প্রযুক্তির ঠান্ডা যুদ্ধ

ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ‘প্যাক্স সিলিকা’-তে। নামের অর্থ ‘সিলিকনের শান্তি’, অর্থাৎ প্রযুক্তি ও কম্পিউটিংকে ঘিরে এক স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই শান্তি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং আমরা বাস করছি এক নতুন ধরনের ঠান্ডা যুদ্ধে— প্রযুক্তির ঠান্ডা যুদ্ধে। এই যুদ্ধে অস্ত্র হলো সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), দুর্লভ খনিজ এবং সাপ্লাই চেইনের নিয়ন্ত্রণ।

গত বছর দু’বার বিশ্ব এই সংঘাতের অভিঘাত টের পেয়েছে। এপ্রিল ও অক্টোবরে চিন হঠাৎ বিরল মাটির খনিজ ও সেই খনিজ থেকে তৈরি চুম্বকের রপ্তানি কমিয়ে দেয়। ফলে নানা দেশের শিল্পক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি হয়। কারণ, বিশ্বে প্রায় ৯০ শতাংশ ‘রেয়ার আর্থ’ উৎপাদন চিনের হাতে। অর্থাৎ সরবরাহ বন্ধ বা সীমিত করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে এবং তা তারা প্রয়োজনে ব্যবহারও করছে। এই বাস্তবতা থেকেই ‘প্যাক্স সিলিকা’-র ধারণা।

‘প্যাক্স সিলিকা’ মূলত একটি কৌশলগত জোট, যার নেতৃত্বে রয়েছে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র। উদ্দেশ্য— প্রযুক্তিগত নেতৃত্বকে সুরক্ষিত রাখা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিরাপদ করা। এটি প্রচলিত অর্থে শুল্ক-নির্ভর বাণিজ্য চুক্তি নয়। সম্প্রতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে আপত্তি তোলায় স্পষ্ট হয়েছে, কেবল শুল্ক বাড়িয়ে প্রযুক্তি-প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া যায় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, খনিজের উৎস নিয়ন্ত্রণ, চিপ তৈরির ক্ষমতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ।


এই কারণেই প্রথমে জোটে নেওয়া হয়েছিল কয়েকটি কৌশলগত দেশকে, যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়াকে। এরা সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজে শক্তিশালী। পাশাপাশি রয়েছে নেদারল্যান্ডস, উন্নত চিপ তৈরির যন্ত্রে যাদের প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। অর্থাৎ এই জোট প্রযুক্তির মূল উপাদানগুলিকে একত্রে জড়ো করার চেষ্টা করছে।

এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো ভারত। প্রশ্ন উঠতে পারে, ভারতের ভূমিকা কী? ভারতের কাছে রয়েছে বিপুল সংখ্যক তরুণ ও দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল পরিকাঠামো। মার্কিন কূটনীতিকরা ভারতের ‘ডিপ ট্যালেন্ট’ ও ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ডেপথ’-এর কথা উল্লেখ করেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ই এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। ভবিষ্যতের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সব ক্ষেত্রেই এআই বদলে দিতে পারে খেলার নিয়ম। তাই এআইয়ে নেতৃত্ব কায়েম করাই এখন মূল লক্ষ্য।

ভারত ঐতিহ্যগতভাবে ‘নিরপেক্ষ’ নীতি অনুসরণ করে এসেছে। বড় শক্তিগুলির দ্বন্দ্বে সরাসরি পক্ষ নেয়নি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল নিরপেক্ষ থাকা যথেষ্ট নয়। কারণ প্রযুক্তি খাতে বড় বিনিয়োগ পেতে হলে একটি নির্ভরযোগ্য ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এআই শীর্ষ সম্মেলনে বহু-বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার, সাবমেরিন কেবল ও চিপ কারখানার প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এগুলি বাস্তবায়িত করতে আন্তর্জাতিক আস্থা প্রয়োজন। ‘প্যাক্স সিলিকা’-য় যোগ দেওয়া সেই আস্থার পথ খুলে দেবে।

এছাড়া বিশ্বজুড়ে এখন একটি নতুন কৌশল জনপ্রিয়— ‘চায়না প্লাস ওয়ান’। অর্থাৎ, চিনের বাইরে আরেকটি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় হয় এবং কোনও এক দেশের উপর নির্ভরতা কমে। ভারত যদি এই কৌশলের অংশ হয়, তবে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলি এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়বে, এবং ভারত আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনে বড় ভূমিকা নিতে পারবে।
অবশ্যই এই জোট চিনের আধিপত্য রাতারাতি ভাঙতে পারবে না। রেয়ার আর্থ বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজে চিনের এগিয়ে থাকা দীর্ঘদিনের বিনিয়োগের ফল।

কিন্তু যদি বিশ্বে ২০-৩০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা অন্যত্র তৈরি হয়, তাহলে একচেটিয়া চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা কমে যাবে। তখন সরবরাহ বন্ধ করে ‘শাস্তি’ দেওয়ার কৌশল কার্যকর হবে না। এই ভারসাম্যই দীর্ঘমেয়াদে শান্তি আনতে পারে, যাকে বলা হচ্ছে ‘প্যাক্স সিলিকা’।তবে ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। শুধু জোটে নাম লেখালেই হবে না। দ্রুত পরিকাঠামো উন্নয়ন, নীতি-স্বচ্ছতা, খনিজ অনুসন্ধান ও প্রক্রিয়াকরণে বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে জোর দিতে হবে। একইসঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থানীয় স্বার্থের ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে, প্রযুক্তির এই ঠান্ডা যুদ্ধে ভারত এক নতুন অবস্থান নিয়েছে। এটি কেবল কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কৌশল। যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে ‘প্যাক্স সিলিকা’ ভারতের জন্য হতে পারে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এক বড় সুযোগ। আর বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতার মধ্যেও প্রযুক্তিগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পথে এক বাস্তব, প্রয়োজনীয় এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে এই উদ্যোগ ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকতে পারে।