বিসর্জন এবং বিপন্ন নদী

File Photo

শরতের পেঁজা তুলো মেঘের আকাশ সরিয়ে যখন হেমন্তের সোনালি রোদ বাংলার প্রান্তরে এসে পড়ে, তখন আমাদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত বিষাদময় শূন্যতার সুর বেজে ওঠে। ঢাকির শেষ বাদ্যি, সিঁদুর খেলার আনন্দমুখর কোলাহল, ধূপের মিষ্টি সুবাস আর ধনুচি নাচের আমেজ কাটিয়ে কৈলাসে দেবী দুর্গার ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়েই বাঙালি জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব সমাপন ঘটে। বিজয় দশমীর দিন অশ্রুসজল চোখেই মাকে বিদায় জানানোর এই আবহমান সনাতন প্রথা কেবল এক পারিবারিক বা ব্যক্তিগত আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা কোটি কোটি মানুষের এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। কিন্তু পরম ভক্তি ও আনন্দের এই উৎসবমুখর মুহূর্ত পার হওয়ার ঠিক পরেই বাংলার নদনদী,  খাল-বিল, পুকুর ও জলাশয়গুলোর বুক চিরে যে তীব্র পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসে, তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। উৎসবের আলোর রোশনাইতে আমরা এতটাই বুঁদ হয়ে থাকি যে, প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে নদীতীরের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের কতটা অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হচ্ছে— তা উপলব্ধি করার অবকাশ আমাদের থাকে না।

প্রতিবছর বিজয়া দশমীর পুণ্যলগ্নে পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার ছোট-বড় দেবীপ্রতিমা গঙ্গা, ভাগীরথী, দামোদর, রূপনারায়ণ, কংসাবতী, তিস্তা কিংবা জলঢাকা-সহ অজস্র নদনদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। অতীতে যখন প্রতিমা নির্মাণের প্রধান উপাদান ছিল খাঁটি এঁটেল মাটি, বাঁশ, খড় ও প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ রঙ, তখন নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দিলে প্রকৃতির কোনও গুরুতর ক্ষতি হতো না। কিন্তু আধুনিক যুগের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা, বিশাল আকারের থিম পুজো এবং কৃত্রিম চাকচিক্য ফুটিয়ে তোলার তাগিদে প্রতিমা নির্মাণের সমগ্র কৌশল এবং উপাদানে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন মাটি ও খড়ের পাশাপাশি মূর্তি ও সাজসজ্জা তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকারক প্লাস্টিক, থার্মোকল, অ্যাক্রিলিক ফাইবার এবং সবচেয়ে বিপদজনক উপাদান সীসা ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও পারদের মতো মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ভারী ধাতুযুক্ত রাসায়নিক প্লাস্টার ও তেলের রং। এর পাশাপাশি পূজামণ্ডপের প্লাস্টিকের সাজসজ্জা, কৃত্রিম ফুল ও নানাবিধ উপাচার পলিথিনের প্যাকেটে করে সরাসরি নদীতে ছুঁড়ে ফেলার অভ্যাসে জলদূষণের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

বিভিন্ন বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিজয়া দশমীর বিসর্জনের পরপরই নদনদীর জলের গুণগত মানে আশঙ্কাজনক পতন ঘটে। দ্রবীভূত রাসায়নিক পদার্থের চাপে জলের বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (BOD) এবং কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (COD) নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে জলে থাকা দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এই তীব্র অক্সিজেন সংকটের সরাসরি শিকার হয় নদী তলদেশের জলজ উদ্ভিদ এবং অগণিত মৎস্যকুল। প্রতিবছর বিসর্জনের ঠিক পরপরই রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল কিংবা খয়রা-সহ অজস্র প্রজাতির দেশীয় মাছের মরে ভেসে ওঠার দৃশ্য সংবাদ শিরোনামে উঠে আসে। নদনদীর এই প্রাকৃতিক সিস্টেম বা জলজ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের ফলে নদীর স্বাভাবিক পরিস্রুতকরণ ক্ষমতাও চিরতরে নষ্ট হতে বসেছে। নদীর জল রাসায়নিকের বিষে এমন এক বিষাক্ত তরলে রূপান্তরিত হয়, যা পশুপাখি থেকে শুরু করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ে।


পরিস্থিতির গভীরতা বিবেচনা করে বিগত কয়েক বছরে পরিবেশ আদালতের কঠোর নির্দেশে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং বিভিন্ন পৌরসভার পক্ষ থেকে নদী সুরক্ষায় বেশ কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। গঙ্গার মত গুরুত্বপূর্ণ প্রধান নদীগুলোতে মূল স্রোতকে দূষণমুক্ত রাখতে জেটি, ক্রেন ও পনটুন ব্রিজের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে বিসর্জনের পরপরই প্রতিমার বাঁশ ও কাঠামো তুলে নেওয়া যায়। অনেক স্থানে মূল নদীর বাইরে কৃত্রিম জলাশয় বা ‘ইকো-ট্যাঙ্ক’ নির্মাণ করে সেখানে প্রতিমা নিরঞ্জনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তব সত্য এটাই যে, এই সরকারি উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা কেবল কলকাতার গঙ্গার কিছু সুনির্দিষ্ট ঘাট বা বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। পঞ্চায়েত ও গ্রামাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার ছোট নদী, খাঁড়ি ও দীর্ঘদিনের পুরনো পুকুরগুলোতে এখনও কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি ছাড়াই অবলীলায় প্রতিমা ফেলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে আইন ও সচেতনতার অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।

ধর্মীয় বিশ্বাস, ভাবাবেগ এবং নদীমাতৃক বাংলার জীববৈচিত্র্য রক্ষা— এই দুটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর স্থায়ী সমাধান লুকিয়ে রয়েছে মৃৎশিল্পী, পুজো উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের মধ্যে।

প্রথমত, প্রতিমা নির্মাণে ক্ষতিকর ভারী ধাতু কেমিক্যাল রঙের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এর বদলে ঐতিহ্যবাহী বায়ো-ডিগ্রেডেবল বা পচনশীল প্রাকৃতিক উপাদান ও উদ্ভিজ্জ রংয়ের (যেমন গাঁদা ফুল, নীল, হলুদ বা পালং শাকের নির্যাস থেকে তৈরি রং) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। কুমোরটুলি-সহ রাজ্যের সমস্ত মৃৎশিল্পীদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুদান, পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ও বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, প্রাচীনকালের মতো মূল নদীর জলে কাঠের পুরো কাঠামো ডুবিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেলে রাখার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। ‘ওয়াটার স্প্রে’ বা উচ্চচাপের জলধারার সাহায্যে পাড়েই মাটি গুলিয়ে কাঠামোটি তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে নেওয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে সমস্ত পুরসভা এবং পঞ্চায়েত এলাকায় বিসর্জনের নির্দিষ্ট ইকো-পুকুর নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরী, যেখান থেকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে সমস্ত বর্জ্য নিষ্কাশন করে পুনরায় জল শোধন করা সম্ভব।

তৃতীয়ত, বিসর্জনের সময় ফুল, বেলপাতা, প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করে রাখার জন্য প্রতি ঘাটে পৃথক বর্জ্য ফেলার ডাস্টবিন ও প্লাস্টিক রিসাইক্লিং ইউনিট বসানো দরকার।

বাঙালি জাতি কেবল উৎসবের আনন্দে মেতে উঠতেই জানে না, বরং প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক বন্ধন বজায় রেখেই গড়ে উঠেছে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য ও কৃষ্টি। নদী এ দেশের ধমনী, নদীই এ বাংলার জীবনস্পন্দন। মা দুর্গাকে প্রতিবছর যেভাবে পরম শ্রদ্ধায় আমরা আহ্বান জানাই, তেমনই তাঁর বিদায়বেলায় তাঁরই সৃষ্টি এই সুজলা-সুফলা বসুন্ধরা ও নদনদীকে সুস্থ ও দূষণমুক্ত রাখার নৈতিক দায়িত্বও আমাদেরই কাঁধে এসে পড়ে। দেবী বিসর্জনের শূন্যতার সাগরে ভেসে যাওয়ার দিনে কেবল বাকসর্বস্ব ভাবাবেগ নয়, নদী ও পরিবেশ রক্ষায় প্রতিটি নাগরিকের রূপায়িত দায়বদ্ধতাই হতে পারে আগামীর সবচেয়ে পবিত্র ও সার্থক দুর্গাপূজার অঙ্গীকার।