আধুনিক নারীবাদের জননী: মেরি ওলস্টোনক্রাফট জীবন ও উত্তরাধিকার

ফাইল চিত্র

পার্থসারথি চৌধুরী

পৃথিবীর ইতিহাস সাধারণত এনলাইটেনমেন্ট বা ‘আলোকায়ন’ যুগকে ভলতেয়ার, রুসো এবং লকের মতো পুরুষ ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমেই স্মরণ করে। গণতন্ত্র, যুক্তিবাদ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় তাঁদের বিশাল অবদানের প্রশংসা করা হয়। তবে মেরি ওলস্টোনক্রাফট যিনি প্রথম ব্রিটিশ নারীবাদী তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত এই পুরুষদের সমান্তরালে দাঁড়িয়েছিলেন এবং প্রায়শই তাঁদের সীমাবদ্ধতাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তি ও সামাজিক চেতনা আধুনিক নারীবাদের ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করেছিল। এমন এক সময়ে তিনি তাঁর বাচন নির্মাণ করেছিলেন যখন আইন ও সমাজ নারীদের কঠোরভাবে কেবল ঘরোয়া কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিল, তিনি সাহসের সঙ্গে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, নারীর অধিকার ছাড়া ‘পুরুষের অধিকার’ (rights of man) ধারণাটি মৌলিকভাবেই অসম্পূর্ণ।

১৭৫৯ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া উলস্টোনক্রাফ্টের শৈশব ছিল আর্থিক অস্থিরতা এবং এক অত্যাচারী পিতৃতান্ত্রিক ছায়ায় ঘেরা। তাঁর জীবনের গঠনপর্বে তাঁকে প্রথাগত পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে নিহিত অবিচার সম্পর্কে এক গভীর ধারণা দেয় এবং তাঁকে পরোক্ষ আনুগত্যের জীবন প্রত্যাখ্যান করতে অনুপ্রাণিত করে। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি গৃহশিক্ষিকা এবং গভর্নেস হিসেবে কাজ করেন, যা তাঁকে নারীদের বৌদ্ধিক ক্ষমতার ওপর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর সীমাবদ্ধতাগুলো প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দেয়। লন্ডনের প্রকাশক জোসেফ জনসনের বৃত্তে যোগ দেওয়ার পর তাঁর জীবন আমূল বদলে যায়। সেখানে তিনি একজন পেশাদার লেখক হিসেবে সামাজিক রীতিনীতি ভেঙে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন এবং থমাস পেইন ও উইলিয়াম ব্লেকের মতো আমূল সংস্কারবাদী চিন্তাবিদদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেন।


উলস্টোনক্রাফ্টের সবচেয়ে বিখ্যাত ও চিরস্থায়ী কাজ ‘এ ভিন্ডিকেশন অফ দ্য রাইটস অব ওম্যান’ (A Vindication of the Rights of Woman) ১৭৯২ সালে প্রকাশিত হয়। মাত্র ছয় সপ্তাহে প্রবল আবেগের সঙ্গে লেখা এই বইটি ছিল একজন ফরাসি রাজনীতিবিদের প্রস্তাবের সরাসরি প্রতিক্রিয়া, যেখানে বলা হয়েছিল যে নারীদের শিক্ষা হওয়া উচিত সম্পূর্ণ গৃহকেন্দ্রিক এবং পুরুষদের অনুগত। তার মূল বিপ্লবী যুক্তি ছিল যে, নারীরা প্রকৃতিগতভাবে পুরুষদের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়; বরং পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাবেই তাঁদের তেমন মনে হয়। তিনি যুক্তি দেন যে, সমাজ সচেতনভাবে নারীদের যুক্তিপূর্ণ সত্তার বদলে কেবল ‘ক্ষণস্থায়ী আকর্ষণের বস্তু’ হিসেবে গড়ে তোলে। তদুপরি, তিনি কেবল আর্থিক নিরাপত্তার জন্য করা বিয়েকে ‘আইনি বেশ্যাবৃত্তি’ বলে কঠোর সমালোচনা করেন এবং এর পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে ‘সহযোগী বিবাহের’ (companionate marriage) পক্ষে কথা বলেন। তাছাড়া তিনি এই গ্রন্থে জ্ঞানোদ্দীপ্তি বা এনলাইটেনমেন্ট যুগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিবাদ ও সমতার নীতির আলোকে সমাজে নারীর অধীনস্থ অবস্থা পর্যালোচনা করেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ‘রিজন’ (Reason) বা বিচারবুদ্ধি— যাকে তিনি জ্ঞান অর্জন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিজস্ব নৈতিক কাঠামো গঠনের ক্ষমতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন— নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই সমান। তাঁর মতে, একদিকে নারীদের শিক্ষার সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা এবং অন্যদিকে তাঁদের কেবল মাতৃত্বের প্রথাগত ভূমিকার ছাঁচে ফেলে বিচার করা (stereotyping)— এই দুটি কারণেই নারীরা পুরুষদের চেয়ে আলাদাভাবে আচরণ করে। তাঁর অপর একটি প্রভাবশালী গ্রন্থ, ‘থটস অন দ্য এডুকেশন অফ ডটারস’-এ উলস্টোনক্র্যাফট নারীদের জন্য শিক্ষার সমান অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছেন। শিক্ষা ও সমতা নিয়ে তাঁর এই বৈপ্লবিক ভাবনাগুলো পরবর্তীকালে নারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত বহু আইন ও নীতিকে অনুপ্রাণিত করেছে।

উলস্টোনক্রাফ্ট কেবল বিপ্লব নিয়ে লেখেননি, তিনি তা যাপন করেছেন। ১৭৯২ সালে তিনি ফরাসি বিপ্লব সরাসরি দেখার জন্য প্যারিসে যান। রাজতন্ত্রের পতনকে সমর্থন জানালেও পরবর্তী কালে ‘রেইন অব টেরর’ বা ত্রাসের রাজত্ব দেখে আতঙ্কিত হন এবং নতুন প্রজাতন্ত্রে নারীদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া দেখে গভীরভাবে হতাশ হন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল সে সময়ের পক্ষে রীতিবিরুদ্ধ। আমেরিকান অভিযাত্রী গিলবার্ট ইমলের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে তাঁর কন্যা ফ্যানি ইমলের জন্ম হয়। ইমলে তাঁকে পরিত্যাগ করার পর তিনি গভীর বিষণ্ণতায় ভুগেছিলেন, তবে পরে তিনি অগ্রগামী নৈরাজ্যবাদী দার্শনিক উইলিয়াম গডউইনের সঙ্গে এক নিবিড় বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগীয় অংশীদারিত্ব খুঁজে পান।

অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, ১৭৯৭ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে প্রসবকালীন জ্বরে উলস্টোনক্রাফ্ট মারা যান। এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় কন্যা মেরি শেলির জন্মের মাত্র এগারো দিন পরের ঘটনা, যিনি পরবর্তীতে কালজয়ী উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-এর রচয়িতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর, গডউইন তাঁর সততা এবং সাহসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি অকপট স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন। তবে ভিক্টোরিয়ান সমাজ তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আত্মহত্যার প্রচেষ্টার কথা শুনে গভীরভাবে কলঙ্কিত বোধ করে, যার ফলে দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানগুলো অবহেলিত ছিল।

দীর্ঘকাল বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে থাকার পর, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভোটাধিকার আন্দোলনের (suffragist movement) নেত্রীদের হাত ধরে তাঁর কাজ পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। মিলিসেন্ট ফসেটের মতো ব্যক্তিত্বরা ওলস্টোনক্রাফটকে পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃতি দেন। মার্কসবাদীরা ওলস্টোনক্রাফটের ধারণা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি। যদিও পরবর্তীকালে তারা উদারনৈতিক নারীবাদ ও সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ এই দুই ধারার মধ্যে এক সমন্বয় ঘটাবার চেষ্টা করেছে। তারা ওলস্টোনক্রাফটের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও অধিকারের ধারণাকে গ্রহণ করেছে, কিন্তু প্রয়োগ করেছে মার্কসীয় অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে। তবে এটাও মনে রাখা দরকার যে, ওলস্টোনক্রাফট যখন লিখেছিলেন তখন শিল্প বিপ্লব অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তাই তাঁর চিন্তায় শ্রেণির চেয়ে যুক্তিই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, তাঁর চিন্তার এই যুক্তিবাদী ভিত্তিই পরবর্তীকালে সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের সাহস জুগিয়েছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে। যদিও আজ তিনি কেবল একজন মৌলিক নারীবাদী হিসেবেই নন, বরং একজন দূরদর্শী মানবাধিকার কর্মী হিসেবেও উদযাপিত হন। তাঁর সেই বিখ্যাত ঘোষণা— ‘আমি চাই না যে পুরুষদের ওপর নারীদের ক্ষমতা থাকুক; বরং তারা যেন নিজেদের ওপর নিজেরা কর্তৃত্ব করতে পারে’— আজও আধুনিক নারীবাদের এক চালিকাশক্তি।