বাতাসেরও যে একটি নিজস্ব মানচিত্র থাকে, লাদাখের চাংথাং মালভূমিতে পা না রাখলে তা বোঝা দুষ্কর। এখানে বাতাস কেবল বয়ে যায় না, বরং তীক্ষ্ণ শিসের মতো পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ধাক্কা খেয়ে এক আদিম সংলাপ তৈরি করে। এই অনন্ত শূন্যতা আর মহাজাগতিক নিস্তব্ধতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন থিনলে নুরবু। তাঁকে কেবল একজন পশুপালক বা যাযাবর বলাটা নিতান্তই খাটো করে দেখা হবে; তিনি আসলে এক লুপ্তপ্রায় সভ্যতার শেষ প্রহরী, যিনি তাঁর লোমশ চমরী গাই বা ইয়াকেদের নিয়ে এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত।
এই যুদ্ধ কোনো রাজায়-রাজায় যুদ্ধ নয়, এ যুদ্ধ সময়ের সঙ্গে অস্তিত্বের, আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের এবং কৃত্রিম সীমানার সঙ্গে মুক্ত চারণভূমির। থিনলে নুরবুর জীবন আলেখ্য আসলে কোনো একক মানুষের জীবনী নয়, বরং হিমালয়ের কোলে দ্রুত বদলে যাওয়া ভূ-রাজনীতি, পরিবেশ এবং অর্থনীতির এক জীবন্ত দলিল, যা আমরা এই প্রবন্ধে এক দীর্ঘ যাত্রাপথের মতো অতিক্রম করব।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই শীতল মরুভূমিতে বেঁচে থাকাটাই যেখানে প্রতি মুহূর্তের বিস্ময়, সেখানে থিনলে নুরবুর দিনলিপি শুরু হয় এক অদ্ভুত সংগ্রাম দিয়ে। তাঁর বাসস্থান কোনো ইট-পাথরের খাঁচা নয়, বরং ইয়াকের পশম দিয়ে বোনা কালচে রঙের এক তাঁবু, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘রিবো’ বলা হয়। এই রিবো কেবল একটি আচ্ছাদন নয়, এটি চাংপা যাযাবরদের স্থাপত্যকলা ও জীবনদর্শনের এক অনন্য নিদর্শন।
আধুনিক নাইলনের তাঁবু হয়তো অনেক হালকা, বহনযোগ্য এবং সস্তা, কিন্তু থিনলে জানেন, মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ওই কৃত্রিম তন্তু প্রাণের উষ্ণতা ধরে রাখতে পারে না। ইয়াকের পশম দিয়ে বোনা রিবোর বুননকৌশল এমন যে, দিনের বেলা সূর্যের আলোতে এর ছিদ্রগুলো প্রসারিত হয়ে বাতাস চলাচল করতে দেয়, আর তুষারপাতের সময় সেই তন্তু ফুলে উঠে ছিদ্র বন্ধ করে দেয়, যাতে ভেতরে জল বা বরফ ঢুকতে না পারে। থিনলে নুরবু যখন তাঁর তাঁবুর খুঁটি গাড়েন, তখন তিনি আসলে মাটির সঙ্গে তাঁর নাড়ির সংযোগ স্থাপন করেন।
কিন্তু তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম আজ লেহ্ শহরের পাকা বাড়ি আর স্মার্টফোনের নীল আলোর দিকে ঝুঁকছে। তারা রিবোকে দেখছে অতীতের বোঝা হিসেবে, আর থিনলে দেখছেন একে মায়ের জরায়ুর মতো এক নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে। এই দুই প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গির ফাটলটি যেন হিমালয়ের হিমবাহের ফাটলের মতোই গভীর ও অনিবার্য।
তবে থিনলে নুরবুর এই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংকটের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে অর্থনীতির এক নির্মম পালাবদল। বিশ্ববাজারে এখন ‘নরম সোনা’ বা পশমিনার কদর আকাশচুম্বী।
লাদাখের অর্থনীতিতে ইয়াক পালন থেকে সরে এসে পশমিনা ছাগল পালনের যে হুজুগ শুরু হয়েছে, তা আসলে পরিবেশগত আত্মহত্যার নামান্তর। থিনলে নুরবু তাঁর অভিজ্ঞ লেন্স দিয়ে দেখেন, পশমিনা ছাগল ঘাস খাওয়ার সময় শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলে, তাদের খুুরের আঘাতে মাটি আলগা হয়ে যায়, যার ফলে চারণভূমিগুলো দ্রুত মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে, ইয়াক বা চমরী গাই ঘাসের ডগা খায়, শেকড় অক্ষত রাখে, এবং বরফের নিচে চাপা পড়া ঘাসও তারা খুঁজে নিতে পারে।
ইয়াক পালনের এই সংস্কৃতি কেবল জীবিকা নয়, এটি ছিল প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর মৈত্রী। কিন্তু বাজারের নিষ্ঠুর নিয়মে ইয়াকের রুক্ষ পশমের চেয়ে পশমিনা ছাগলের মিহি লোমের দাম অনেক বেশি। থিনলে নুরবু তাই এক অদ্ভুত দোলাচলের মধ্যে আছেন—তিনি কি তাঁর পূর্বপুরুষের সঙ্গী ইয়াককে আঁকড়ে ধরে থাকবেন, নাকি বাজারের চাহিদার কাছে নতি স্বীকার করে পরিবেশবিধ্বংসী পশমিনা ছাগলের পাল বাড়াবেন? এই প্রশ্নটি কেবল অর্থনীতির নয়, এটি নৈতিকতারও। আধুনিক ভোগবাদী সমাজ যখন লাদাখের পশমিনায় নিজেকে মুড়ে উষ্ণতা খোঁজে, তখন তারা জানে না যে এই উষ্ণতার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে চাংথাং-এর সবুজ চারণভূমি আর থিনলে নুরবুর দীর্ঘশ্বাস।
এরই মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে নেমে এসেছে ভূ-রাজনীতির কালো ছায়া। গালওয়ান উপত্যকার সংঘাত এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এলএসি বরাবর সামরিক উত্তজনা থিনলে নুরবুর চারণভূমিকে সংকুচিত করে এনেছে। একসময় যে পাহাড়গুলো ছিল অবাধ বিচরণের ক্ষেত্র, আজ সেখানে কাঁটাতারের বেড়া আর ‘বাফার জোন’-এর অদৃশ্য দেওয়াল। রাষ্ট্র তার সীমানা রক্ষা করতে গিয়ে যাযাবরদের হাজার বছরের পুরনো যাতায়াতের পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। থিনলে নুরবু জানেন না বেইজিং বা দিল্লির ড্রয়িংরুমে বসে কারা এই মানচিত্র আঁকেন, কিন্তু তিনি দেখেন তাঁর ইয়াকের পাল ক্ষুধার্ত।
চুষুল কিংবা ডেমচোকের যে চারণভূমিগুলোতে শীতকালে পশুরা ঘাস পেত, আজ সেখানে হয়তো লাল ফৌজ কিংবা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভারী বুটের আওয়াজ। সামরিক ট্রাক আর ভারী যানবাহনের ধুলোয় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ঘাস, শব্দদূষণে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে বন্যপ্রাণ। থিনলে নুরবুর কাছে দেশপ্রেমের সংজ্ঞাটা একটু আলাদা; তাঁর কাছে নিজের পশুদের পেট ভরানো আর পাহাড়ের পবিত্রতা রক্ষা করাই হলো প্রকৃত দেশপ্রেম। কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তার যুপকাষ্ঠে আজ সেই সব চারণভূমি বলি প্রদত্ত। যে রাস্তা বা সড়ক তৈরি হচ্ছে সামরিক প্রয়োজনে, তা হয়তো দেশের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য, কিন্তু তা থিনলে নুরবুর মতো যাযাবরদের জীবনরেখাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছে।
প্রকৃতিও যেন আজ আর থিনলে নুরবুর বন্ধু নেই। হিমালয়কে বলা হয় পৃথিবীর ‘তৃতীয় মেরু’। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই তৃতীয় মেরুর বরফ গলছে দ্রুতগতিতে। ঋতুচক্রের সেই পরিচিত ছন্দ আর নেই। শীতকালে যখন তুষারের প্রয়োজন, তখন আকাশ খটখটে শুকনো, আর যখন বসন্তে ঘাস গজানোর সময়, তখন অসময়ে নামছে তুষারঝড়— যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘শ্বেত দুর্যোগ’। এই অসময়ের তুষারে চাপা পড়ে মারা যাচ্ছে হাজার হাজার গবাদি পশু। থিনলে নুরবু আকাশের দিকে তাকিয়ে এখন আর মেঘের ভাষা পড়তে পারেন না। তাঁর মনে হয়, পাহাড় ও আকাশ যেন তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
সোনম ওয়াংচুকের মতো মানুষেরা কৃত্রিম হিমবাহ বা ‘আইস স্তূপ’ তৈরি করে জলের সংকট মেটানোর চেষ্টা করছেন ঠিকই, কিন্তু যাযাবর জীবনে স্থিরতার সুযোগ কোথায়? থিনলে নুরবুকে জলের সন্ধানে, ঘাসের সন্ধানে নিরন্তর ছুটে চলতে হয়। তাঁর এই ছুটে চলা আসলে এক পলায়মান সত্তার গল্প, যে জানে না গন্তব্য কোথায়।
এই আলেখ্যের শেষে এসে আমরা দেখি, থিনলে নুরবু কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি এক বিপন্ন সময়ের রূপক। তাঁর চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে লেখা আছে রোদে পোড়া অভিজ্ঞতার ইতিহাস, আর তাঁর চোখের গভীরতায় আছে আসন্ন বিলুপ্তির আশঙ্কা।
তাঁর ছেলেমেয়েরা হয়তো আর কোনোদিন এই রিবো তাঁবুতে ফিরবে না, তারা হয়তো লেহ্ শহরের কোনো সস্তা হোটেলে পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করবে, কিংবা ইন্টারনেটে ‘হ্যাশট্যাগ নোম্যাড’ দিয়ে ছবি পোস্ট করবে। কিন্তু থিনলে নুরবু জানেন, যেদিন শেষ ইয়াকটি এই মালভূমি থেকে হারিয়ে যাবে, যেদিন শেষ রিবোটি গুটিয়ে নেওয়া হবে, সেদিন কেবল একটি পেশার মৃত্যু হবে না, মৃত্যু হবে মানুষ ও প্রকৃতির এক দীর্ঘ বোঝাপড়ার। সো মোরিরি হ্রদের নীল জলের পাশে দাঁড়িয়ে যখন তিনি তাঁর পশুদের ডাকেন, সেই ডাক প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে শূন্য পাহাড় থেকে।
সেই প্রতিধ্বনিতে মিশে থাকে এক হাহাকার— সভ্যতার অগ্রগতির চাকায় পিষ্ট হওয়া এক জনজাতির শেষ আর্তনাদ। চাংথাং মালভূমির রুক্ষ পাথরে কান পাতলে হয়তো আজও শোনা যায় থিনলে নুরবুর সেই অস্ফুট প্রার্থনা, যা কোনো মানচিত্রে জায়গা পায়নি, কোনো সরকারি ফাইলে ওঠেনি, কিন্তু যা এই পৃথিবীর অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।
(ঋণস্বীকার: এই লেখাটি Sajad Hameed ও Rehan Qayoom Mir-র “The Last Yak Herder Of Ladakh” এর তথ্য-ভাবনা ও বর্ণনাভিত্তিকে ভিত্তি করে রচিত একটি স্বতন্ত্র রূপান্তরধর্মী ফিচার।)