ইরানের সংকট : বৈশ্বিক সংঘাত ও সংঘর্ষের বিস্তার

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

গৌতম মণ্ডল

ঐতিহাসিকভাবে পারস্য, অধুনা রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরান নামে পরিচিত দেশটি হল পশ্চিম এশিয়ার একটি খনিজ তৈলসমৃদ্ধ কট্টর ইসলামিক দেশ। এর চারপাশে রয়েছে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কাস্পিয়ান সাগর, তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর, তুরস্ক এবং ইরাক । ইউরেশিয়ার কেন্দ্রে এবং হরমুজ প্রণালীর নিকটে অবস্থিত হওয়ায় ইরান ভূকৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দেশ। ইরানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার আছে।

এগুলোই দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে বর্তমান ইরান ছিল বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য পারস্যের কেন্দ্র। প্রায় ২০০০ বছর ধরে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা নিজেদের দেশকে ইরান‌ নামে ডাকত। কিন্তু গ্রিকরা এই অঞ্চলকে পার্সিস বলে অভিহিত করতেন এবং সেখান থেকে ইউরোপীয় ভাষায় এর নাম হয় পার্সিয়া, যা বাংলায় কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে হয় পারস্য। ১৯৩৫ সালে ইরানের তৎকালীন শাসক রেজা শাহ পাভলভী দেশটিকে কেবল ইরান বলে সম্বোধন করার অনুরোধ জানান। এর পর থেকেই ইরান নামেই সারা বিশ্বে দেশটি পরিচিত হয়। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত রাজতন্ত্রী ইরান শাহ কিংবা রাজারা শাসন করতেন। সে সময় ইরানে খোলামেলা ও আধুনিক আবহাওয়া ছিল। মেয়েরা পুরুষদের মতোই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মস্থলে যেত। কিন্তু ১৯৭৯ সালেইসলামি বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং ইরান ক্রমশ একটি কট্টর ইসলামিক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে ১৯৭৯ সালে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল আয়াতুল্লাহ খোমেইনি কিন্তু শুরুতেই তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। যে বামপন্থীরা রাজতন্ত্রের পতনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, ক্ষমতায় এসে এই ইসলামপন্থীরা তাঁদেরকেই নির্মমভাবে নির্মূল করেন। বহু বামপন্থী নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বিশেষ করে কুস্তিগীর নাভিদ আফকারির ফাঁসি সাধারণ ইরানিদের দারুণভাবে আলোড়িত করেছিল। খোমেইনি ক্ষমতায় আসার পরে শিল্প, সাহিত্য ও সিনেমার উপরেও নেমে আসে কঠোর বিধিনিষেধ। আব্বাস কিয়েরোস্তিমের মতো প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্র পরিচালককেও নানারকম সমস্যা ও সতর্কতার মধ্যে সিনেমা তৈরি করতে হয়েছে। সংবিধানে ইসলাম ধর্মের শিয়া মতটিকে ইরানের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। ক্রমশ আয়াতুল্লাহ খোমেইনি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ও শাসকের আসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন। এসেই তিনি জনগণের উপর ইসলামের কট্টর আইন আরোপ করেন। মহিলাদের পোশাক ও যাতায়াতের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ তো করেনই পাশাপাশি কঠোরভাবে বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে চান। সরকারবিরোধী যে কোনো কণ্ঠস্বরকে সরকার নির্মমভাবে দমন করেন। প্রয়োজনে জেল তো বটেই এমনকী গুমখুন বা ফাঁসি দিতে পিছপা হতেন না। খুব স্বাভাবিকভাবেই মাঝে-মাঝেই বিদ্রোহ হত। বিগত কিছুদিন ধরে ইরানজুড়ে বিদ্রোহ চরম আকার ধারণ করে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত এই বিদ্রোহ দাবানলের আকার ধারণ করলে তাকে নির্মূল করতে খোমেইনি নিষ্ঠুরভাবে সবধরনের দমনমূলক আচরণ করেন। ইন্টারনেট-সহ সমস্ত ধরনের সমাজমাধ্যমে বনধ করে দেওয়া হয়। বেসরকারি মতে খোমেইনি তাঁর বাহিনীর মাধ্যমে অন্তত প্রায় তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন। লক্ষাধিক মানুষ আহত।


স্বাধীনতাকামী ইরানের নাগরিকরা বিশেষ করে মহিলারা আলী খামেনির মৌলবাদী দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে চান। এই সুযোগটাই দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিলেন আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সমস্ত দেশ বশ্যতা স্বীকার করলেও ইরানের একচ্ছত্র অধিপতি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বশ্যতা স্বীকার তো করেননিই উলটে আমেরিকার পাওয়ার স্ট্রাকচারের চোখে চোখ রেখে ধারাবাহিকভাবে কথা বলেছে। কয়েকমাস আগে ইজরায়েলের ডিফেন্স সিস্টেম এয়ারো ডোমকে ধ্বংস করে ওই দেশের উপর প্রত্যাঘাত ও বিপুল ক্ষতিসাধন করতে সমর্থ হয়েছে ইরান। একটা সময় আমেরিকা আক্রমণ করেও সুকৌশলে পিছিয়ে এসেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খামেনিকে শুধুমাত্র শিক্ষা দেওয়া ট্রাম্পের উদ্দেশ্য ছিল না, আসল উদ্দেশ্য ইরানের মাটির নীচে থাকা বিপুল তেল ভাণ্ডার ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দখল নেওয়া। এটা নিতে গেলে খামেনি রেজিমের পরিবর্তন ঘটিয়ে একটা অনুগত সরকার বসানো দরকার। কিন্তু খামেনিকে বাঁচিয়ে রেখে রেজিম পরিবর্তন করা মুশকিল আর করা গেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। তাই ট্রাম্পের নির্দেশে সিআইএ দীর্ঘদিন ধরে খামেনির চলাফেরার উপর নজরদারি রাখছিল। শীর্ষ পদাধিকারীদের নিয়ে মাটির বহু নীচে বাঙ্কারের ভেতরে খামেনি গোপন বৈঠক করছেন জেনে ইজরায়েল ও আমেরিকা যৌথভাবে নিশ্চিত লক্ষ্যে বাঙ্কার ব্লাস্টার নিক্ষেপ করে। ঘটনাস্থলেই প্রয়াত হন খামেনি-সহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, সেনাবাহিনীর প্রধানসহ ৪০ জন ইরানের শীর্ষস্থানীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কিছুটা বিরতি নিয়ে ইরানও পাল্টা আঘাত হিসেবে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরিন-সহ মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি আছে তার উপর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে সেগুলোকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। ওদিকে চিন এবং রাশিয়াও চুপ করে বসে নেই। এই অবস্থায় এখন প্রশ্ন, এরপর কী? তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ? ইরানের ওপর মার্কিন-ইজরায়েলি আক্রমণ, দেশের অভ্যন্তরে তথাকথিত মুক্তমনাদের বিদ্রোহ, শীর্ষ নেতৃত্বের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী পাল্টা প্রত্যাঘাত— এই ঘটনাপুঞ্জ কেবল একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের বহিঃপ্রকাশের শুরু যেখানে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, মতাদর্শিক রাষ্ট্রচেতনা এবং গণআন্দোলনের জটিল সম্পর্ক একসঙ্গে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে একে কেবল যুদ্ধ কিংবা বা রেজিম পরিবর্তনের সরল ও একরৈখিক ছক থেকে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি আধুনিক বিশ্বরাজনীতির জটিল অন্তর্লীন টানাপোড়েনের বহিঃপ্রকাশ। ইরাক যুদ্ধ গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাতে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা কিছই পাওয়া যায়নি, উল্টে শাসনব্যবস্থা বদলের অভিযানে রূপ নেয়।

ফাঁসি হয় ইরাকের দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের। একইভাবে লিবিয়ায় মানবিক হস্তক্ষেপ গাদ্দাফি সরকারের পতন ডেকে এনেছে। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও তাই। এছাড়াও সরাসরি না হলেও ডিপ স্টেটের মাধ্যমে আমেরিকা মিশর, টিউনিশিয়া, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল প্রভৃতি দেশের রেজিম পরিবর্তন করেছে। প্রত্যেক ক্ষেত্রে অনুগত দুর্বল সরকার বসিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব কায়েম করেছে ওইসব দেশে । সাম্প্রতিক সময়ে নির্লজ্জতম উদাহরণ ভেনেজুয়েলারর মতো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধান মাদুরোকে সামরিক অভিযান চালিয়ে একপ্রকার কিডন্যাপ করে আমেরিকা নিজ দেশে তুলে নিয়ে গিয়েছে।‌ আমেরিকার মদতেই ইজরায়েল ঘটিয়ে চলেছে পৃথিবীর বৃহত্তম জেনোসাইড। ইরানের ক্ষেত্রে আমেরিকার আক্রমণের মূল কারণ তৈল ভাণ্ডারের উপর কর্তৃত্ব নেওয়া ছাড়াও হতে পারে— ইরানের‌ সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া, রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধের মনস্তত্ত্ব নষ্ট করা এবং শাসনব্যবস্থার ভরকেন্দ্রকে ধ্বংস করা।

অপরপক্ষে খামেনির কঠোর মৌলবাদী অনুশাসন থেকে দীর্ঘদিন ধরে বেরিয়ে আসতে চান দেশের একটা বড় অংশের মানুষ। এই দ্বৈততা খুব স্বাভাবিকভাবেই বিদ্রোহকে নৈতিকভাবে জটিল করে তুলেছে। কারণ প্রশ্ন উঠছে— এটি কি মুক্তচিন্তার মানুষদের স্বাধীনতার সংগ্রাম? নাকি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক খেলায় আমেরিকার নির্লজ্জ আধিপত্যবাদ? খনিজ সম্পদের লুটের গোপন এজেন্ডা? তবে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে উত্তেজনার ফলে বিষয়টি শুধুমাত্র দুটি তিনটি দেশের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে বলে মনে হয় না। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বটেই এমনকী রাজনৈতিক সমীকরণেও বিপুল প্রভাব পড়তে পারে।এই সংকট একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে— বাহ্যিক হস্তক্ষেপ কি সত্যিই একটি দেশের স্বাধীনতার পথ খুলে দেয়? দিলেও তার কি কোনো বৈধতা আছে? ইরানের পরিস্থিতি আজ ইতিহাসের জটিলতম মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যদি আমেরিকা বা ইজরায়েল এই অভ্যন্তরীণ জনশক্তিকে তোয়াক্কা না করে কোনো পুতুল সরকারকে জোর করে ক্ষমতায় বসাতে চায়, তবে ইরান একটি দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের ময়দান বা ‘দ্বিতীয় ভিয়েতনামে’ পরিণত হতে পারে । এই যুদ্ধের আগুন কেবল ইরানের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর বারুদের আঁচ সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো মার্কিন মিত্রদের ওপর তো বটেই এমনকী সারা বিশ্বে আছড়ে পড়তে পারে, যা পুরো বিশ্বের রাজনীতি ও ভূ-সংস্থান বদলে দেবে।