খাওয়াকে পুরোপুরি বাতিল করেননি তিনি, ঘুরিয়ে বলেছিলেন যে, ক্ষেত্রবিশেষে আমিষ খাবার দেশ রক্ষায় কাজে লাগে। তাৎপর্যপূর্ণ, এ বারের গঙ্গাসাগর মেলায় একটি মন্দির ট্রাস্টের উদ্যোগে নিরামিষ খাবার বিলির কথা শোনা গিয়েছে মেলা কর্তৃপক্ষের মাইক থেকেও। তবে আমজনতার আমিষ-নিরামিষ নিয়ে বাড়াবাড়ি নেই, ছিলনা।

উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার হনুমানগড়ি আখড়া থেকে মেলায় এসেছিলেন একদল সাধু। আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক নিয়ে জিজ্ঞাসা করায় তাঁরা সাংবাদিককে বলেছিলেন যে, দুই-ই থাক। আজকাল বহু মানুষ এক-এক দিন নিরামিষ খায়। পুরোটা মানতে বললে অনেকেই পারবেন না। গঙ্গাসাগরে এ বার কুম্ভের ছায়া যতই থাক, বাংলার এই তীর্থে আমিষ-নিরামিষের দ্বন্দ্ব ছিল না। গঙ্গা আরতির প্রাঙ্গণ থেকে মন্দিরের দিকে এগোনোর পথে ডান হাতের গলিতে সার দিয়ে কম্বল, জামা, কাপড়ের দোকান। ওই সব দোকান ছাড়িয়ে এগোলেই সার দিয়ে খাবারের দোকান। মিষ্টির পাশাপাশি চাউমিন, মোগলাই, এমনকি, বিরিয়ানি পর্যন্ত।

আবার মেলা মাঠের মূল রাস্তার পাশেই জ্বলজ্বল করছে, সুরুচি হিন্দু হোটেল। নিরামিষ খাবারের পসরা তাদের। চাউমিনে অবশ্য নিরামিষ-আমিষ ভেদ ছিল। শোনা গেল একটি কাউন্টারে এগ চাউ বিক্রি হচ্ছে, নিরামিষ কাউন্টার থেকে নিরামিষ। কিছু দূরেই ছিল ‘পাঞ্জাবি ধাবা’। নামেই ধাবা, আদতে ছোট মাপের খাবারের দোকান। মালকিন বাঙালি মেয়ে শান্তি। স্বামী পঞ্জাবি। মিলছে রুটি, তরকারি। তবে দেওয়া হচ্ছে পেঁয়াজ। অবাঙালি মহলে পেঁয়াজ নিয়ে অত ছুতমার্গ চোখে পড়েনি। উনিশ শতকে হিন্দুত্ব শব্দটা প্রথম লেখেন বাঙালি প্রাবন্ধিক ডেপুটি ম‍্যাজিস্ট্রেট চন্দ্রনাথ বসু।
কিন্তু রাজনৈতিক হিন্দুত্বের ছবিটা সাভারকর ক্রমশ স্পষ্ট করেছেন, সাভারকরপন্থীরা নিরামিষ খেলেও সাভারকর কিন্তু বিলেতে নিরামিষাশী গান্ধীকে চিংড়ি খেতে জোর করেন। এই গৌরচন্দ্রিকার প্রয়োজন হল এই কারণে যে সম্প্রতি বিহারে মাংস বিক্রিতে রাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যে রাজ্যের একটা বড় অংশের খাদ্যাভ্যাসে আমিষের স্থান, প্রতি বছর যে রাজ্যে প্রায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার টন মাংস ও প্রায় ১০ লক্ষ টন মাছ উৎপাদন হয়, সেখানে এর বিক্রিবাটা সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার সুচিন্তিত।

মনে রাখা দরকার, বিহারে মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলের বাসিন্দা, সিংহভাগই বসবাস করেন গ্রামে, এবং
মাছ-মাংস-সহ নিত্যপণ্যের খুচরো তথা অসংগঠিত বিক্রেতাদের একটা বিরাট অংশ নিত্য গ্রাম থেকে শহরে যাতায়াত করেন। লাইসেন্সধারী বিক্রেতার সংখ্যা এঁদের পাশে স্পষ্টতই নগণ্য। হঠাৎ চালু হওয়া সরকারি নিয়মে কেনাবেচার এই গোটা প্রক্রিয়াটিই ব্যাহত হবে, এমনকি পরিবহনও— বিজেপি-শাসিত ভারতে বাণিজ্যিক যানবাহনে মাংস নিয়ে যাওয়ার ‘অপরাধ’-এও সাধারণ বিক্রেতা তথা মানুষের হেনস্থার ঘটনা অগুনতি।

বিহার সরকারের অস্পষ্ট ঘোষণায় এই ঝুঁকি আরও বাড়বে। অন্য দিকে, পুর-এলাকা পরিষ্কার, স্বাস্থ্যকর রাখার লক্ষ্যপূরণ কঠিন কিছু নয়: পুরসভা ধরে ধরে মাংস বিক্রির লাইসেন্স-প্রক্রিয়া, বিক্রয়স্থান ও তার পরিকাঠামোয় নজর দেওয়া চাই। উত্তরপ্রদেশের পথেই বিহারও হাঁটছে কি না, এই ধন্দ ও প্রশ্ন এই মুহূর্তে অসঙ্গত নয়। যত্রতত্র প্রকাশ্যে, রাস্তার পাশে বা খোলা জায়গায় মাংস বিক্রি করা যাবে না, শুধু লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিক্রেতাদেরই নির্দিষ্ট জায়গায় মাংস বিক্রির অনুমতি থাকবে— বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রীর মুখে সম্প্রতি এই নতুন নিয়মের ঘোষণা আরও স্পষ্ট ও তার ব্যাখ্যা আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন ছিল, কারণ নিয়মটি শুধু বিহারের পুরসভা এলাকায় প্রযোজ্য হওয়ার কথা।

শহর পরিষ্কার রাখা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম পদক্ষেপ হিসাবে এই নিয়ম হলে সে যুক্তি তবু সঙ্গত; খোলা জায়গায় মাংস কেন, যে কোনও পচনশীল খাদ্যবস্তুর বিক্রিবাটাই নানা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং করেও: তাতে দৃশ্যদূষণ ঘটে, জায়গাটি নোংরা হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায়, আবর্জনা জমে নর্দমা বন্ধ হয়, সর্বোপরি খোলা জায়গায় বিক্রি হওয়া মাংস মাছি ও ব্যাক্টিরিয়ার চারণভূমি— আবহাওয়া-ভেদে তার পরিণাম মারাত্মক হতে পারে। এগুলিই যদি সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণ হত, তবে তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলাও প্রশাসনেরই কর্তব্য ছিল।

প্রকাশ্যে মাংস বিক্রি নিষেধ, এ কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী এও বলেছেন, কারও ভাবনায় আঘাত দেওয়া চলবে না। পুর-স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের রক্ষাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে হঠাৎ ভাবনা তথা ভাবাবেগে আঘাতের কথা উঠল কেন? উত্তরপ্রদেশ ও বিজেপি-শাসিত অন্য অনেক রাজ্যের মতোই বিহারের এই সরকারি সিদ্ধান্তটিও শেষাবধি বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে বেসাতি, এটাই কি তবে বুঝতে হবে?

নতুন সরকারি নিয়মের সঙ্গে যদি আমিষ-নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসের প্রশ্ন, বা কোনও বিশেষ ধর্মের দিকে ঠারেঠোরে ইঙ্গিতও না-ই থাকে, তা হলে কারও ভাবাবেগে আঘাত লাগল কি না তাতে সরকারের কী আসে যায়? আবহমান কাল চলে আসা জন-খাদ্যাভ্যাস ও তার দৃশ্যমান বাস্তব যদি আজকের জমানায় কারও ভাবাবেগ আহত করে, তা সেই ভাবাবেগের সমস্যা। রাজনৈতিক দলগুলি বরং অব্যবস্থায় ভরা নাগরিকজীবন উন্নত করার দিকে মন দিক, যত দিন অন্তত শাসনক্ষমতায় আছে।এর আগে বিতর্কের মুখে পরে সাধারণতন্ত্র দিবসে মাছ, মাংস, ডিম বিক্রির উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে পরে তা প্রত্যাহার করে নেয় ওড়িশার কোরাপুট জেলা প্রশাসন।

একটি নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বলা হয় যে, যথাযথ বিবেচনার পরে পূর্বের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। কেন নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছিল, কেনই বা প্রত্যাহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত কোনও ব্যাখ্যা অবশ্য দেওয়া হয়নি।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় বিগত ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে কোরাপুটের জেলাশাসক মনোজ সত্যবন মহাজনের একটি নির্দেশিকাকে ঘিরে। কোরাপুটের প্রত্যেক তহসিলদার, বিডিও এবং পুর এলাকার সরকারি নির্বাহী আধিকারিকদের উদ্দেশে একটি চিঠি পাঠান জেলাশাসক। বলা হয়, দেশের ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবসে কোরাপুটে মাছ, মাংস, ডিম এবং অন্য আমিষ খাবার বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে।

সেইমতো প্রত্যেক আধিকারিককে নিজ নিজ এলাকায় বিজ্ঞপ্তি জারি করার জন্য বলা হয় ওই চিঠিতে। জেলাশাসকের এমন নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসার পরেই বিতর্ক দানা বাঁধে। কেন আমিষ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে সাধারণতন্ত্র দিবসে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে বিভিন্ন মহলে। সমালোচনাও শুরু হয়। এরপরই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়, কিন্তু কেন ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হল তা জেলাশাসকের দপ্তর থেকে স্পষ্ট করা হয়নি। দু’লাইনের নতুন বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে, সাধারণতন্ত্র দিবসের জেলাস্তরের প্রস্তুতি কমিটির পরামর্শের ভিত্তিতেই ওই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এখন তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কারণ জেলা প্রশাসন স্পষ্ট না করলেও এটা স্পষ্ট যে, বিতর্কের জেরেই এটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। স্বেচ্ছাচারী ও অসাংবিধানিক নির্দেশিকা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে ভালো কথা, কারণ, সাংবিধানিক স্বাধীনতাকে ইচ্ছামতো দমিয়ে দেওয়া যায় না। সাধারণতন্ত্র দিবস স্বাধীনতার প্রতীক, জোর জবরদস্তির নয়।