তাইওয়ান, রাশিয়া এবং ভারতের কূটনৈতিক ভারসাম্য

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

উজ্জ্বলকুমার দত্ত

বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে কখনও কখনও হাসিমুখের করমর্দনের আড়ালেই জমতে থাকে গভীর অবিশ্বাসের কালো মেঘ। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ঠিক তেমনই এক দ্বৈত বাস্তবতার ছবি ফুটে উঠেছে। বাইরে থেকে সৌহার্দ্যপূর্ণ, সংযত ও সহযোগিতার ভাষায় ভরপুর হলেও, অন্তর্গত স্তরে সেখানে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়ংকর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, যার নাম তাইওয়ান।

দুই রাষ্ট্রনেতার আলোচনায় উঠে এসেছে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, আমেরিকার কৃষিপণ্য রপ্তানি, এমনকি ফেন্টানাইল সংকটও। কিন্তু এসব আলোচনার মধ্যেও সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও বিস্ফোরক বিষয় ছিল তাইওয়ান প্রশ্ন। চিনের দৃষ্টিতে তাইওয়ান কেবল একটি দ্বীপ নয়; এটি তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ঐক্য এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতীক। সেই কারণেই শি জিনপিং স্পষ্ট ভাষায় ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, চিন-আমেরিকা সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় হলো তাইওয়ান।


চিনের বক্তব্য ছিল কূটনৈতিক, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল অত্যন্ত কঠোর। শি জিনপিং কার্যত সতর্ক করে দিয়েছেন, যদি এই ইস্যু ভুলভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে দুই পরাশক্তির সম্পর্ক শুধু উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা সরাসরি সংঘর্ষের দিকেও গড়াতে পারে। অর্থাৎ, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে এই হুমকির সুরকে আড়াল করার চেষ্টা দেখা গেছে। ওয়াশিংটন বরং জোর দিয়েছে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা, বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং মাদক চোরাচালান রোধের মতো অপেক্ষাকৃত বাস্তববাদী বিষয়ে। এই পার্থক্যই আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রকৃত চরিত্রকে সামনে আনে। প্রত্যেক রাষ্ট্রই আলোচনার টেবিল থেকে সেই বার্তাটিই বিশ্বকে জানাতে চায়, যা তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করে।

বৈঠকের পরিবেশ ছিল উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। রাষ্ট্রনেতাদের জন্য বিশেষ ভোজসভা, কূটনৈতিক হাসি, ক্যামেরার সামনে বন্ধুত্বপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি— সবই ছিল। হয়তো টেবিলে পরিবেশিত হয়েছিল লবস্টার, গরুর সিনার মাংস কিংবা বিখ্যাত বেইজিং হাঁসের রোস্ট। কিন্তু সেই বিলাসী আয়োজনের মধ্যেও তাইওয়ান প্রশ্নটি যেন অদৃশ্য এক আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলতে থেকেছে। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সৌজন্যের হাসি কখনওই স্থায়ী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে মার্কিন কংগ্রেসের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট— দুই দলের সিনেটরদের একটি যৌথ দল ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে তাইওয়ানের জন্য প্রায় চৌদ্দ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা অনুমোদনের আহ্বান জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি সেই পথে এগোয়, তাহলে বেইজিং সেটিকে নিছক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা হিসেবে দেখবে না; বরং চিনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করবে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও ভয়ংকর টানাপোড়েনের দিকে এগোতে পারে।

এই সমগ্র প্রেক্ষাপটের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বহুল আলোচিত রাজনৈতিক ধারণা— ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস তাঁর লেখায় দেখিয়েছিলেন, যখন একটি উদীয়মান শক্তি প্রতিষ্ঠিত শক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন সংঘর্ষের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বর্তমান বিশ্বে চিন সেই উদীয়মান শক্তি, আর যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তি। ফলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্কের মধ্যে এক অদৃশ্য চাপ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে।

কিন্তু এই নাটকের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই নতুন সমীকরণে মস্কোর অবস্থান অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং কিছুটা অস্বস্তিকর। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া নিজেকে পশ্চিমের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর সেই অবস্থান আরও তীব্র হয়েছে। কিন্তু যদি চিন ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে সক্ষম হয়, তাহলে রাশিয়া কূটনৈতিকভাবে অনেকটাই একা হয়ে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে উত্তেজনা কমে গেলে সবচেয়ে বড় কৌশলগত ক্ষতি হবে মস্কোর। কারণ বর্তমানে চিন-রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা অনেকাংশেই পশ্চিমবিরোধী অভিন্ন অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই ক্রেমলিনও দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সম্ভাব্য চিন সফরের ঘোষণা সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। তবে বাস্তবতা হলো, চিন ও রাশিয়ার ঘোষিত ‘সীমাহীন বন্ধুত্ব’-এর মধ্যেও এখন সূক্ষ্ম ফাটলের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই; স্থায়ী থাকে কেবল স্বার্থ। চিন যদি দেখে মার্কিনিদের সঙ্গে সীমিত সমঝোতা তার অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থানের জন্য বেশি লাভজনক, তাহলে বেইজিং নিঃসন্দেহে সেই পথেই হাঁটবে।

এদিকে পুতিনের জন্য সাম্প্রতিক সময়টি ছিল যথেষ্ট হতাশাজনক। নয় মে রাশিয়ার ‘বিজয় দিবস’ সাধারণত দেশটির সামরিক শক্তি প্রদর্শনের এক মহাসমারোহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত বিজয়ের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর মস্কোর লাল চত্বরে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। ট্যাঙ্ক, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান— সবকিছুর মধ্য দিয়ে রাশিয়া বিশ্বকে তার শক্তির বার্তা দেয়। এই সমগ্র পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত আজ এমন এক কূটনৈতিক ভারসাম্যের পথে হাঁটছে, যেখানে তাকে একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চিনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে। একদিকে সীমান্ত সমস্যা এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে চিনের প্রতি ভারতের গভীর সতর্কতা রয়েছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক বাস্তবতা ভারতকে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধের পথেও যেতে দিচ্ছে না।
আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি, ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক কৌশলে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠতা ক্রমেই বাড়ছে। তথাপি ভারত এখনও রাশিয়ার সঙ্গে তার ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনও রুশ প্রযুক্তি ও অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।

ফলে ভারত এমন এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক পথে হাঁটছে, যেখানে তাকে একদিকে আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক অটুট রাখতে হচ্ছে, আবার চিনের সঙ্গেও সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলতে হচ্ছে। এই বহুমাত্রিক ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়।

তাইওয়ান প্রশ্নেও ভারতের অবস্থান অত্যন্ত সতর্ক। ভারত প্রকাশ্যে ‘এক চিন নীতি’ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করলেও, তাইওয়ানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক ধীরে ধীরে বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দিল্লি এখন তাইপের সঙ্গে নতুন সম্ভাবনা খুঁজছে। তবে ভারত খুব ভালো করেই জানে, তাইওয়ান প্রশ্নে অতিরিক্ত স্পষ্ট অবস্থান নিলে বেইজিংয়ের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

দিল্লি চায় না নতুন স্নায়ুযুদ্ধের কোনও শিবিরে নিজেকে বন্দি করতে; বরং সে চায় বহু-মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের এক স্বতন্ত্র শক্তি হয়ে উঠতে।

তাই প্রশ্ন এখন একটাই— বিশ্ব কি নতুন এক স্নায়ুযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, নাকি কূটনীতি শেষ পর্যন্ত সংঘাতকে থামাতে পারবে? উত্তরটি ভবিষ্যতের হাতে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, বেইজিং, ওয়াশিংটন, মস্কো এবং দিল্লির সম্পর্ক আগামী কয়েক দশকের বিশ্বরাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।