চিকিৎসার খরচ ক্রমশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। রোগ নির্ণয়, চিকিৎসকের ফি, হাসপাতালের খরচের পাশাপাশি ওষুধ, চিকিৎসার সরঞ্জাম ও নানা ধরনের ব্যবহার্য সামগ্রীর দামও অনেক পরিবারের কাছে বড় বোঝা হয়ে উঠেছে। অথচ অসুস্থ মানুষের কাছে ওষুধ কোনও বিলাসদ্রব্য নয়, বরং সুস্থ হয়ে ওঠার অপরিহার্য উপকরণ। তাই ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সেই দামের হিসাব সাধারণ মানুষের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরা এখন অত্যন্ত জরুরি।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট ওষুধ ও চিকিৎসার সামগ্রীর ক্রয়মূল্য এবং রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া দামের মধ্যে বিপুল ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে আদালত জানতে চেয়েছে, কেন সব ওষুধ, চিকিৎসার যন্ত্রপাতি ও ব্যবহার্য সামগ্রীর দাম নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা সম্ভব নয়। সাধারণ একটি অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রেও ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ফারাক থাকলে সেই প্রশ্ন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ক্যান্সারের কয়েকটি ওষুধের দাম বেঁধে দেওয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হয়। কিন্তু কয়েকটি ওষুধের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
২০১৮ সালে সংসদে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছিল, এক বছরে ওষুধের খরচের কারণে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিলেন। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, চিকিৎসার ব্যয় শুধু স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা নয়, এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন। পরিবারের একজন সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলে অনেক সময় সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়, ধার করতে হয়, এমনকি সম্পত্তিও বিক্রি করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে ওষুধের দামের অস্বচ্ছতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
কর্ণাটকের মূল্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সম্প্রতি হাসপাতালগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে, ওষুধ, চিকিৎসার সরঞ্জাম ও ব্যবহার্য সামগ্রীর বিলের মধ্যে ক্রয়মূল্য এবং সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা এমআরপি— দুটিই উল্লেখ করতে হবে। এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনও হাসপাতাল কত দামে একটি ওষুধ কিনছে এবং রোগীকে কত দামে দিচ্ছে, তা জানা গেলে অস্বাভাবিক মুনাফার সুযোগ অনেকটাই কমবে। তবে শুধু হাসপাতালের বিক্রয়মূল্যে লাভের সীমা বেঁধে দিলেই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়।
এর কারণ, ওষুধ উৎপাদনকারী সংস্থা থেকে পরিবেশক, পাইকারি বিক্রেতা এবং হাসপাতাল— প্রতিটি স্তরেই দাম বাড়তে পারে। কোনও ওষুধের গায়ে বেশি এমআরপি লেখা থাকলেও হাসপাতাল সেটি অনেক কম দামে কিনতে পারে। ফলে রোগীর কাছ থেকে নেওয়া অর্থের সঙ্গে প্রকৃত খরচের ব্যবধান অনেক বেড়ে যায়। আবার সরবরাহের প্রথম দিকেই যদি অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ানো হয়, তাহলে শেষ পর্যায়ে মুনাফার সীমা নির্ধারণ করে রোগীকে পুরোপুরি সুরক্ষা দেওয়া যাবে না।
এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন ওষুধের সম্পূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা। উৎপাদনকারী সংস্থা থেকে শুরু করে শেষ বিক্রেতা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য, কর এবং মুনাফার হিসাব নথিভুক্ত করতে হবে। আমদানি করা ওষুধের ক্ষেত্রেও প্রকৃত আমদানি খরচের তথ্য যাচাই করা দরকার। এই তথ্যের ভিত্তিতে একটি সর্বভারতীয় অভিন্ন ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে, যাতে সরকার সহজেই বুঝতে পারে কোথায় অস্বাভাবিক মুনাফা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ওষুধমূল্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনপিপিএ-কে এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজ্যগুলির নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ক্ষমতাও বাড়ানো জরুরি। উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের দাম এবং করের কাঠামোর মধ্যে অসংগতি থাকলে তারও যুক্তিসংগত সমাধান করতে হবে, যাতে দাম নিয়ন্ত্রণের নামে ওষুধের উৎপাদন বা সরবরাহ ব্যাহত না হয়।
ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের অর্থ উৎপাদক বা বিক্রেতার ন্যায্য আয় বন্ধ করা নয়। উদ্দেশ্য হল, অস্বাভাবিক মুনাফা রোধ করে রোগীকে যুক্তিসংগত দামে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া। সুপ্রিম কোর্টের উদ্বেগ এবং কর্ণাটকের উদ্যোগ সেই লক্ষ্য পূরণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।