উজ্জ্বলকুমার দত্ত
একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাস যখন রচিত হচ্ছে অস্থিরতার কালি দিয়ে, তখন ভারত যেন সেই ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এক ভিন্ন স্বাক্ষর রাখতে চাইছে—নীরবে, সংযতভাবে, কিন্তু গভীর কৌশলে। বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে আজ যখন শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে, তখন ভারত বেছে নিয়েছে এক তৃতীয় পথ। সেই পথ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বা সম্পূর্ণ জোটবদ্ধ নয়। পথটি বরং এক সুসংহত ও হিসেবি ভারসাম্য যুক্ত। এই পথের সারমর্ম যেন একটি বাক্যেই ধরা পড়ে—“সবার সঙ্গে সৌহার্দ্য, কিন্তু নিজের পথ নিজে।”
এই দর্শনের ঐতিহাসিক ভিত্তি নিহিত রয়েছে জওহরলাল নেহরু’র প্রবর্তিত জোটনিরপেক্ষতার নীতিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব যখন বিভক্ত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর নেতৃত্বাধীন দুই শক্তিশালী গোষ্ঠীতে, তখন ভারত ঘোষণা করেছিল—সে কোনো পক্ষের অনুসারী হবে না। এই নীতি ছিল একদিকে আদর্শবাদী, অন্যদিকে নবস্বাধীন দেশের আত্মসম্মানের প্রতীক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে এই নীতি রূপান্তরিত হয়েছে। আজকের ভারত আর শুধুমাত্র আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং বাস্তবতার কঠোর মাটিতে দাঁড়িয়ে সে তার পথ নির্ধারণ করছে।
বর্তমান বিশ্বের কূটনৈতিক সমীকরণ অত্যন্ত জটিল। শক্তির ভারসাম্য ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত একাধিক শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে এক বিশেষ অবস্থান গড়ে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’র সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আজ বহুমাত্রিক। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, মহাকাশ গবেষণা ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলিতে সহযোগিতা বাড়ছে। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে। কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতার মাঝেও ভারত নিজেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের মধ্যে আবদ্ধ করেনি। কারণ ভারত জানে, যে জোটের বন্ধন অনেক সময় স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, রাশিয়া’র সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এক দীর্ঘ ইতিহাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকা ভারতের জন্য আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, পেট্রোলিয়াম ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে ভারত রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যখন পশ্চিমের দেশগুলি রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, তখন ভারত একটি স্বতন্ত্র পথ বেছে নেয়। ভারত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে, এমনকি সস্তায় তেল আমদানি করে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে। এই সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে যে ভারতের কূটনীতি আবেগপ্রবণ নয়; এটি সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত।
একইভাবে ইরান-এর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাবাহার বন্দর প্রকল্প ভারতের জন্য এক নতুন বাণিজ্যপথের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যা পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। আবার ইজরায়েল-এর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক প্রতিরক্ষা ও কৃষি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, গোয়েন্দা প্রযুক্তি এবং কৃষি উদ্ভাবনে ইজরায়েলের সহযোগিতা ভারতের সক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
কিন্তু এই বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে জটিল এবং সংবেদনশীল দিক হলো চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক। একদিকে দুই দেশের মধ্যে বিপুল বাণিজ্য আবার অন্যদিকে তাদের মধ্যে সীমান্তে উত্তেজনা। এই দ্বৈততা সম্পর্কটিকে এক অনিশ্চিত অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ডোকলাম ও লাদাখের সংঘর্ষ দেখিয়ে দিয়েছে যে শান্তি কতটা ভঙ্গুর হতে পারে। তবুও ভারত চীনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথ বেছে নেয়নি। কারণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য তাকে তা করতে দেয় না।
এই বহুমাত্রিক সম্পর্কের জাল ভারতকে একদিকে যেমন শক্তিশালী করে; অন্যদিকে তেমনি তৈরি করে এক গভীর দোলাচল। প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এই সম্পর্কগুলি কি সংকটের সময়ে ভারতের পাশে দাঁড়াবে? আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি নির্মম সত্য হলো এই যে এখানে স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই। সারা বিশ্বজুড়ে রয়েছে কেবলই স্বার্থের সমীকরণ। আজ যে দেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরন করছে, কাল সে নিজের স্বার্থের জন্য অন্য পথ বেছে নিতে পারে। ফ্রান্স ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে তুলেছে এবং যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে—কিন্তু তার পেছনেও রয়েছে অর্থনৈতিক লাভ এবং কৌশলগত হিসেব নিকেষ।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রসংঘ’র কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিশ্বশান্তি রক্ষার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা বহু ক্ষেত্রে তার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ হোক বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা অনেক সময়ই নিষ্ক্রিয় বলে মনে হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা প্রায়শই কার্যকর পদক্ষেপকে বাধাগ্রস্ত করে।
এই বাস্তবতায় ভারতের কূটনৈতিক দর্শন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—“নিজের শক্তি নিজেই গড়ে তোলো, কিন্তু কারও সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করো না।” কারণ ভারত জানে, চূড়ান্ত মুহূর্তে কোনো দেশই অন্য দেশের জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেবে না। ঠিক এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে ভারতের সংঘাত চরমে পৌঁছায়, তখন এই বহুমুখী বন্ধুত্ব কতটা কার্যকর হবে? সম্ভবত কিছু দেশ কৌশলগত সমর্থন দেবে। হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি বা সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে কিনা, তা নির্ভর করবে তার নিজস্ব স্বার্থের উপর। রাশিয়া নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করবে, কারণ তার নিজস্ব সম্পর্ক রয়েছে চীনের সঙ্গে। ইউরোপীয় দেশগুলি নৈতিক সমর্থন জানাতে পারে, কিন্তু সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা যথেষ্ট কম। এই বাস্তবতা ভারতের সামনে এক কঠিন সত্য তুলে ধরতে পারে। তার সারমর্ম হলো—অন্যের উপর নির্ভর না থেকে, নিজের শক্তির উপর ভরসা রাখা।
ভারতের বিশাল অর্থনীতি এবং বিপুল বাজার তাকে এক অনন্য অবস্থান প্রদান করে। বিশ্ব আজ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী—কারণ ভারত একটি সম্ভাবনার কেন্দ্র। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত অবস্থান তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু এই গুরুত্বই আবার তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। বিশেষ করে চীন-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে ভারত একটি বড় প্রতিযোগী।
তাহলে কি ভারতের এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি যথেষ্ট?
উত্তরটি সরল নয়। এই কৌশল ভারতকে নমনীয়তা দেয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিকল্প পথ খোলা রাখে। কিন্তু একইসাথে এটি একটি সীমাবদ্ধতাও বহন করে—কারণ সংকটের সময় কোনো সম্পর্কই সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়। এই দ্বৈততার মধ্যেই ভারতের কূটনীতির প্রকৃত শক্তি নিহিত। ভারত আজ বুঝতে পেরেছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত এক আত্মনির্ভর ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে। এখানে প্রত্যেক দেশকেই নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয়। তাই ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরতার উপর জোর—এসব উদ্যোগ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়; এগুলি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকটের প্রস্তুতি। একইসঙ্গে ভারত তার কূটনৈতিক সম্পর্কগুলিকে আরও গভীর করছে—কিন্তু কোনো একক শক্তির উপর নির্ভর না করে।
সবশেষে বলা যায়—ভারতের কূটনীতি এক নীরব শক্তির প্রতীক। ততটা উচ্চকণ্ঠ নয়, কিন্তু দৃঢ়; আবেগপ্রবণ নয়, কিন্তু সুপরিকল্পিত। বন্ধুত্ব থাকবে, সম্পর্ক থাকবে—কিন্তু সম্পূর্ণ নির্ভরতা কদাচ নয়। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতির নির্মম সত্য হলো এই যে —বন্ধু বদলায়, স্বার্থ বদলায়, জোট ভেঙে যায়— কিন্তু যে দেশ নিজের শক্তির উপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়; শেষ পর্যন্ত তারাই ইতিহাস রচনা করে। ভারত সেই পথেই এগোচ্ছে—নীরবে, সংযতভাবে, কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে ও নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্মাণের লক্ষ্যে।