মানুষ কি শুধু বর্তমানের জন্য বাঁচবে, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দেবে? প্রশ্নটি কঠিন মনে হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং মানবসভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব।
২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর ল্যানসেট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে একটি পর্যালোচনা। প্রবন্ধটি আমাদের মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, তার সুফল বা কুফল শুধু বর্তমান প্রজন্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জলবায়ু পরিবর্তন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, পারমাণবিক সংঘাত কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার— প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের বর্তমানের কাজ ভবিষ্যৎ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনধারণের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। ভবিষ্যৎ বলতে আমরা কতটা ভবিষ্যৎকে বুঝব? আগামী দশ বছর, একবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত, নাকি কয়েকশো বা কয়েক হাজার বছর পরের মানবসমাজ?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে আমরা রোগের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা করি, পাশাপাশি প্রতিরোধের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গ্রহণ করি। একজন চিকিৎসক রোগীর বর্তমান উপসর্গ দূর করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রোগের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে চান। একইভাবে জনস্বাস্থ্যনীতির কাজ শুধু বর্তমানের অসুস্থতা কমানো নয়, আগামী দিনের রোগ, অকালমৃত্যু এবং স্বাস্থ্যবৈষম্যের ঝুঁকিও কমানো।
ব্যক্তিগত চিকিৎসা ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আজকের একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব বহু দশক, এমনকি শতাব্দী ধরে চলতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে দীর্ঘদিন থেকে যায়। অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা বাড়িয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলতে পারে। মহামারি মোকাবিলার গবেষণায় আজ বিনিয়োগ করলে আগামী দিনে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব। অর্থাৎ বর্তমানের আরাম ও সুবিধার সঙ্গে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যস্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
বর্তমান প্রজন্মের খাদ্য, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার প্রয়োজন যেমন বাস্তব, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের সময় এই দুইয়ের মধ্যে ন্যায্য ভারসাম্য স্থাপন করা জরুরি। ২১০০ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা করলে জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যার বার্ধক্য, দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং প্রযুক্তিগত ঝুঁকির সম্ভাব্য প্রভাব পরিমাপ করা যায়। কিন্তু ২১০০ সাল মানবস্বাস্থ্যের ভবিষ্যতের শেষ নয়। দূর ভবিষ্যতের মানুষের স্বাস্থ্যও আজকের সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হতে পারে। পরিবেশের ক্ষতি, প্রাকৃতিক সম্পদের নিঃশেষ, জীবাণুর বিবর্তন এবং বিপজ্জনক প্রযুক্তির বিস্তার বহু প্রজন্ম ধরে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, ভবিষ্যৎ যত দূরে যায়, পূর্বাভাসের অনিশ্চয়তাও তত বাড়ে।
আমরা যদি বর্তমানের অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য পরিবেশদূষণ বাড়াই, তা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তার মূল্য দিতে হতে পারে। আবার মহামারি প্রতিরোধে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিপুল প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থরক্ষার নামে বর্তমানের দরিদ্র মানুষকে আরও বঞ্চিত করাও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আজ যে শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, যে পরিবার চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছে না, কিংবা যে মানুষ দূষিত পরিবেশে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা আগামী শতাব্দীর পরিকল্পনার জন্য পিছিয়ে রাখা যায় না। অতএব, ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যনীতি এমন হওয়া উচিত, যাতে বর্তমানের বঞ্চিত মানুষ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জনগোষ্ঠী— উভয়ের স্বার্থ রক্ষিত হয়।
২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ‘দ্য ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ’ এই আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। কমিশন ২০২৫ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বস্বাস্থ্যের জন্য ১৭টি আন্তঃসম্পর্কিত বিপর্যয়কর ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, মহামারি, অপুষ্টি, স্থূলতা, মানসিক অসুস্থতা, আয়বৈষম্য, নিম্ন শিক্ষার হার, পারমাণবিক সংঘাত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইচ্ছাকৃত অপব্যবহার। শিক্ষার অভাব স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক আচরণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন তাপজনিত অসুস্থতা, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি বাড়ায়। সংঘাত হাসপাতাল ধ্বংস করে, ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত করে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে। প্রতিটি সমস্যাকে আলাদা করে সমাধানের চেষ্টা যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ভারতের মতো জনবহুল ও বৈচিত্র্যময় দেশে এই আলোচনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, পুষ্টি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অন্যদিকে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, ক্যান্সার ও মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যার বোঝাও বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বায়ুদূষণ, তীব্র তাপপ্রবাহ, বন্যা এবং জলবায়ুজনিত বিপর্যয়। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ভবিষ্যতের সংক্রমণের চিকিৎসাকেও কঠিন করে তুলতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের স্বাস্থ্যপরিকল্পনায় একই সঙ্গে দুটি সময়সীমা থাকা দরকার।
প্রথমত, অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ— প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র শক্তিশালী করা, মাতৃ ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা, টিকাকরণ বাড়ানো, অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি— জলবায়ু-সহনশীল হাসপাতাল, ভবিষ্যৎ মহামারির নজরদারি, স্বাস্থ্যগবেষণায় বিনিয়োগ, প্রবীণদের জন্য উপযুক্ত পরিষেবা এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিশেষত, স্বাস্থ্যবাজেটে শুধু বর্তমানের রোগের চিকিৎসার খরচ নয়, ভবিষ্যতের বিপর্যয় প্রতিরোধের জন্যও অর্থ বরাদ্দ করা প্রয়োজন। কারণ প্রতিরোধে আজ যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তা আগামী দিনের প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে পারে।
বিশ্বস্বাস্থ্য কমিশনের সুপারিশকে তিনটি মূল ধারণায় সংক্ষেপ করা যায়— প্রস্তুতি গড়ে তোলা, নতুন সমাধানে বিনিয়োগ এবং ঝুঁকির ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ। প্রথমত, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে অপ্রত্যাশিত মহামারি, জলবায়ু বিপর্যয় কিংবা নতুন প্রযুক্তিগত ঝুঁকির মোকাবিলা করা যায়। দ্বিতীয়ত, নতুন টিকা, কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক, উন্নত রোগনির্ণয় এবং নিরাপদ স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে। তবে উদ্ভাবন যেন কেবল ধনী দেশ বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, ঝুঁকির মূল্যায়ন নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। আজ যে বিপদকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে, নতুন তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে তার গুরুত্ব বদলাতে পারে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। কোনও ভাইরাস, দূষণকারী পদার্থ কিংবা প্রযুক্তিগত বিপর্যয় রাজনৈতিক সীমান্ত মেনে চলে না।তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা— আগামী ১ থেকে ৫ বছরে প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা— আগামী ৫-২৫ বছরে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা, পরিবেশ ও গবেষণার কাঠামোগত উন্নয়ন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা— ২১০০ সাল পর্যন্ত জলবায়ু, প্রযুক্তি, জনসংখ্যা ও বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সম্ভাব্য প্রভাব। আন্তঃপ্রজন্মগত দায়বদ্ধতা— ২১০০ সালের পরেও মানবস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ মানুষের জীবনধারণের সম্ভাবনা রক্ষার নৈতিক অঙ্গীকার।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের ভিত তৈরি হচ্ছে আজকের হাসপাতাল, বিদ্যালয়, গবেষণাগার, পরিবেশনীতি, স্বাস্থ্যবাজেট এবং আমাদের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তের মধ্যে। সঠিক সময়সীমা সেইটিই, যা বর্তমানের জরুরি প্রয়োজন মেটায়, দীর্ঘমেয়াদি বিপদ প্রতিরোধ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করে না। আজই আগামী শতাব্দীকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর সময়।