নতুন বছরের শুরু মানেই শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো নয়— এ এক সামাজিক ও রাজনৈতিক আত্মসমীক্ষার মুহূর্ত। গত বছর ভারতের যে বহুমাত্রিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে কেটেছে, তা দেশের মানুষের মনে একদিকে উদ্বেগ, অন্যদিকে প্রত্যাশার জটিল মিশ্র অনুভূতি তৈরি করেছে। অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি, গণতান্ত্রিক পরিসর ও আন্তর্জাতিক অবস্থান— প্রতিটি ক্ষেত্রেই ২০২৫ সাল ছিল প্রশ্নে ভরা। সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার আশাতেই মানুষ তাকিয়ে আছে নতুন বছরের দিকে।
গত বছরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল দেশের রাজনৈতিক আবহ। লোকসভা নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা দেখিয়েছে যে ভারতের গণতন্ত্র এখনও সক্রিয়, কিন্তু একই সঙ্গে ভঙ্গুর। ভোটের ফলাফল স্পষ্ট করেছে— মানুষ একদিকে স্থিতিশীল সরকার চায়, অন্যদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিরোধী কণ্ঠের পরিসর সংকুচিত হওয়া, সংসদীয় বিতর্কের মান নিয়ে প্রশ্ন এবং তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা— এসবই সাধারণ নাগরিকের মনে সন্দেহ ও আশঙ্কা তৈরি করেছে। নতুন বছরে মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও সংসদ ও রাজনীতিতে সৌজন্য, সহনশীলতা এবং সংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা ফিরে আসুক।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গত বছর ছিল দ্বৈত বাস্তবতার। একদিকে জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক, বিদেশি বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের ঘোষণা হয়েছে একের পর এক। অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং আয়ের বৈষম্য সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ দরিদ্র শ্রেণি— উভয়েই অনুভব করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামের বোঝা। নতুন বছরে মানুষের প্রধান প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সুফল যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বাস্তব জীবনে কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে তার প্রতিফলন ঘটুক।
সামাজিক ক্ষেত্রে গত বছর বারবার সামনে এসেছে বিভাজনের রাজনীতি। ধর্ম, ভাষা ও পরিচয়ের প্রশ্নে উত্তেজনা বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দৈনন্দিন সহাবস্থানে। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ব— এই বিষয়গুলি ঘিরে উদ্বেগ গভীর হয়েছে। তবু এর বিপরীতে দেখা গিয়েছে নাগরিক সমাজের প্রতিরোধ, ছাত্র-যুবদের সক্রিয়তা এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সম্প্রীতির ডাক। নতুন বছরে মানুষের প্রত্যাশা– রাষ্ট্র যেন বিভাজনের নয়, সংহতির ভাষায় কথা বলে, আইন ও প্রশাসন যেন নিরপেক্ষ থেকে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য— এই দুই মৌলিক ক্ষেত্রেও গত বছর নানা সংকেত দিয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ডিজিটাল বিভাজন প্রকট হয়েছে। সরকারি বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ এবং গবেষণার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কোভিড-পরবর্তী সময়ে পরিকাঠামো উন্নয়নের কথা বলা হলেও গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও দুর্বল। নতুন বছরে মানুষের প্রত্যাশা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণের কেন্দ্রে রাখা হোক, বেসরকারিকরণের চাপের বাইরে এনে মান ও প্রবেশাধিকারের ভারসাম্য রক্ষা করা হোক।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে গত বছর ভারত নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। জি-২০-র নেতৃত্ব, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বৈশ্বিক সংঘাতের প্রেক্ষিতে কৌশলগত অবস্থান— সব মিলিয়ে ভারতের ভূমিকা নজরে পড়েছে।
তবে মানুষের প্রত্যাশা, এই আন্তর্জাতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হোক। শক্তিশালী বিদেশনীতি তখনই অর্থবহ, যখন তার সুফল দেশের সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হয়।
সব মিলিয়ে নতুন বছর ভারতের মানুষের কাছে এক প্রশ্নচিহ্ন ও এক সম্ভাবনার নাম। গত বছরের অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে— উন্নয়ন ও গণতন্ত্র, শক্তি ও সহনশীলতা, রাষ্ট্র ও নাগরিক— এই সবের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়, কিন্তু অপরিহার্য। মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়: নিরাপদ জীবন, সম্মানজনক কাজ, ন্যায্য রাষ্ট্র এবং কথা বলার স্বাধীনতা। নতুন বছর যদি এই মৌলিক প্রত্যাশাগুলোর দিকে এক কদমও এগোতে পারে, তাহলেই তা হবে প্রকৃত অর্থে শুভ নববর্ষ।