সুনীল মাইতি
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে মেদিনীপুর কেবল একটি জেলা নয়; এটি একটি চেতনার নাম। এই জেলার রাজনৈতিক ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। স্বাধীনতা-পূর্ব কাল থেকেই এই মাটির মাতঙ্গিনী হাজরা, সতীশ সামন্ত, সুশীল ধাড়া বা ক্ষুদিরাম বসুর মতো বিপ্লবীদের জন্ম দিয়েছে। বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে অবিভক্ত মেদিনীপুর বরাবরই এক নির্ণায়ক শক্তি। স্বাধীনতা আন্দোলনেই ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ গঠন থেকে শুরু করে পরিবর্তনের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে এই মাটির অবদান অনস্বীকার্য। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ গঠন করে এই মাটি প্রমাণ করেছিল— যে তারা স্বশাসনে সক্ষম। এই মেদিনীপুরের কোনও ভূমিপুত্র স্বাধীনতার পর প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক শীর্ষ পদে আসীন; তবে তা কেবল একটি অঞ্চলের আবেগ নয়; বরং সমগ্র রাজ্যের জন্য এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। তবে ‘উন্নততর পশ্চিমবঙ্গ’ গড়ার পথে তাঁর সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলি পাহাড় প্রমাণ; তা অতিক্রম করাই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।
পরিকাঠামো ও শিল্পায়নের বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ: পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি বর্তমানে প্রধানত পরিষেবা ও কৃষিনির্ভর। শুভেন্দু অধিকারীর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে উৎপাদন শিল্পকে (Manufacturing Sector) ফিরিয়ে আনা।
কর্মসংস্থান: প্রতিবছর রাজ্য থেকে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস করার লক্ষ্যমাত্রা।
জিডিপি (GDP) বৃদ্ধি: রাজ্যের জিডিপি বৃদ্ধির হারকে জাতীয় গড়ের উপরে নিয়ে যাওয়ার
রোড ম্যাপ।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: সরকারি স্কুল ও হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নে পিপিপি (PPP) মডেলের উপযোগিতা বিচার।
জমি নীতি ও বিনিয়োগ: শিল্পায়নের জন্য একটি সুসঙ্গত এবং স্বচ্ছ জমি নীতি প্রণয়ন করা তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ। মেদিনীপুরের হলদিয়া ও খড়্গপুরের শিল্পাঞ্চলকে মডেল হিসেবে রেখে সমগ্র রাজ্যে ‘স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ (SEZ) বা ইনভেস্টমেন্ট করিডর গড়ে তোলা জরুরি।
MSME ও ক্ষুদ্র শিল্প: বাংলার গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে থাকা মাঝারি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ এবং সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা।
বিনিয়োগকারী আস্থা: সিঙ্গুর-পরবর্তী যুগে শিল্পের যে আকাল তৈরি হয়েছে, তা মেটাতে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের ফাঁস শিথিল করা এবং স্বচ্ছ জমি নীতি প্রণয়ন করা জরুরি।
লজিস্টিক হাব: খড়্গপুর, হলদিয়া এবং মেদিনীপুরের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোর’ তৈরি করা যা প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে।
বন্ধ কলকারখানার পুনরুজ্জীবন: রাজ্যের রুগ্ন শিল্পগুলোকে পুনরায় সচল করা।
আইটি ও ম্যানুফ্যাকচারিং: বেঙ্গালুরু বা হায়দ্রাবাদের মতো আইটি হাব তৈরি করা এবং ভারী শিল্পের জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা।
এক জানালা নীতি: শিল্প স্থাপনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো।
২. প্রশাসনিক সংস্কার ও ‘পলিটিক্যাল নিউট্রালিটি’ (রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা): একটি উন্নত রাজ্যের মেরুদণ্ড হলো তার নিরপেক্ষ প্রশাসন। পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামোয় দলতন্ত্র একটি গভীর ক্ষত। একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীকে আমলাতন্ত্র এবং পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক ও বাম মুক্ত করার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।
পুলিশি সংস্কার: প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত করে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্নীতি দমন: নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে গ্রামীণ প্রকল্পের অর্থবিল তৃণমূল স্তরে স্বচ্ছতা ফেরানোই হবে সুশাসনের প্রথম ধাপ।
পাবলিক সার্ভিস কমিশন (PSC) সংস্কার: নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সূত্রতা বন্ধ করে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
৩. অর্থনৈতিক সংস্কার ও ঋণ নিয়ন্ত্রণ: পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে কয়েক লক্ষ কোটি টাকার বিশাল ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।
ঋণ নিয়ন্ত্রণ: জনমোহিনী প্রকল্পের (Dole Politics) ভারসাম্য বজায় রেখে মূলধনী বিনিয়োগ (Capital Expenditure) বাড়ানো অর্থাৎ এমন প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা যা ভবিষ্যতে আয়ের উৎস তৈরি করবে।
রাজস্ব বৃদ্ধি: কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন এবং নিজস্ব আয়ের উৎস বাড়ানো।
সুষম বাজেট: জনমোহিনী প্রকল্পের সঙ্গে পরিকাঠামা উন্নয়নের ভারসাম্য বজায় রাখা।
কৃষি ও প্রযুক্তির সেতুবন্ধন: মেদিনীপুর কৃষিপ্রধান এলাকা। তাই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কাছে প্রত্যাশা থাকবে কৃষিকে লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তরিত করার।
ভ্যালু এডিশন: কেবল ধান বা আলু চাষ নয়; কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং হিমঘর নেটওয়ার্কের আধুনিকীকরণ করতে হবে।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ: কৃষি পণ্যের সঠিক দাম নিশ্চিত করতে ফুড প্রসেসিং ইউনিট স্থাপন।
সমুদ্র অর্থনীতি (Blue Economy): উপকূলবর্তী জেলাগুলোর মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে আধুনিক ট্রলার ও সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানির পরিকাঠামো তৈরি করা।
সেচ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: উপকূলবর্তী এলাকার নোনা জল ঢোকা প্রতিরোধ এবং মেদিনীপুরের খরাপ্রবণ অঞ্চলের জলকষ্ট মেটানো একটা দীর্ঘ মেয়াদী চ্যালেঞ্জ।
৪. মেধা পাচার (Brain Drain) রোধ ও শিক্ষা সংস্কার: বাংলার শ্রেষ্ঠ সম্পদ তার মেধা কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতিভাবান যুব সমাজ
ভিন্ন রাজ্যমুখী।
শিক্ষা ও নিয়োগ: শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনীতিকরণ মুক্ত করা এবং সময়মতো স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া
চালু করা।
বৃত্তিমূলক শিক্ষা: প্রথাগত ডিগ্রীর পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো।
স্টার্ট আপ ইকো সিস্টেম (Start up- Eco System): সিলিকন ভ্যালি বা ব্যাঙ্গালোরের আধুনিক বাংলা স্টাট আপ সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য পরিকাঠামোগত সুযোগ দান।
৫. আঞ্চলিক ভারসাম্য ও উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ সমন্বয়: বাংলার উন্নয়ন প্রায়শই কলকাতা কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে; এই মিথ ভাঙ্গা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
শহর ও গ্রাম সংযোগ: উত্তরবঙ্গের পাহাড় এবং সমতলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অভিযোগ দূর করতে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ এবং পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটানো।
স্মার্ট সিটি ও আবাসন: কেবল কলকাতায় ভিড় না বাড়িয়ে শিলিগুড়ি আসানসোল বা দুর্গাপুরের মতো শহরগুলোকে বিকল্প কর্মসংস্থান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
মেদিনীপুরের নেতা হিসেবে, তাঁর বিরুদ্ধে যেন আঞ্চলিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না ওঠে, সে দিকে সজাগ থাকতে হবে। উত্তরবঙ্গের পাহাড় এবং সমতলের মানুষের যে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার, তাকে উন্নয়নের মূল স্রোতে শামিল করা তাঁর জন্য এক বড় রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা।
অবিভক্ত মেদিনীপুরের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘লড়াই’ শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে কেবল লড়াই নয়, প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি (Visionary Leadership)। ‘উন্নততর পশ্চিমবঙ্গ’ গড়া মানে কেবল নতুন রাস্তা বা ব্রিজ নয়, তা হল রাজ্যের ললাট থেকে ‘শিল্পবিমুখতা’ ও ‘বেকারির তিলক’ মুছে ফেলা। মেদিনীপুরের সেই লড়াকু মেজাজ যদি প্রশাসনিক দক্ষতায় রূপান্তরিত হয়, তবেই বাংলার হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার সম্ভব। মেদিনীপুরের মাটি থেকে উঠে আসা নেতার জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর তৃণমূল স্তরের সংগঠন ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে, ‘স্টেটসম্যান-সুলভ (Statesmanship)’ মানসিকতা দেখাতে হবে। ১৯৪২-এর মেদিনীপুর যা শিখিয়েছিল— নির্ভীকতা এবং স্বায়ত্তশাসন– ২০২৬ বা তার পরবর্তী সময়ে সেই একই নির্ভীকতায় বাংলার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনাই হবে তাঁর
ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা।