শিক্ষাব্যবস্থার আরও উন্নতি প্রয়োজন

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

সূর্যাংশু ভট্টাচার্য

‘বর্ষে বর্ষে দলে দলে
আসে বিদ্যামঠ তলে
চলে যায় তারা কলরবে।’—

‘তারা’ মানে ছাত্রদল। যাদের কবি অন্যত্র ‘মেঘে ঢাকা শিশুশশী’ বলেছেন। তারা আজ নানাভাবে বিভ্রান্ত ও বিপন্ন। সংবাদপত্রের পাতা উল্টালেই বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে কিভাবে বিপর্যস্ত তা সহজেই উপলব্ধ হয়। অথচ আমাদের দেশে পর পর ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ আসছে আর যাচ্ছে তবু শিক্ষার মান উন্নয়নের তেমন কোনও নজীর আমাদের সামনে নেই। অথচ ‘জাতীয় শিক্ষক নীতি’ নিয়ে তেমন কোনও কঠোর সমালোচনা বা তেমন কোন আলোচনাও চোখে পড়ে না। এর পরিণাম ভয়াভয় রূপ নিয়েছে। ফলে দুর্দশায় পড়েছে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা-সে শিক্ষাব্যবস্থা হোক প্রাক্-প্রাথমিক বা প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা হোকগে মাধ্যমিক অথবা উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা অথবা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা।


শিক্ষার একটা হতচ্ছাড়া ভাব নজরে আনে সংবাদ পত্রের পাতা উল্টোলেই। এক সংবাদপত্রের ভেতরের পাতায় বড় করে হেডিং—‘পার্থর পর নিয়োগ দুর্নীতিতে জামিন পেলেন কল্যাণময়ও’। অর্থাৎ রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বছর তিনেক জেল খাটার পরে এবার স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ দুর্নীতি মামলা থেকে জেলে থাকা মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা। তিনি জামিন পান বা না পান, সবার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে এসএসসি-র ২০১৬ সালের প্যানেল বাতিল করে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। তাতে শিক্ষকতার চাকরি হারান প্রায় ২৬ হাজার হবু শিক্ষক। এই দুর্নীতিতে কল্যাণময়ের যোগ রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। সেই সূত্রে ২০২২ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সিবিআই। তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক তছরুপের মামলাও দায়ের করা হয়। উল্লেখ্য যে ইতিপূর্বে কোনও পর্ষদ সভাপতিকে কোন দিনই তছরুপের দায়ে বা দুর্নীতির দায়ে জেলে যেতে হয়নি। ২০১৬ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এইসব তছরুপ ও দুর্নীতির দায়ে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী বা পর্ষদ সভাপতিকে পুলিশের টানা হেঁচড়ার প্রভাব বিদ্যালয়ের পাঠরত ছাত্র-ছাত্রীদের উপরে দারুণ প্রভাব ফেলেছে। বিদ্যালয়ের পঠন-পাঠনের উপরে যেন কালিমা ছিঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাব, সমানভাবে, পরছে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের উপর।
কল্যাণময়ের উপর আরও অভিযোগ রয়েছে। একটি বড় অভিযোগ হচ্ছে যে তিনি তার চাকুরির মেয়াদ শেষ হবার পরেও উর্দ্ধতন কোন পদাধিকারীর অঙ্গুলি নির্দেশে ৬৮ বছর পদে থাকার পরেও পদ আঁকড়ে থাকেন ১৬ মাস, সবেতনে। পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতি কত উচ্চে মাথা তুলেছিল। তা কল্যাণময়ের এই পদে থাকা থেকেই প্রতীয়মান করা যায়।

এই সংবাদ পত্রেরই এক অন্য পাতায় বড় হেডিং ‘দাগি চাকরি প্রার্থীদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশের নির্দেশ’। বিষয়টি ২০১৬ সালের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে। ২০১৬ সালের দুর্নীতিতে ভরা শিক্ষক নিয়োগ তালিকায় দাগিও অযোগ্য প্রার্থীদের নামের তালিকা প্রকাশ করতে হবে বলে জানিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। সেই নামের তালিকা থেকেই স্পষ্ট হবে দাগিদের সম্পূর্ণ তথ্য। ২০২৫ সালেও চেষ্টা চলছে দাগি ও আযোগ্যদের শিক্ষক পদে নিয়োগ করার। এই সন্দেহ সাধারণ মানুষের মধ্যে হতেই পারে।

এই প্রসঙ্গে এসে যাচ্ছে পার্শ্ব শিক্ষকদের কথা। মামলা চলছে পার্শ্ব শিক্ষকদের অতিরিক্ত ১০ নম্বর দেওয়ার বিষয়ে ২০১৬ সালের ঘটনা এবং তা নিয়ে মামলা চলছে ২০২৫ সালেও। এসএসসি-র কাছে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ২০২৫ সালে জানতে চাইছেন এই পার্শ্ব শিক্ষকদের অতিরিক্ত ১০ নম্বর দেওয়ার পক্ষে তাদের কি কি যুক্তি বা বক্তব্য আছে। হাইকোর্টে যখন যুক্তিতর্ক চলছে তখন বিদ্যালয়ের শ্রেণি কক্ষে ছাত্র-ছাত্রীরা বেহাল, কারণ শিক্ষকের অভাব। ২০১৬ সালে চাকুরিপ্রার্থী রাসমণি পাত্রের কথা মনে আছে কি? রাসমণি চাকরি পাওয়ার বিষয়ে কোনও সুরাহা না পেয়ে প্রতিবাদে তার মস্তক মুণ্ডন করেছিলেন। কিন্তু তাতে কোনও ফল ফলেনি। ২০১৬ সালে একাদশ-দ্বাদশের প্রার্থীদের তালিকায় রাসমণি ছিলেন এবং ২০২৫ সালে ফের তিনি এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরীক্ষার পরে ইন্টারভিউয়ের তালিকায় তাঁর স্থান হয়নি। বিস্ময়কর ব্যাপার বৈকি! সংবাদদাতার কাছে রাসমণি বলেছেন, ‘যেদিন গান্ধী মূর্তির পাদদেশে আমাদের ১০০০ দিন পূর্ণ হল, সেদিন এস.এস.সি-র দুর্নীতির প্রতিবাদে আমি মাথা মুড়িয়ে বার্তা দিয়েছিলাম যে, দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে আমার প্রিয় চুল ফেলে দিতেও দ্বিধা করি নাই। আগে ১০০০ দিনের পূর্তিতে মঞ্চে এসেছিলেন শাসক দল ও বিরোধী দলের নেতারা। কিন্তু আজ তাঁরা কেউই আমাদের পাশে নেই।’ পশ্চিমবঙ্গে আজ হতাশার রাজত্ব চলছে। যাদের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা নেই, তারাই কোণঠাসা করে ফেলেছে যোগ্য প্রার্থীদের। ফলে পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। ছাত্র-ছাত্রীদের পঠন পাঠনে চূড়ান্ত ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের প্রাপ্য শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সব রাজনৈতিক দলই বলতে গেলে তেমন সরব নয়। শিক্ষক সমিতিগুলো, বলতে গেলে নির্বাক। একটি বাংলা সংবাদপত্রে, দিনের পর দিন, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির কথা প্রকাশ করা হয়। যদি গত ১০ বছরের বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সংবাদের মধ্যে কোন সংবাদটি মুখ্য এবং প্রধান হিসেবে সংবাদপত্রে স্থান পেয়েছিল বলে জানতে চাওয়া হয়। তবে নির্দ্বিধায় তার উত্তর হবে, ‘পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অরাজকতা’। ২০১৬ সালের কিছু আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গে এই বেহাল অবস্থা। এখনও তার কোনও সুরাহা হয়নি। চলছে শিক্ষা প্রশাসনের চরম অবহেলা শিক্ষা নিয়ে। কোনও বিদ্যালয়ে ছাত্র কম, অথচ শিক্ষক সংখ্যা উপছে পড়ছে। আবার কোথাও বিদ্যালয়ে ছাত্রের খামতি নেই, অথচ শিক্ষক কম, ঘাটতি শিক্ষকের। বিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে শিক্ষক চেয়ে চেয়ে হয়রানি। কিন্তু প্রশাসনের ‘নো নড়ন চড়ন’। ভুগছে ছাত্ররা। এমন একটি বিদ্যালয়ের কথা জানা গেছে, যেখানে বাংলা ভাষার শিক্ষক তিনজন, অথচ ইতিহাস পড়াবার কোনও শিক্ষক নেই, নেই কর্মশিক্ষার শিক্ষক। এই ধরনের বিদ্যালয়ের সংখ্যা হাজারের উপর। আবার এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যাও আনেক যেখানে ছাত্র সংখ্যা পঞ্চাশ, শিক্ষকের সংখ্যা কুড়ি। কি আশ্চর্য!

অন্তত: ২০১৬ সাল থেকে বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোর দুর্দশা কহতব্য নয়। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে যে এই অব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের শূন্যপদ শিক্ষা প্রশাসনের ইদানিং স্বীকৃতি অনুযায়ী ১৩,৪২১। প্রকৃতপক্ষে এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী তা ২০,০০০ এর উপরে। যেখানে প্রত্যেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ন্যূনপক্ষ্যে চারজন শিক্ষক থাকার কথা, সেখানে এক শিক্ষক বিদ্যালয়ের সংখ্যাই কয়েক হাজার। এখন নাকি শিক্ষক নিয়োগ শুরু হবে! একথা অবিশ্বাস্য। যদিও সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক সংবাদ, ‘শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আবেদন গ্রহণ শুরু করল প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ১৩,৪২১টি শূন্য পদ আছে। নিয়ম অনুযায়ী, মোট শূন্যপদের ১০ শতাংশ পার্শ্বশিক্ষকদের জন্য সংরক্ষণও করা হয়েছে’। প্রাথমিক শিক্ষক পদে এর আগে ২০২২ সালে নিয়োগ হয়েছিল। যারা ২০২২ ও ২০২৩ সালে টেট পাশ করেছে তারা ২০২৫ সালে প্রথম চাকরির সুযোগ পাচ্ছে। ২০২২ সালে টেট পাশ করে, শূন্যপদ থাকা সত্ত্বেও, চাকরি পায়নি অনেকেই তাদের বেকার দশা কাটবে তিন বছর পরে ২০২৫-এ। এটা কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুচারুরূপে পরিচালনার নজির? কর্মসংস্থানে পরিস্থিতি আরও খারাপ। শিক্ষক সমিতির মতে যারা ২০১৪ ও ২০১৭ সালে টেট পাশ করেছে অথচ চাকরি পাননি, তাঁরাও ২০২৫ সালে চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবে। পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্বের দশা, রাজ্য সরকারের হাতেই স-চল নয়। পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে। অথচ শূন্যপদ প্রচুর। বহু উপযুক্ত বেকার শিক্ষক সরকারের হাতে থাকা সত্ত্বেও, তাদের শিক্ষকের পদে নিয়োগ করা হচ্ছে না। টেট পরীক্ষায় পাশ করে বসে থাকা এই বেকারদের মর্মবেদনা কহতব্য নয়। শিক্ষক সমিতি সূত্রে জানা যাচ্ছে যে রাজ্য প্রশাসনের এই শিক্ষা হানিকর ও শিক্ষক বিরোধী মনোভাবের বিরুদ্ধে এবারে শিক্ষকরা আন্দোলনে সামিল হবে।

পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের এই জনবিরোধী ও শিক্ষাবিরোধী মনোভাবের অবিলম্বে পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা চাই পশ্চিমবঙ্গের ‘মেঘে ঢাকা শিশুশশী’রা মেঘমুক্ত ও আলোকসিক্ত হোক। প্রয়োজনীয় শিক্ষতে পূর্ণ হোক পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রাথমিক শিক্ষার মান আকাশ স্পর্শ করুক। বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নতমানের হলে, বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী থাকলে ‘বর্ষে বর্ষে দলে দলে’ বিদ্যালয়ে আসবে, শিশুশশীরা শিক্ষা সম্বন্ধে স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ‘Education is the manifastation of the perfection already in man’, সার্থক রূপায়ণ পাবে।