গত বছর চিন ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তের কাছে ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর প্রায় ১৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা। এটি হবে বিশ্বের বৃহত্তম একক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।কিন্তু কোনও দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে এই বাঁধ নীচের দিকে যে বিপুল বিপদ ডেকে আনতে পারে, সে বিষয়ে নদীর জল যে সব অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাদের প্রত্যেকেরই সতর্ক থাকা দরকার।
উচ্চ হিমালয়ে এই বিপুল নির্মাণকাজের ফলে যদি কোনও বড় ভূমিকম্প ঘটে, তা হলে তার পরিণতি হতে পারে একের পর এক বিপর্যয়ের শৃঙ্খল। এমন একটি ভূকম্পন বাঁধের ওপর বিপর্যয় ডেকে এনে শেষ পর্যন্ত বাঁধ ভেঙে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। আর তার অভিঘাত নেমে আসতে পারে ভারতের অসম ও অরুণাচল প্রদেশ হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত—অর্থাৎ নিম্ন অববাহিকার দেশগুলিতে তার প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ।
ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা এমনিতেই বিপুল পলি বহন, নদীর খাড়া ঢাল এবং নিজস্ব ভূমিকম্পপ্রবণতার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর সঙ্গে যদি উজানে অবস্থিত কোনও বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বা বাঁধের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে আকস্মিক বন্যার জল নেমে আসে, তা হলে অসম, অরুণাচল প্রদেশ এবং আরও নীচের দিকে বাংলাদেশের বিপন্নতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
আরও কয়েকজন গবেষক ‘রিজার্ভয়ার-ট্রিগার্ড সিসমিসিটি’ বা জলাধার-সৃষ্ট ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ, বিশাল জলাধারে জমা জলের বিপুল ওজন নিজেই ভূগর্ভের ফল্ট বা চ্যুতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং তার ফলে ভূমিকম্পের সূত্রপাত হতে পারে।
ভারতের জন্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে আরেকটি বিষয়। তিব্বত থেকে উৎপন্ন ইয়ারলুং সাংপো-সহ অন্যান্য নদীর জলপ্রবাহ সম্পর্কিত তথ্য চিন নিম্ন অববাহিকার দেশগুলির সঙ্গে ভাগ করে নেয়নি। এই দেশগুলির মধ্যে রয়েছে ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশ। এমনকি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা বাংলাদেশও এই তথ্য থেকে বঞ্চিত।
ফলে নেপালের এই ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহধসকে নিছক একটি স্থানীয় বিপর্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হিমালয়ের উজানে প্রকৃতির কোনও বড় পরিবর্তন কিংবা মানুষের নির্মাণকাজের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় নদীর প্রবাহপথ ধরে বহু দূরের অঞ্চলকে প্রভাবিত করতে পারে। নেপালের বন্যার অভিঘাত তাই সুদূর ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এই সম্ভাবনাই ভারত, বাংলাদেশ এবং গোটা নিম্ন হিমালয় অঞ্চলের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।