ব্যাঙ্কের কাছে মানুষ শুধু নিজের সঞ্চিত অর্থই রাখেন না, তুলে দেন ব্যক্তিগত জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও। নাম, ফোন নম্বর, ঋণের বিবরণ, লেনদেনের খুঁটিনাটি— সবই ব্যাঙ্কের কাছে গচ্ছিত থাকে। তাই ব্যাঙ্কের নিরাপত্তা বলতে শুধু টাকা সুরক্ষিত রাখাকে বোঝায় না, গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখাও তার সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই দায়িত্বে সামান্য ফাঁক দেখা দিলেও সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সম্প্রতি দেশের দুই বড় ব্যাঙ্ক, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (এসবিআই) এবং এইচডিএফসি ব্যাঙ্ককে ঘিরে ওঠা উদ্বেগ সেই প্রশ্নকেই সামনে এনেছে।
এসবিআইয়ের ক্ষেত্রে অভিযোগটি আরও গুরুতর। প্রায় চার হাজার গ্রাহকের তথ্য ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়েছে বলে খবর। এই তথ্যের মধ্যে রয়েছে গ্রাহকদের নাম, মোবাইল নম্বর এবং ঋণসংক্রান্ত বিবরণ। ব্যাঙ্কের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলিতে রাখা টাকা নিরাপদ। কিন্তু শুধু টাকা অক্ষত থাকলেই কি দায়িত্ব শেষ হয়? মোটেই নয়। গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য অপরাধীদের হাতে পৌঁছলে প্রতারণার নতুন পথ খুলে যায়। কেউ ব্যাঙ্কের কর্মী পরিচয় দিয়ে ফোন করতে পারে, ঋণের বিবরণ উল্লেখ করে বিশ্বাস অর্জন করতে পারে, এমনকি গোপন তথ্য আদায় করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। অর্থাৎ, তথ্য চুরি না হলেও সেই তথ্য ব্যবহার করে গ্রাহকের টাকা চুরি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যাঙ্কের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রত্যেককে সরাসরি সতর্ক করা। কী ধরনের তথ্য ফাঁস হয়েছে, কীভাবে প্রতারণার আশঙ্কা রয়েছে এবং কী কী সাবধানতা নিতে হবে, তা স্পষ্ট করে জানাতে হবে। পাশাপাশি সন্দেহজনক লেনদেনের উপর নজরদারি বাড়ানো এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা রাখা জরুরি। গ্রাহক নিজে বিপদের কথা জানতে না পারলে তাঁকে সুরক্ষিত রাখার উদ্যোগও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এইচডিএফসি ব্যাঙ্কের ঘটনাটি অন্য ধরনের। এখানে মূল উদ্বেগ গ্রাহকের তথ্য চুরির বদলে ব্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ গোপন তথ্য বাইরে চলে যাওয়া নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাঙ্কটির পরিচালন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত মার্চে খণ্ডকালীন চেয়ারম্যান অতনু চক্রবর্তীর পদত্যাগ এবং তার সঙ্গে যুক্ত শাসনব্যবস্থার উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছিল। এখন আবার গোপন তথ্য সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং ব্যবসায়িক তথ্য বাইরের লোকের কাছে পৌঁছনোর অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও এখানে গ্রাহকের তথ্য ফাঁসের কথা বলা হয়নি, তবু এমন ঘটনা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করতে পারে। কারণ, যে ব্যাঙ্ক নিজের অভ্যন্তরীণ তথ্যই সুরক্ষিত রাখতে পারে না, তার সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এই দুই ঘটনাকে আলাদা সমস্যা বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। ব্যাঙ্কের নিরাপত্তা শুধু কম্পিউটার, পাসওয়ার্ড কিংবা জটিল প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে না। কর্মীদের সতর্কতা, তথ্য ব্যবহারের নিয়ম, কর্তৃপক্ষের নজরদারি এবং দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতিও সমান জরুরি। একটি দুর্বল সংযোগ গোটা ব্যবস্থাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। বিদেশের বড় আর্থিক সংস্থাগুলির ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে, ভুল যাচাই বা দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে। তাই প্রযুক্তির উন্নতি হলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে, এমন ধারণা বিপজ্জনক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উন্নতি এই বিপদ আরও বাড়িয়ে তুলছে। আগে যে ধরনের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা খুঁজে পেতে অপরাধীদের অনেক সময় লাগত, এখন উন্নত এআইয়ের সাহায্যে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। পুরনো সফটওয়্যার, দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং অসতর্ক কর্মীদের ভুলকে কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের আক্রমণ চালানোও সহজ হতে পারে। ফলে ব্যাঙ্কগুলিকে শুধু অতীতের বিপদ ঠেকানোর ব্যবস্থা রাখলে চলবে না, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আক্রমণের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।
এখানে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাঙ্কগুলির তথ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা, স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা, দ্রুত বিপদ শনাক্তকরণ এবং তথ্য ফাঁসের ঘটনা প্রকাশের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। শুধু নির্দেশিকা জারি করলেই হবে না; তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাঙ্কের কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং গোপন তথ্য ব্যবহারের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।