ডিলিমিটেশন বিতর্ক

নিজস্ব গ্রাফিক্স চিত্র

দিল্লিতে কেন্দ্রের প্রস্তাবিত নতুন ডিলিমিটেশন বা জনভিত্তিক এলাকার পুনর্বিন্যাস পরিকল্পনা ভারতীয় গণতন্ত্রের এক পুরনো, কিন্তু ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে— প্রতিনিধিত্বের ন্যায়সংগত বণ্টন কীভাবে নির্ধারিত হবে? লোকসভার আসনসংখ্যা ৫৫০ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৮৫০ করা এবং ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে রাজ্যভিত্তিক আসন পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব নিছক প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এর গভীরে রয়েছে ফেডারাল কাঠামো, জনসংখ্যা-নীতি এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের সূক্ষ্ম সমীকরণ।

১৯৭৬ সাল থেকে কার্যত স্থগিত থাকা আসন পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুলে ছিল। সংবিধানের ৮২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক জনগণনার পরই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা, কিন্তু জনসংখ্যার অসম বৃদ্ধির কারণে রাজনৈতিক দলগুলি এ বিষয়ে সতর্ক দূরত্ব বজায় রেখেছে। বর্তমান প্রস্তাব সেই অচলাবস্থাকে ভাঙতে চাইছে— কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কোন মূল্য দিয়ে?

দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি, বিশেষত তামিলনাড়ু ও তেলেঙ্গানা এই প্রস্তাবকে তাদের প্রতি অবিচার হিসেবে দেখছে। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন এবং তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডির আপত্তির মূল সুর এক— যেসব রাজ্য গত কয়েক দশকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তাদেরই কি এখন কম প্রতিনিধিত্বের শাস্তি পেতে হবে? এই যুক্তি নিছক আবেগপ্রসূত নয়, এটি নীতি ও প্রণোদনার প্রশ্ন। যদি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাফল্য রাজনৈতিকভাবে ‘ক্ষতির’ কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণে কী বার্তা দেবে?


কেন্দ্র অবশ্য এই পদক্ষেপকে নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষণ কার্যকর করার জরুরি প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখাতে চাইছে। নিঃসন্দেহে, মহিলাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো সময়ের দাবি এবং এ বিষয়ে বিস্তৃত ঐকমত্যও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ইতিবাচক সংস্কারকে কি একটি বিতর্কিত ও সম্ভাব্য বিভাজনমূলক পদক্ষেপের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া উচিত ছিল? সমালোচকদের মতে, এটি এক ধরনের ‘প্যাকেজিং’, যেখানে জনপ্রিয় একটি সংস্কারের আড়ালে কম জনপ্রিয় একটি সিদ্ধান্তকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে আসন পুনর্বণ্টনের প্রস্তাব বিশেষভাবে বিতর্কিত। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, যখন নতুন জনগণনা আসন্ন, তখন ১৫ বছর পুরনো তথ্যের ওপর এত বড় সাংবিধানিক পরিবর্তন কেন? এই তাড়াহুড়োর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ উত্থাপিত হয়েছে। উত্তর ও পশ্চিম ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলি— যেমন, উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাত— এই পুনর্বণ্টনে উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হতে পারে, এমন আশঙ্কা দক্ষিণের রাজ্যগুলির মধ্যে প্রবল।

এই বিতর্ক কেবল আঞ্চলিক স্বার্থের সংঘাত নয়; এটি ভারতের ফেডারাল কাঠামোর মৌলিক প্রশ্নকে স্পর্শ করছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য যদি জনসংখ্যার একমাত্র মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়, তবে উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের মতো সূচকগুলির মূল্য কোথায়? আবার, জনসংখ্যাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করাও গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ডিএমকে-র তরফে ১৯৫০-৬০-এর দশকের হিন্দি-বিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি উসকে দিয়ে গণআন্দোলনের হুঁশিয়ারি এই ইস্যুর রাজনৈতিক তাপমাত্রা কতটা বেড়েছে, তারই ইঙ্গিত। অন্যদিকে, কংগ্রেস ও বাম দলগুলিও এই প্রস্তাবকে ‘অসংবিধানিক’ ও ‘ফেডারাল কাঠামোর পরিপন্থী’ বলে আক্রমণ শানাচ্ছে। ফলে আসন্ন বিশেষ অধিবেশনে তীব্র সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে স্বচ্ছতা, পরামর্শ এবং সর্বসম্মতির প্রক্রিয়া। এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকেই বদলে দিতে পারে, তা তাড়াহুড়ো করে বা পর্যাপ্ত আলোচনার অভাবে নেওয়া হলে তার ফল সুদূরপ্রসারী ও বিপজ্জনক হতে পারে। কেন্দ্রের উচিত ছিল সমস্ত রাজ্য, রাজনৈতিক দল এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিস্তৃত সংলাপের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য পথ খুঁজে বের করা। ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি তার বৈচিত্র্য ও ভারসাম্যে। সেই ভারসাম্য নষ্ট হলে কেবল রাজনৈতিক সংঘাতই বাড়বে না, ফেডারাল কাঠামোর ওপর আস্থাও ক্ষুণ্ণ হবে। ডিলিমিটেশন প্রয়োজন— কিন্তু তা হতে হবে ন্যায়সঙ্গত, স্বচ্ছ এবং সর্বসম্মত। অন্যথায়, এই সংস্কারই হয়ে উঠতে পারে নতুন বিভাজনের সূচনা।