সিঙ্গুরে শিল্পায়নের সাঁঝবাতির রূপকথা

টাটার পরিত্যক্ত জমি অফলনযোগ্য হয়ে বর্তমানে অহল্যাভূমিতে পরিণত হয়েছে। পুরনো মূল্যবোধেও এসেছে পরিবর্তন। সেখানে আর কৃষি বনাম শিল্পের দ্বন্দ্ব নেই, নেই ইচ্ছুক-অনিচ্ছুকের দায় নিয়ে কোনও আন্দোলন। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষির ভিত্তিতে এসেছে উপেক্ষার সুর। অন্যদিকে শিল্পায়নের স্বপ্ন আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে। সেই সন্ধিক্ষণে ১৮ জানুয়ারি দেশের প্রধানমন্ত্রী ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনী প্রচারে সিঙ্গুরের মানুষের মনে শিল্পায়নের স্বপ্ন জেগে ওঠে। অথচ প্রধানমন্ত্রীর মুখে তার প্রতিশ্রুতি মেলে না। অন্যদিকে তার পাল্টা ২৮ জানুয়ারি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সিঙ্গুরের জনসভা আয়োজনে সেই শিল্পের প্রত্যাশা আবারও জেগে ওঠে। সেখানে কৃষি ও শিল্পের সমন্বয়ের বার্তা দেওয়া হলেও শিল্পের প্রত্যাশা এখনও হাতছানি দেয়।

আসলে সময় বদলে যায়, বদলায় মানুষের মন। ইতিহাসের পালাবদল ঘটে। কৃষি বনাম শিল্পের দ্বৈরথ আজও বহমান। অথচ তার চাহিদায় আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বছর কুড়ি আগে এ রাজ্যে কৃষি বনাম শিল্প নিয়ে যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা আজও জীবন্ত ইতিহাস। সেখানে কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলন যে তীব্র প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছিল, তা আজ আর নেই। সেদিনের অনিচ্ছুক কৃষকরাই আজ শিল্পায়নের পক্ষে। সিঙ্গুর থেকে বিতাড়িত টাটা শিল্পগোষ্ঠীর পরিত্যক্ত নিষ্ফলা জমিতেই এখন টাটাকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন ছড়িয়ে পড়েছে। ‘কৃষির ভিত্তিতে শিল্পের ভবিষ্যৎ’ দেখতে চাওয়া মানুষের মনেও শিল্পের সাঁঝবাতির রূপকথা জেগে উঠেছে। সেদিনের রক্তাক্ত ইতিহাস অবিস্মরণীয় হলেও তাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন প্রত্যাশা জেগে উঠেছে।

আসলে সরকারি উদ্যোগে শিল্পস্থাপন নিয়ে হুগলি জেলার সিঙ্গুর থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে কৃষি বনাম শিল্পের বুনিয়াদি চেতনায় যেভাবে জনমানসে তীব্র আন্দোলন সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা ইতিপূর্বে কখনও লক্ষ্য করা যায়নি। বিশেষ করে যেখানে কৃষি থেকে শিল্পমুখী আধুনিক চেতনা আপনাতেই সক্রিয় হয়, সেখানে শিল্প স্থাপনে সরকারি সক্রিয় উদ্যোগও জনসমর্থন লাভে ব্যর্থ হওয়াই শুধু নয়, তা প্রতিরোধে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। বিশেষ করে উন্নয়নের নামে ভিটেছাড়া করার বার্তায় আত্মসংকটের তীব্রতা শুধু সাধারণ্যে সরকারবিরোধী মানসিকতাকে উচ্চকিত করেনি, সেইসঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিও প্রশ্ন তুলেছে। ফলে তার পরিসর শুধুমাত্র আঞ্চলিক থাকেনি, রাজনীতির বৃহত্তর আঙিনায় তা সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।


শিল্পের জন্য জোর করে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সময়ান্তরে দ্রুতগতিতে সরকারে থাকার নির্ণায়ক শক্তির আধারে সক্রিয়তা লাভ করে। সেক্ষেত্রে জমি দিতে ইচ্ছুকের চেয়ে অনিচ্ছুকের পাল্লা ভারী না-হলেও রাজনৈতিক সক্রিয়তায় সেই আন্দোলন সারা রাজ্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শুধু তাই নয়, সরকারের পাশাপাশি শাসকদলের তৎপরতায় আন্দোলনকে দমনের নির্মম প্রয়াসে আন্দোলন আরও গতিলাভ করে। এজন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে সেই আন্দোলন গণমাধ্যমের দৌলতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণের সংবেদনশীলতাকে সক্রিয় করে তোলে।প্রসঙ্গত, গণমাধ্যমের সরাসরি সংযোগের বিষয়টি ইতিপূর্বের আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত ছিল না। সেক্ষেত্রে দ্রুতগতিতে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের সংবাদভাষ্য যেভাবে সরাসরি দূরদর্শনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে শুধু জনমত গড়ে তোলাই সহজসাধ্য হয়নি, সেইসঙ্গে সেই আন্দোলন নিয়ে জনমানসে অস্তিত্ব-সংকটের সোপানে পক্ষ-প্রতিপক্ষের অবস্থানজনিত পরিসরটিকেও নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

২০০৬-এর ডিসেম্বরের সূচনায় টাটাকে গাড়ি শিল্প গড়ে তোলার জন্য জমি অধিগ্রহণের জন্য বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হওয়ায় অনিচ্ছুক গ্রামবাসীদের প্রতিরোধ ক্রমে প্রতিবাদের রূপ নেয়। সেক্ষেত্রে অচিরেই সেই কৃষিজমি রক্ষা কমিটির আন্দোলন দমনের জন্য নির্মম পাশবিকতা নেমে আসে। ১৮ ডিসেম্বর আন্দোলনে সামিল হওয়া কিশোরী তাপসী মালিক ধর্ষিত হয়েও রেহাই পায়নি, তাকে খুনও করা হয়। অবশ্য এই নৃশংস হত্যালীলাই অনিচ্ছুক কৃষিজীবীদের যেমন আরও বেশি সক্রিয় করে তোলে, তেমনই জনসমর্থনের পরিসরকে বিস্তৃতি দেয়। সেই সমর্থন আজ কঠোর বাস্তবতায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছে, জেগে উঠেছে শিল্পায়নের তীব্র আকুতি।

অন্যদিকে, সিঙ্গুরের কৃষিজমি রক্ষা কমিটির আন্দোলনের দৃষ্টান্তে জোর করে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি জনমানসে যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল, তা নন্দীগ্রামের ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির পরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস টানা আন্দোলনের মধ্যেই প্রতীয়মান। ইন্দোনেশিয়ার সালিম গ্রুপের কেমিক্যাল হাবের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তথা ‘সেজ’-এর মাধ্যমে সরকারিভাবে দশ হাজার একর কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আবির্ভাব ছিল তাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনতার তীব্র প্রতিবাদের ঐকতান। আর সেই প্রতিবাদকে নির্মমভাবে দমন করতে গিয়ে ২০০৭-এর ১৪ মার্চ যেভাবে চোদ্দোজন গ্রামবাসীকে খুন করা হয়, তা শুধু সেই আন্দোলনকে রক্তাক্ত ইতিহাসে সামিল করেনি, বরং সেই আগ্নেয় অস্ত্রে ঝলসানো আলোই প্রতিবাদী মশাল হয়ে ওঠে।

যার প্রতিফলন সমাজের প্রায় সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য তা শুধু প্রতিবাদী চেতনাতেই সীমায়িত থাকে না, তার বিপ্রতীপে জনমত গড়ে তোলার প্রয়াসও সক্রিয় হয়। সেক্ষেত্রে শাসকবিরোধী মানবিক অভিমুখে তীব্র সহানুভূতির জোয়ারে আঞ্চলিক পরিসরটি স্বল্প সময়ের মধ্যেই জনমানসের বৃহত্তর চেতনালোকে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের প্রতিবাদী জনকণ্ঠের সঙ্গে একাত্মবোধে যেভাবে সংবেদনশীল শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী মানুষের জনসংযোগের আবহ রঙিন গণমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তাতে রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার অচলায়তন অচিরেই ভেঙে যায়। সেদিক থেকে ইতিপূর্বের রাজনীতি সম্পৃক্ত আন্দোলনের সঙ্গে জমি অধিগ্রহণজনিত আন্দোলনের প্রকৃতি স্বতন্ত্র হয়ে পড়ে।

শুধু তাই নয়, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলন দীর্ঘলালিত রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিই জনবিমুখ মানসপ্রকৃতি নিয়ে প্রশ্নের অবকাশে মূল্যবোধের মূলে আঘাত নেমে আসায়, তা থেকে বেরিয়ে আসার সদিচ্ছায় সংবেদনশীল জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ফলে অস্তিত্বের শিকড়ে টান লাগায় আত্মসমীক্ষার অবকাশে কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনের পরিসরটি রাজনীতি অপেক্ষা মানবিক অভিমুখে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। সেখানে পক্ষ-প্রতিপক্ষের দ্বন্দ্ব অপেক্ষা মানবিক সাপেক্ষই প্রাধান্য লাভ করায় তার রাজনৈতিক মেরুকরণ অপেক্ষা জনগণের স্বাধিকারের প্রশ্নটিই জনমানসে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

সেক্ষেত্রে শাসকবিরোধী অবস্থানে শুধু বিরোধী দলই নয়, শাসকদলের আদর্শপুষ্ট সমর্থকের সরে আসার বিষয়টিও বিশেষভাবে স্মরণীয়। নন্দীগ্রামের ১৪ মার্চের গণহত্যা বিশ্বাস ও ভালোবাসার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মাঝে যেভাবে ফাটল ধরিয়ে আদর্শবোধে আঘাত হেনেছে, তাতে সিঙ্গুরের কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনের অভিমুখটি মানবতা সুরক্ষার বিপ্লবের দিকে ধাবিত হয়। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক অবস্থান থেকে সংগঠিত আন্দোলনই সময়ান্তরে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে গণআন্দোলনের রূপ লাভ করে, তা শুধু অভাবিতই নয়, অভিনবও বটে।

স্বাভাবিকভাবেই এরূপ আন্দোলনমুখর পরিসরে বাংলা ছোটগল্পের সাময়িক অনুবাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কেন না ছোটগল্পের ইতিহাসে তার পরিচয় বারেবারেই ফিরে এসেছে। এখানে বরং আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা লক্ষ্যণীয়। বাংলার সঙ্গে কবিতার যোগ নিবিড়, ছোটগল্পের সংযোগ তত নয় বলে একটা ধারণা অনেক দিন থেকেই সচল ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে বুদ্ধদেব বসুর প্রকট অভিমতেই তা প্রতীয়মান। শেষের জন তো তাঁর ‘ছোটগল্পের কথা’ প্রবন্ধে বলেই দিয়েছেন, ‘বাঙলাদেশ ছোটগল্পের দেশ নয়, ইহা কবিতার দেশ।’ শুধু তাই নয়, কবির সংখ্যাবৃদ্ধিতে বুদ্ধদের বসুর অনুসিদ্ধান্ত, ‘ইহাতেই বুঝা যায় যে, ছোটগল্প জিনিষটি বাংলার মাটিতে ভালো ফলে না।’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়
‘কল্লোল’-এর ১৩৩৪-এর ভাদ্র সংখ্যায়। ফলে সময়ান্তরে ভাবুক বাঙালি কবিপ্রকৃতির মধ্যেও বাংলা ছোটগল্পের সজীবতা বর্তমান, তা তার ফলনের প্রাচুর্যে ও তার গুণমানের উৎকর্ষেই প্রতীয়মান। শুধু তাই নয়, বাংলা সাহিত্যের ধারায় ছোটগল্পের বনেদিয়ানা অগ্রসরমান। সেখানে কবিতার পাশে গল্পের সহাবস্থান অত্যন্ত স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, কবিতার আধারের গল্পবীজও শাখা-প্রশাখা মেলে ধরেছে।

সময়ের সংযোগে তার স্বভাবিক অধিকার ইতিমধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে সময়ের জনকণ্ঠকে ধারণ করে সময়ের দাবিতে তার সক্রিয় উপস্থিতি সময়ান্তরে আরও সরবতা লাভ করে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের প্রেক্ষিত লেখা গল্পগুলিতে তার পরিচয় অত্যন্ত প্রকট। অন্যদিকে আন্দোলনের অভিঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে তার অব্যবহিত পরিসরেই তা সংবেদনশীল কবি-সাহিত্যকদের সক্রিয় করে তোলে। ১৪ মার্চের নৃশংস হত্যালীলার পর প্রতিবাদের অভিব্যক্তি নানাভাবে সংবাদপত্রে জায়গা করে নিয়েছে। আন্দোলনের প্রভাব জনমানসকে কতটা প্রভাবিত করেছিল, তার পরিচয় সাহিত্যের মাধ্যমে প্রতীয়মান। বাস্তবতার নিষ্ঠুরতায় ক্ষতবিক্ষত মনে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন জেগে ওঠে বলেই ইতিহাস বদলে যায়।

তারই আয়োজনে কৃষিমুখী মনেই আজ শিল্পের দাবি সোচ্চার হয়ে ওঠে। কৃষি জমি রক্ষা আন্দোলন থেকে শিল্প বনাম কৃষির দ্বৈরথে জনমানসে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঐতিহাসিক প্রতিবাদী আন্দোলন আজও বিতর্কিত, সমান প্রাসঙ্গিক ও বিপ্লবী কণ্ঠস্বর। যেখানেই জমি দখলের বিরোধিতা উঠে আসে, সেখানেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনে কথা মুখে মুখে ফেরে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষি জমি রক্ষা আন্দোলন চলমান ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। অথচ সেই ইতিহাসই সময়ান্তরে প্রয়োজনের স্বার্থে সময়ের দাবির প্রতি আনত হয়ে শিল্পায়নের পথে ধাবিত হতে চায়। এই চাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, বরং জীবন জীবিকার স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি। সিঙ্গুরের অচাষযোগ্য অফলা জমিতেই শিল্পের চাষ যে জীবিকাকে শুধু সমৃদ্ধ করবে না, জীবনকেও নবজীবন দান করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই স্বপ্নে বিভোর হতে চাওয়া সেদিনের অনিচ্ছুক কৃষক আজ নতুন ভোরের অধীর প্রতীক্ষায় জেগে আছে, সেটাও ভাবা যায়!