মানুষ বহু শতাব্দী ধরে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে— আমি যা দেখছি, তা কি সত্যিই বাস্তব? নাকি এই দৃশ্যপটের অন্তরালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনও নির্মাতা, অন্য কোনও দর্শক, অন্য কোনও অদৃশ্য মঞ্চ? এই প্রশ্ন একদিন দর্শনের অলিন্দে উচ্চারিত হয়েছিল, পরে সাহিত্য তাকে আশ্রয় দিয়েছে, আর আধুনিক কালে সিনেমা তাকে দৃশ্যমান করেছে। ১৯৯৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হলিউড চলচ্চিত্র ‘দ্য ট্রুম্যান শো’ সেই প্রশ্নকেই নতুন ভাষায় উচ্চারণ করেছিল। আজ, প্রায় তিন দশক পরে দাঁড়িয়ে বিস্ময় জাগে— চলচ্চিত্রটি কি কেবল কল্পনা ছিল, নাকি আমাদের বর্তমান সভ্যতারই পূর্বাভাস?
আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রত্যেকে যেন অদৃশ্য কোনও মঞ্চের চরিত্র। পার্থক্য শুধু এই যে, ট্রুম্যান জানতেন না তিনি অভিনয় করছেন, অথচ আমরা জানি, তবু অভিনয় ‘প্লেটো’ তাঁর বিখ্যাত ‘গুহার উপমা’-য় বলেছিলেন, মানুষ অনেক সময় ছায়াকেই বাস্তব বলে বিশ্বাস করে। গুহার দেওয়ালে প্রতিফলিত ছায়াকে সত্য মনে করে সে জীবন কাটিয়ে দেয়, অথচ প্রকৃত আলো ও সত্য তার অজানাই থেকে যায়। আশ্চর্যের বিষয়, ডিজিটাল যুগে এসে এই উপমা যেন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এখন আমাদের গুহার নাম— মোবাইলের পর্দা। আমাদের ছায়ার নাম— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল।
ফরাসি দার্শনিক জঁ বোদ্রিয়ার তাঁর ‘সিম্যুলাক্রা অ্যান্ড সিম্যুলেশন’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, এক সময় মানুষ এমন এক জগতে প্রবেশ করবে, যেখানে প্রতিরূপই বাস্তবকে গ্রাস করবে। সেখানে অনুকরণ এত নিখুঁত হবে যে মানুষ আর আসল ও নকলের পার্থক্য করতে পারবে না। আজ আমরা যে ভার্চুয়াল পরিচয় নির্মাণ করি— পরিমার্জিত ছবি, বাছাই করা মুহূর্ত, সাজানো হাসি, সম্পাদিত জীবন— তা কি ঠিক সেই সিম্যুলেশন নয়?
স্মার্টফোন আজ আর কেবল একটি যন্ত্র নয়, এটি মানুষের দ্বিতীয় চেতনা। ঘুম ভাঙার পর প্রথম স্পর্শটি অনেকের কাছে পরিবারের নয়, মোবাইলের। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নোটিফিকেশন, রিল, ক্ষণস্থায়ী ভিডিও, অবিরাম স্ক্রল— সব মিলিয়ে আমাদের মনোযোগকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। মানুষ এখন সময় কাটায় না; বরং সময় তাকে ব্যবহার করে।
মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছেন যে, অতিরিক্ত পর্দানির্ভরতা মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়ে দেয়, উদ্বেগ বাড়ায় এবং বাস্তব সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বল করে। ডিজিটাল স্বীকৃতির ক্ষণিক আনন্দ ধীরে ধীরে মানুষের আত্মপরিচয়কে বাইরের প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল করে তোলে। ফলে মানুষ নিজের চোখে নয়, অন্যের চোখে নিজেকে দেখতে শেখে।
‘দ্য ট্রুম্যান শো’-এর ট্রুম্যানের চারপাশের মানুষরা ছিল অভিনেতা। আজ আমাদের চারপাশের মানুষ বাস্তব হলেও, তাদের ডিজিটাল সংস্করণ অনেক সময় অভিনীত। কেউ দুঃখ লুকিয়ে হাসি প্রকাশ করে, কেউ সুখকে অতিরঞ্জিত করে, কেউ আবার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে দর্শকের জন্য সাজিয়ে তোলে। বাস্তব জীবন ক্রমশ পরিণত হচ্ছে প্রদর্শনীতে।
এই প্রসঙ্গে ব্রিটিশ লেখক ‘জর্জ অরওয়েল’-এর ‘নাইনটিন এইটি-ফোর’ উপন্যাসের কথা মনে পড়ে। সেখানে সর্বক্ষণ নজরদারির ধারণা ছিল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক। আজ সেই নজরদারি আরও সূক্ষ্ম। আমরা নিজেরাই স্বেচ্ছায় নিজেদের তথ্য, অবস্থান, ছবি, অভ্যাস এবং পছন্দ প্রতিনিয়ত প্রকাশ করছি। আমাদের ওপর নজর রাখার জন্য আজ আর কোনও সর্বশক্তিমান পর্দার প্রয়োজন নেই, আমরা নিজেরাই নিজেদের দৃশ্যমান করে তুলেছি।
হলিউড বহুবার এই বাস্তবতা ও সিম্যুলেশনের সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ দেখিয়েছে এমন এক পৃথিবী, যেখানে মানুষ একটি কৃত্রিম বাস্তবতার মধ্যে বন্দি। ‘ইনসেপশন’ প্রশ্ন তুলেছে—স্বপ্ন ও বাস্তবের সীমা কোথায়? ‘এক্স মাকিনা’ মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ককে নতুন আলোয় দেখিয়েছে। ‘হার’ দেখিয়েছে মানুষ কীভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে আবেগগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। ‘ব্ল্যাক মিরর’ ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্ব যেন আমাদের প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের অস্বস্তিকর আয়না। ‘রেডি প্লেয়ার ওয়ান’ ভার্চুয়াল জগতের আকর্ষণকে যেমন তুলে ধরে, তেমনই বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিপদও দেখায়।
এই চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে একটি মৌলিক সাদৃশ্য রয়েছে— সবকটিই মানুষকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়— আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের ব্যবহার করছে?
জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার প্রযুক্তিকে কেবল যন্ত্র হিসেবে দেখেননি, তিনি মনে করতেন প্রযুক্তি মানুষের বিশ্বকে দেখার পদ্ধতিকেই পরিবর্তন করে দেয়। আজ সেই কথার সত্যতা স্পষ্ট। আমরা প্রকৃতিকে চোখে দেখার আগেই ক্যামেরায় বন্দি করি। সূর্যাস্ত উপভোগ করার আগেই ছবি তুলি। খাবারের স্বাদ গ্রহণের আগে তার ছবি প্রকাশ করি। অভিজ্ঞতা যেন আর অভিজ্ঞতা নয়; তা হয়ে উঠেছে প্রদর্শনের উপকরণ।
অন্যদিকে শেরি টার্কল তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রযুক্তি মানুষকে সংযুক্ত করলেও এক ধরনের নিঃসঙ্গতার জন্ম দেয়। হাজার মানুষের সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত থেকেও ব্যক্তি গভীর একাকিত্বে ভোগে। কথোপকথনের জায়গা দখল করে নিচ্ছে বার্তা, উপস্থিতির জায়গা নিচ্ছে অনলাইন উপস্থিতি।
বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত মনোযোগের সংকট। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দেখার অভ্যাস দীর্ঘ লেখার প্রতি অনীহা সৃষ্টি করছে। দ্রুত উত্তেজনা মস্তিষ্ককে ধৈর্যহীন করে তুলছে। ফলত সাহিত্য, দর্শন, গভীর চিন্তা কিংবা দীর্ঘ আলোচনার প্রতি আকর্ষণ কমে যাচ্ছে। সভ্যতা যত তথ্যসমৃদ্ধ হচ্ছে, মনন তত খণ্ডিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
তবুও প্রযুক্তি শত্রু নয়। শত্রু হলো নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার। আগুন যেমন রান্নাও করে, আবার দহনও ঘটায়; প্রযুক্তিও তেমনি সৃষ্টির এবং ধ্বংসের— উভয় সম্ভাবনা বহন করে। প্রশ্ন প্রযুক্তির নয়, প্রশ্ন ব্যবহারকারীর প্রজ্ঞার।
‘দ্য ট্রুম্যান শো’-এর শেষ দৃশ্যে ট্রুম্যান যখন কৃত্রিম আকাশের দরজায় হাত রাখেন, তখন তিনি কেবল একটি স্টুডিও ছেড়ে বেরিয়ে যান না, তিনি মায়ার বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। সেই দরজা আজ আমাদের সামনেও রয়েছে। সেটি কোনও কাঠের দরজা নয়, সেটি সচেতনতার দরজা।
আজ যদি আমরা এক ঘণ্টা মোবাইল বন্ধ রাখতে না পারি, যদি বাস্তব মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের চেয়ে ভার্চুয়াল প্রতিক্রিয়াকে বেশি মূল্য দিই, যদি নিজের সুখের চেয়ে তার প্রদর্শনকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, তবে আমাদের জীবন ও ট্রুম্যানের জীবনের পার্থক্য কোথায়?
সম্ভবত আমরা সবাই কোনও না কোনোভাবে দর্শকও, আবার চরিত্রও। আমরা অন্যের জীবন দেখি, আবার অন্যরা আমাদের জীবন দেখে। এই অবিরাম দেখাদেখির মধ্যেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় ব্যক্তিগত নীরবতা, অন্তর্জগতের স্বাধীনতা এবং একান্ত মানবিকতা।
সপ্তদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্ত যখন তাঁর যুগান্তকারী উক্তি, ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি’ উচ্চারণ করেছিলেন, তখন তিনি মূলত মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে মৌলিক প্রমাণ হিসেবে তার স্বাধীন চিন্তাশক্তিকেই দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক একুশ শতকের এই চরম উৎকর্ষিত ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে দেকার্তের সেই চিরায়ত দর্শন যেন এক নতুন মাত্রায়, সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে উচ্চারণের জোরালো দাবি রাখে— আর তা হলো, ‘আমি সচেতন, তাই আমি স্বাধীন।’ বর্তমান সময়ে আমাদের দৈনন্দিন চিন্তাভাবনা, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিল প্রক্রিয়াগুলো ক্রমশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা-চালিত প্রযুক্তির অদৃশ্য হাতে চলে যাচ্ছে, যেখানে আমাদের অবচেতন মনকে প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রণ করছে সার্ভারে বসে থাকা অসংখ্য অ্যালগরিদম।
এই একচেটিয়া প্রযুক্তিগত আধিপত্যের প্রেক্ষাপটে কেবল সাধারণ অর্থে ‘চিন্তা করা’ আর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়, বরং আমরা ঠিক কী চিন্তা করছি, কার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে চিন্তা করছি এবং আমাদের সেই চিন্তার উৎস কোথায়, সে সম্পর্কে তীক্ষ্ণ ও নিরন্তর ‘সচেতনতা’ থাকলেই একমাত্র আমরা আধুনিক যুগের এই শৃঙ্খল ভেঙে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পেতে পারি। আগামী দিনের মানবসভ্যতার স্বাধীন অস্তিত্বের মূল চাবিকাঠি, যা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তিকে আমাদের ব্যবহার করা উচিত জীবনকে সহজ ও সমৃদ্ধ করার এক হাতিয়ার হিসেবে, কোনোভাবেই আমাদের মহামূল্যবান জীবন, আবেগ ও স্বাধীন সত্তাকে প্রযুক্তির পায়ে নিঃশর্তভাবে সমর্পণ করার জন্য নয়।