প্রবল উত্তাপ আর আর্দ্রতা বৃদ্ধিতে দক্ষিণবঙ্গের অস্বস্তি চরমে। পুড়ছে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলও। কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর লাল সঙ্কেত জারি করেছে উত্তরপ্রদেশের ১১টি জেলায়। জানিয়েছে, স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা তিন-চার ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরেই থাকবে। এ-হেন উত্তাপ বৃদ্ধি কিন্তু গ্রীষ্মের পরিচিত রূপ নয়, বরং পরিবর্তিত জলবায়ুর এক অমোঘ পরিণতি, যে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই বিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করে আসছিলেন। উত্তরপ্রদেশের বান্দা জেলা যেমন সম্প্রতি পর পর তিন দিন ভারতের উষ্ণতম অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। সেখানকার তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করছে পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। ছাদে ডিমের ওমলেট ভাজা যাচ্ছে দিব্বি। সকাল দশটা বাজলেই বন্ধ হচ্ছে দোকানপাট, রাস্তাঘাট শুনশান। এই অদ্ভুত নিস্তব্ধতাই যেন বলে দেয়, আগামী দিনগুলিতে ভারতের সামগ্রিক জনজীবন কেমন হতে চলেছে। অশনিসঙ্কেত বইকি। বান্দা জেলার অবস্থান যেখানে, উত্তর ভারতের সেই বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে এই অস্বাভাবিক উত্তাপ বৃদ্ধির কারণ হিসাবে কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর উল্লেখ করেছে থর মরুভূমি থেকে বয়ে আসা শুষ্ক, উত্তপ্ত বাতাসের কথা।
বুন্দেলখণ্ডের রুক্ষ পাথুরে জমি— যা মেঘমুক্ত দিনে সরাসরি সূর্যালোকের প্রভাবে দ্রুত তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সেই তাপ বহু ক্ষণ ধরে রাখতে পারে— তা এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ছবিটি এতে স্পষ্ট হয় না। বান্দা সাম্প্রতিক কালে পরিণত হয়েছে এক ‘হিট আইল্যান্ড’-এ, যেখানে না-আছে পর্যাপ্ত সবুজের উপস্থিতি, না-আছে আর্দ্রতা। অত্যন্ত স্বল্প পরিমাণ সবুজ আচ্ছাদন, নদীর জলস্তর কমে যাওয়া, ভূগর্ভস্থ জলস্তরের অবনমন, এবং কংক্রিটের বাড়বাড়ন্ত এই অসহনীয় পরিস্থিতি নির্মাণে ইন্ধন জুগিয়েছে। তদুপরি যোগ হয়েছে স্থানীয় নদী থেকে অবৈজ্ঞানিক ভাবে অবৈধ বালি উত্তোলন, যা জলজ বাস্তুতন্ত্র, গাছপালার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বান্দা আটকে পড়েছে ‘উত্তাপের এক বিষচক্র’-এ, যেখান থেকে দ্রুত পরিত্রাণ মেলা অসম্ভব। কারণ, পরিস্থিতিকে পাল্টাতে হলে সরকারি পর্যায়ে যে পরিবেশবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং তাকে দ্রুত বাস্তবায়িত করার উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, এখনও তার দেখা মেলেনি।
এই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির, যারা এখনও, পরিবেশকে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদানের অভ্যাসটি গড়ে তুলতে পারেনি। অবৈধ বালি খাদান, সবুজের চাদর দ্রুত অন্তর্হিত হয়ে যাওয়া, কংক্রিটের আগ্রাসন— বিগত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গেও অতি পরিচিত শব্দ হয়ে উঠেছে। হুগলি নদীর তীরে কলকাতা শহরেও তীব্র জলকষ্ট এখন বাস্তব। অচেনা, অসহ্য উত্তাপ থাবা বসাচ্ছে সেখানেও। আর একটি মুহূর্তও অপচয় করার উপায় নেই। এখনই ব্যবস্থা না করলে গোটা দেশই বান্দা হয়ে উঠবে।
অসুরক্ষিত চার দেওয়ালের অভ্যন্তর বাইরের চেয়েও তপ্ত হতে পারে। অপর্যাপ্ত বায়ুচলাচল, ঘনসন্নিবিষ্ট বস্তি ও নিম্নমানের আবাসনে থাকতে বাধ্য মানুষ, টিনের ঘরে আবদ্ধ কুটিরশিল্পী, রান্নায় ব্যস্ত মানুষও বিপন্ন। একা প্রবীণদের প্রতি নিয়মিত লক্ষ রাখা চাই, অনেকেই তৃষ্ণা বা অসুস্থতার লক্ষণ বুঝতে অপারগ। হিটস্ট্রোক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীকক্ষ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট রোধ, সবুজায়ন, জলাশয় সংরক্ষণ, ছাদ ঠান্ডা করার প্রকল্প, তাপ-সহনশীল আবাসন— এগুলি কোনও সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পের অলঙ্কার নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার আবশ্যিক পরিকাঠামো হিসাবে বিবেচ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়া ঘন ঘন হওয়াই বিধি। কোথায় জলাভাব দেখা দিতে পারে, কোথায় হাসপাতালে চাপ বাড়তে পারে— জেনে প্রশাসনকে তৈরি হতে হবে। কৃষি দফতরের দায়িত্ব আগেভাগে জানানো কখন মাঠে কাজ করা নিরাপদ, কোন ফসল গরমে নষ্ট হয়, সেচের পরিকল্পনা কী ভাবে বদলাবে। কারণ, তাপপ্রবাহের ক্ষতি স্বাস্থ্যক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, উৎপাদনশীলতা কমে, সম্পদ ও কাজের সময় নষ্ট হয়, বিদ্যুতের চাহিদার কারণে অর্থনীতির উপর আরও চাপ পড়ে। ট্র্যাফিক পুলিশ, নির্মাণকর্মী, হকার, ডেলিভারি কর্মী ও আরও যাঁরা রাস্তায় কাজ করেন তাঁদের বাধ্যতামূলক মধ্যাহ্নবিরতি, ঠান্ডা পানীয় জল, ছাউনির ব্যবস্থা জরুরি।
দিল্লিতে দুপুর একটা থেকে চারটে শ্রমিকদের বিশ্রাম, ওআরএস সরবরাহ, বস্তি এলাকায় ছাদ ঠান্ডা করার ব্যবস্থা ইত্যাদির পরিকল্পনা হয়েছে। ২০০৩-এর প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের পর ফ্রান্স হিটওয়েভ প্ল্যান তৈরি করে যে চার স্তরীয় সতর্কতা নিয়েছিল সেই মডেল হুবহু এখানে প্রয়োগ মুশকিল, তবে আগাম পরিকল্পনা যে মৃত্যুঝুঁকি কমায় তা দেশেরই আমদাবাদের হিট অ্যাকশন প্ল্যান-এ প্রমাণিত। নৈতিক শিক্ষা স্পষ্ট।
কিন্তু গবেষণায় ইঙ্গিত, পরিস্থিতির ক্রম অবনমন হবে। পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টিপাত কমবে এবং চরম তাপমাত্রায় দেশে এক দিনেই ৩ হাজার ৪০০ অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে। পাঁচ দিনের তাপপ্রবাহেই এই সংখ্যা ১০ হাজার ছুঁতে পারে। আশঙ্কা সত্যি হওয়ার পথে। বিশ্বের উত্তপ্ত শহরের প্রথম ৫০টিই এখন ভারতে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে তো বটেই, রাতেও তাপ কমছে না, ফলে মানবশরীর বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছে না। উদ্বেগের বিষয়, বহু সময়েই হিটস্ট্রোক-জনিত মৃত্যুর স্পষ্ট চিত্র মেলে না। হৃদ্রোগ, শ্বাসকষ্ট, পেটের অসুখ ইত্যাদি বলে চিহ্নিত হওয়ার সমস্যা থাকে। ফলে, এই সতর্কতাকে কেবল ঋতুগত সমস্যা হিসাবে দেখে মানুষকে প্রকৃতির রোষের হাতে ছাড়লে চলবে না। আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেলে তার অবশ্যম্ভাবী প্রকোপ এড়াতে আগাম প্রস্তুতি, ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতারই পরীক্ষা। শুধু প্রচার নয়, স্পষ্ট, বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা অত্যাবশ্যক। ইতিমধ্যে উপগ্রহের ছবি দেখাচ্ছে যে বর্ষার মেঘ উধাও, ভারতে এবার বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় চৌষট্টি শতাংশ। সুতরাং খরা জনিত কারণে এবার ফসল উৎপাদন কমবে,তার উপর থাকছে ইরান যুদ্ধের চাপ। ভারতীয় অর্থনীতির জন্য আগামীদিন কোনও সুখের সময় নয়,আনন্দের সময় নয়।
অর্থনীতির উপর চাপ বাড়লে তাকে সামলানোর দায় পড়বে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তনে দেশ এখন কোন সংকটের মুখোমুখি হয়, তা দেখার জন্য এবার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে যে ধ্বংস হবে তার হিসাব এখনও যুদ্ধবাজ রাজনীতিবিদরা করে উঠতে পারেননি, এটাই দুর্ভাগ্যের।