দিল্লিতে মণিপুরের গিটারবাদক চোংথাম বিক্রম সিংহের মৃত্যু যেন আর পাঁচটি অপরাধের খবর হয়ে কয়েক দিনের মধ্যে সংবাদপত্রের পাতা থেকে হারিয়ে না যায়। এই ঘটনা আমাদের সামনে আরও বড় এবং অস্বস্তিকর একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— ভারতের রাজধানীকে কে কতটা নিজের ঘর বলে মনে করতে পারেন?
৫৪ বছরের বিক্রম সিংহ ছিলেন একজন সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক। মণিপুরের সংগীতজগৎ থেকে তাঁর পথ তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল কলকাতায়, পরে দিল্লিতে। জীবনের বহু বছর তিনি এই শহরে কাটিয়েছেন। সংগীতের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সেতু তৈরি করাই ছিল তাঁর কাজ। অথচ শেষ পর্যন্ত একটি সামান্য বিবাদে তাঁকে প্রাণ হারাতে হল।
পুলিশ ও পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বাড়ির বাইরে কয়েকজন যুবক উচ্চস্বরে কথা বলছিলেন এবং মদ্যপান করছিলেন। বিক্রম সিংহ তার প্রতিবাদ করেছিলেন। এরপরই তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনায় সাতজন এবং এক নাবালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। সেই তদন্ত নিরপেক্ষ ও দ্রুত হওয়া জরুরি।
এখনও পর্যন্ত পুলিশ এমন কোনও প্রমাণের কথা জানায়নি, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এই হত্যার পিছনে জাতিগত বিদ্বেষ কাজ করেছিল। তাই প্রমাণ ছাড়া ঘটনাটিকে ‘বর্ণবিদ্বেষের অপরাধ’ বলে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। কিন্তু একই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং উদ্বেগকেও উপেক্ষা করা যায় না।
দিল্লি-সহ দেশের বড় শহরগুলিতে উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু মানুষ কাজ করেন, পড়াশোনা করেন, ব্যবসা করেন, পরিবার গড়ে তোলেন। তবু তাঁদের অনেককে চেহারা, উচ্চারণ বা পরিচয়ের কারণে কটূক্তি, বিদ্রূপ, বৈষম্য এমনকি হেনস্তার মুখোমুখি হতে হয়। ভারতের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে আমরা সহজেই স্বীকার করি, কিন্তু সামাজিক বৈচিত্র্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার শিক্ষা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
তবে প্রতিটি অপরাধকে জাতিগত বিদ্বেষের ফল বলে ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। অপরাধের তদন্তে আবেগ নয়, প্রমাণই শেষ কথা। কিন্তু জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ উঠলে তার যথাযথ নথিভুক্তি ও তদন্তও নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, বাড়ির মালিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও সমাজে প্রচলিত নানা ভুল ও বদ্ধমূল ধারণার বিরুদ্ধে সচেতন ভূমিকা নিতে হবে।
বিক্রম সিংহের স্ত্রী বলেছেন, তাঁদের পরিবার প্রতিশোধ নয়, বিচার চায়। এই কথাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দোষ প্রমাণিত হলে অপরাধীদের আইন অনুযায়ী শাস্তি পেতেই হবে। কিন্তু বিচার শুধু কয়েকজন অপরাধীর শাস্তিতে শেষ হওয়া উচিত নয়। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে সামাজিক প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তারও উত্তর খুঁজতে হবে।
বিক্রম সিংহ সারা জীবন গিটারের তারে নানা সুর মিলিয়েছেন, গান গেয়েছেন, গান শিক্ষা দিয়েছেন। অথচ তাঁর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দিল— ভারতের নানা সুরের মধ্যে এখনও কত অমিল রয়ে গেছে। ভারতের রাজধানী তখনই সত্যিকার অর্থে সবার হবে, যখন মণিপুর থেকে আসা একজন মানুষও দিল্লিকে নিজের শহর বলে অনুভব করতে পারবেন— কোনও ভয়, অপমান বা ‘বহিরাগত’ হওয়ার অনুভূতি ছাড়াই।