ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নতুন করে জোরালো হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই ইঙ্গিতই স্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, দুই দেশ একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, আলোচনা এখন মূলত কিছু কারিগরি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সব কিছু ঠিক থাকলে কয়েক মাস নয়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে। এই খবর নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে শুধু আশার ভিত্তিতে নয়, চুক্তির শর্তগুলি বিচার করেই এর সাফল্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ভারত ও আমেরিকা বিশ্বের দুই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়লে শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি, পরিষেবা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভারতীয় পণ্যের জন্য আমেরিকার বিশাল বাজার আরও সহজলভ্য হলে এ দেশের রপ্তানিকারকেরা লাভবান হবেন। একই সঙ্গে আমেরিকার বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তি ভারতে এলে উৎপাদন বাড়ানো, নতুন শিল্প গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পথও প্রশস্ত হতে পারে। তাই এই চুক্তির গুরুত্ব শুধু দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতির উপরেও।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই চুক্তি কি সত্যিই দুই দেশের জন্য সমানভাবে লাভজনক হবে? ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তিটি আগের বাণিজ্য চুক্তিগুলির থেকে অনেকটাই আলাদা হবে। কেন আলাদা হবে, তার ব্যাখ্যা অবশ্য তিনি দেননি। এই বক্তব্যের মধ্যেই রয়েছে কিছু অনিশ্চয়তা। আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দেশের বাজারে নিজেদের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়াতে চাইছে। ভারতও তার কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং দেশীয় উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। ফলে বাজার কতটা খুলবে, কোন পণ্যের উপর কত শুল্ক থাকবে এবং দুই দেশ কী ধরনের সুবিধা পাবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক।
২০২৫ সালে ভারতীয় পণ্যের উপর আমেরিকার শুল্ক বৃদ্ধি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিছু পণ্যের উপর শুল্ক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এর সঙ্গে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয়টিও জড়িয়ে পড়ে। আমেরিকার এই পদক্ষেপের ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার তেল কেনার সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও সামগ্রিক বাণিজ্যিক বিরোধ দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, বাণিজ্য চুক্তি কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; তার সঙ্গে কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিও গভীরভাবে যুক্ত।
ভারতের সামনে তাই দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। প্রথমত, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নত করা। দ্বিতীয়ত, দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা। বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্রের কথা মনে রাখা জরুরি। ভারতীয় কৃষকেরা এখনও নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে কাজ করেন। আমেরিকার কৃষিপণ্য সহজে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় কৃষকেরা মূল্য ও প্রতিযোগিতার চাপে পড়তে পারেন। একইভাবে, ছোট শিল্প ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের স্বার্থও বিবেচনা করতে হবে। বড় শিল্পগোষ্ঠী বা রপ্তানিকারকেরা চুক্তি থেকে লাভবান হলেও সাধারণ উৎপাদক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে সামগ্রিক সাফল্য বলা যাবে না।
অন্যদিকে, ভারতকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্তিশালী হতে হলে নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ গ্রহণ করতেই হবে। শুধু দেশীয় বাজারের উপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। রপ্তানি বাড়ানো, উৎপাদনের মান উন্নত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য স্থিতিশীল বাণিজ্যিক পরিবেশ প্রয়োজন। আমেরিকার সঙ্গে একটি কার্যকর চুক্তি সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে চুক্তির ভাষা ও শর্ত এমন হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে ব্যাখ্যা নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি না হয়। আলোচনার সাফল্য শুধু দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যে নয়, বরং তার দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতার মধ্যেও নিহিত।
ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় প্রস্তাবিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা দুই দেশের নেতাদের আলোচনার আরেকটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সম্মেলনের আগেই চুক্তি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে প্রতিটি শর্ত ভালোভাবে যাচাই করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি তাই একদিকে বড় সম্ভাবনা, অন্যদিকে কঠিন পরীক্ষাও। ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমঝোতা, যেখানে রপ্তানি বাড়বে, বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে। আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক অবশ্যই কাম্য, কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতা। দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলেই এই চুক্তি সত্যিকার অর্থে সার্থক হবে।