হরমুজ সঙ্কট

ফাইল চিত্র

পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা নতুন কিছু নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক হরমুজ প্রণালী ঘিরে যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক গভীর বিপদের ইঙ্গিত বহন করছে। গত বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩.৪ শতাংশ— অতি উচ্চ না হলেও স্থিতিশীলতার একটি চিহ্ন ছিল তাতে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৬ সালের জন্য ৩.১ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। এখন সেই সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি নেমে ২.৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে, এমন আশঙ্কাই প্রবল হয়ে উঠছে। কারণ একটাই, হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই সরু জলপথের উপর নির্ভরশীল। গত প্রায় পঞ্চাশ দিনে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রবাহ সেখানে প্রায় থমকে গেছে। উপসাগরীয় দেশগুলি বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, প্রায় ৫০ কোটি ব্যারেল তেল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। শুধু তেল নয়, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর চলাচলও বন্ধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার, অ্যালুমিনিয়াম, হিলিয়াম ও সালফারের ঘাটতি— যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ধাতু শিল্পে, বিশেষত তামা ও নিকেলের উৎপাদনে।

এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বড় ধাক্কা খেতে পারে। উৎপাদন কমবে, মূল্যবৃদ্ধি বাড়বে, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়বে। এক কথায়, এটি কেবল একটি আঞ্চলিক সঙ্কট নয়— এটি এক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস।


প্রশ্ন হল, এই সঙ্কটের সমাধান কী? সামরিক শক্তি দিয়ে কি হরমুজকে খোলা সম্ভব? সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, উত্তরটি সহজ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ ইরানের নৌবাহিনীকে আঘাত করলেও, সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি। ইরানের হাতে এখনও রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও দ্রুতগতির নৌযান, যা দিয়ে তারা আঘাত হানতে সক্ষম। ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজে হামলার ঘটনাই তার প্রমাণ।
এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে দেয়, শুধু শক্তি প্রয়োগে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং তা সঙ্কটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এর বিপরীতে কূটনৈতিক আলোচনা অনেক দ্রুত ও কার্যকর ফল দিতে পারে। গত সপ্তাহেই আমরা তার আভাস পেয়েছিলাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার সূচনা, ইজরায়েল-লেবানন সংঘর্ষবিরতি, এবং ইরানের অপ্রত্যাশিতভাবে অবরোধ শিথিল করার সিদ্ধান্ত— সব মিলিয়ে এক আশাব্যঞ্জক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তেলের দাম কমেছিল, শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়েছিল।

কিন্তু সেই আশার আলো আবার ম্লান হতে শুরু করেছে। নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে, আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার নিয়ে মতভেদ। এখানেই বড় প্রশ্ন— একটি দেশের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কি সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিকে পণবন্দী করে রাখা হবে? নাকি বৃহত্তর স্বার্থে আপসের পথ খোঁজা হবে?

কূটনীতির একটি মৌলিক নীতি হল, সম্মান ও পারস্পরিক স্বীকৃতি। প্রতিপক্ষকে ক্রমাগত অপমান করে বা কোণঠাসা করে কোনও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আনা যায় না। ইরান যখন সাময়িকভাবে অবরোধ শিথিল করেছিল, তখন সেটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে স্থায়ী সমাধানের পথে এগোনো যেত। কিন্তু সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি বলেই মনে হচ্ছে।

আজ পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে উপসাগরীয় দেশগুলি তাদের স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরবে না। ফলে জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকবে, শিল্পোৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিশ্ব রাজনীতির এই অস্থির সময়ে নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং দূরদর্শী কূটনীতি এখন বেশি জরুরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের দাবিদার হয়, তবে তাকে বুঝতে হবে— হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা কেবল একটি আঞ্চলিক বিষয় নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

অতএব, অগ্রাধিকার হওয়া উচিত স্পষ্ট— সংলাপের মাধ্যমে দ্রুত সঙ্কট নিরসন। কারণ এই সঙ্কট যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, তার মূল্য দিতে হবে গোটা বিশ্বকে।