বিভূতিভূষণ গোস্বামী
১৯৬১ সালের ১৯ মে— আসামের বরাক উপত্যকার স্মৃতিতে এক অগ্নিগর্ভ দিন। শিলচর রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে সেদিন যে রক্ত ঝরেছিল, তা কেবল একটি ঘটনার পরিণতি ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং ভাষিক অধিকারের দাবির বিস্ফোরণ। কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পাল, কানাইলাল নিয়োগী— এই নামগুলি শুধু শহিদের তালিকা নয়, বরং এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধের প্রতীক।
এই আন্দোলনের পটভূমি বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে স্বাধীনতার পরবর্তী আসামে। ১৯৪৭-এর পর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সময় আসাম রাজ্যে ভাষার প্রশ্নটি ক্রমশ স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অসমিয়া ভাষাভাষীদের একটি বড় অংশ চেয়েছিলেন অসমিয়া ভাষাকেই একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁদের যুক্তি ছিল, এটি রাজ্যের স্বকীয়তা রক্ষার জন্য জরুরি।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বরাক উপত্যকা— যার মধ্যে শিলচর, করিমগঞ্জ (বর্তমান শ্রীভূমি) ও হাইলাকান্দি অন্তর্ভুক্ত— ঐতিহাসিকভাবে বাংলা ভাষাভাষী অধ্যুষিত অঞ্চল। ব্রিটিশ আমল থেকেই প্রশাসন, শিক্ষা এবং সামাজিক জীবনে বাংলা ভাষার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত অবস্থান ছিল। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি ছিল তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
সমস্যার সূত্রপাত ঘটে ১৯৬০ সালে, যখন তৎকালীন আসাম সরকার ‘অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা’ করার উদ্যোগ নেয়। ১০ অক্টোবর, ১৯৬০-এ আসাম বিধানসভায় ‘আসাম অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট’ পাস হয়, যেখানে অসমিয়াকে রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্ত বরাক উপত্যকার মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। কারণ এর অর্থ ছিল প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা ভাষার অবস্থান ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়বে।
এই আশঙ্কা থেকেই শুরু হয় প্রতিবাদ। গড়ে ওঠে ‘ভাষা সংগ্রাম সমিতি’, যা আন্দোলনকে সংগঠিত করে। দাবি ছিল একটাই— বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে হবে। আন্দোলন শুরুতে ছিল শান্তিপূর্ণ—মিছিল, সভা, স্মারকলিপি প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে দাবি জানানো হচ্ছিল।
কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সেই দাবির প্রতি কোনও ইতিবাচক সাড়া না মেলায় আন্দোলন ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৬১ সালের মে মাসে, যখন ১৯ মে তারিখে শিলচর রেল স্টেশনে ‘রেল অবরোধ’ কর্মসূচি পালন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং আন্দোলনের গুরুত্ব বোঝানো।
সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ আজও শিহরন জাগায়। শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের উপর হঠাৎই পুলিশ গুলি চালায়। কোনও পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই চালানো সেই গুলিতে প্রাণ হারান ১১ জন নিরীহ মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তরুণী কমলা ভট্টাচার্য, যিনি ইতিহাসে প্রথম নারী ভাষাশহিদ হিসেবে চিহ্নিত হন।
এই হত্যাকাণ্ড বরাক উপত্যকা-সহ গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে স্তব্ধ করে দেয়। ব্যাপকভাবে প্রতিক্রিয়া ধ্বনিত হয় পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে এই রাজ্যের সংবাদ মাধ্যমে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ঘটনা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। জনরোষের মুখে শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়।
আজ, ছয় দশকেরও বেশি সময় পরে দাঁড়িয়ে, সেই দিনটির তাৎপর্য নতুন করে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন আরও বেশি করে অনুভূত হয়। কারণ প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক— একটি বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে ঐক্য কীভাবে গড়ে ওঠে? এক ভাষার আধিপত্যে, না কি বহু ভাষার সহাবস্থানে?
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যখন কোনও শাসকগোষ্ঠী একমাত্রিক সাংস্কৃতিক বা ভাষিক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তখনই প্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যাসিমিলেশন’— অর্থাৎ ভিন্নতাকে মুছে দিয়ে একটিমাত্র পরিচয়ে সবাইকে গড়ে তোলার প্রয়াস। শুনতে যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে এটি ততটাই বিপজ্জনক। কারণ ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চেতনা, স্মৃতি, ইতিহাস এবং আত্মপরিচয়ের ধারক। ফলে ভাষার উপর আঘাত মানে মানুষের অস্তিত্বের উপরই আঘাত।
আসামের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা এই সত্যটিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এটি কোনও একক ভাষা বা জাতিগোষ্ঠীর রাজ্য নয়। এখানে যেমন অসমিয়া ভাষার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সাহিত্যিক পরম্পরা রয়েছে, তেমনি বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষারও রয়েছে সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। এর পাশাপাশি বড়ো, কার্বি, মিশিং, ডিমাসা, তিওয়া কিংবা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি— প্রত্যেকটি ভাষা ও সংস্কৃতি এই ভূখণ্ডকে আরও বহুবর্ণিল করে তুলেছে।
এই বৈচিত্র্যই আসামের শক্তি। কিন্তু যখন এই বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করে একটিমাত্র ভাষাকে ‘একক পরিচয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়, তখন সেই শক্তিই দুর্বলতায় পরিণত হয়। কারণ জোর করে তৈরি করা ঐক্য কখনোই স্থায়ী হয় না; বরং তা বিভাজনের বীজ বপন করে।
গণতন্ত্র শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের প্রতিফলন নয়; এটি সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষারও প্রতিশ্রুতি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যদি সংখ্যালঘুর ভাষা ও সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখা হয়, তবে তা গণতন্ত্রের চেতনাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ১৯ মে-র শহিদরা সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— সংখ্যা নয়, ন্যায়ই শেষ কথা।
তবে সহাবস্থান মানে এই নয় যে, ভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে কোনও যোগাযোগ থাকবে না। বরং প্রকৃত সহাবস্থান তখনই সম্ভব, যখন একে অপরের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মানবোধ তৈরি হয়। একজন বাঙালি যদি অসমিয়া সাহিত্য পড়েন, কিংবা একজন অসমিয়া যদি বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হন, তবে সেটি সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির লক্ষণ। কিন্তু এই বিনিময় হতে হবে স্বতঃস্ফূর্ত; কোনও চাপ বা বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে নয়।
সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য— এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি। সংমিশ্রণ মানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গ্রহণযোগ্যতা, আর আধিপত্য মানে একপাক্ষিক চাপ। উনিশে মে-র ইতিহাস আমাদের শেখায়, আধিপত্যের পথ শেষ পর্যন্ত সংঘাতের দিকেই নিয়ে যায়। শিলচরের সেই এগারোজন শহিদের আত্মবলিদান শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়নি। তাঁদের সংগ্রামের ফলেই বাংলা ভাষা আজ আসামে তার মর্যাদা ধরে রাখতে পেরেছে।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এই প্রসঙ্গ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে বহু ছোট ভাষা বিলুপ্তির পথে। প্রযুক্তি, বাজার এবং রাজনীতির চাপে বহু ভাষা তাদের অস্তিত্ব হারাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভাষা রক্ষার লড়াই কেবল আঞ্চলিক নয়, এটি একটি বৈশ্বিক প্রশ্ন।
উনিশে মে তাই কেবল একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি একটি অঙ্গীকারের দিন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঐক্য মানে একরূপতা নয়, বরং ভিন্নতার মধ্যেও মিল খুঁজে নেওয়া। একটি বাগানে যেমন নানা রঙের ফুল একসঙ্গে ফুটলে তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, তেমনি একটি সমাজও তখনই সমৃদ্ধ হয়, যখন সেখানে বহু ভাষা ও সংস্কৃতি পাশাপাশি বিকশিত হয়। শচীন্দ্র পাল, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদ দাস, সুনীল সরকার, সুকোমল পুরকায়স্থ, বীরেন্দ্র সূত্রধর এবং কমলা ভট্টাচার্য—তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের বারবার সতর্ক করে দেয়, ভাষার প্রশ্নে আপস মানেই অস্তিত্বের সঙ্গে আপস।