কলকাতার তেঘরিয়ায় পরপর দু’দিন যে ঘটনা ঘটেছে, তা নিছক বিচ্ছিন্ন কোনও আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; বরং বৃহত্তর এক সামাজিক ব্যাধির লক্ষণ। ভাঙড়ের দরিদ্র সব্জি ও ফল বিক্রেতা— সাদ্দাম হোসেন ও এনামুল ইসলাম— নিজেদের রাজ্যের রাজধানীতেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা পেয়ে হেনস্থা ও নিগ্রহের শিকার। এ শুধু ব্যক্তিগত অপমান নয়, নাগরিকত্বের মৌলিক অধিকারের উপর আঘাত।
ঘটনার বিবরণ উদ্বেগজনক। পরিচয়পত্র বা ভোটদানের প্রমাণ দেখিয়েও সন্দেহ কাটাতে পারেননি এনামুল। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছে দেশছাড়া করার। সাদ্দাম হোসেনের ক্ষেত্রেও একইভাবে নাম-পরিচয় জানার পর তাঁকে ‘বাংলাদেশি’ বলে দেগে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে— একজন সাধারণ নাগরিক কি তাঁর নিজের শহরে, নিজের রাজ্যে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে জীবিকা অর্জন করার আগে দেশভক্তি বা নাগরিকত্বের প্রমাণ দেবেন?
এই ঘটনাকে বৃহত্তর প্রেক্ষিতে দেখতে হবে। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছে যে, বিজেপি-শাসিত একাধিক রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে হেনস্থা করা হচ্ছে। এমনকি বহু ক্ষেত্রে পুলিশ বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে নিরপরাধ শ্রমিকদের জোর করে সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রবণতা এখন যদি পশ্চিমবঙ্গের মাটিতেই মাথাচাড়া দেয়, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং বিপজ্জনক।
এখানে মূল সমস্যা কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়, এটি একটি সুসংগঠিত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। ‘বাংলা ভাষায় কথা বলা মুসলমান মানেই বাংলাদেশি’— এই ভ্রান্ত ও বিভাজনমূলক ধারণা দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। এই প্রচারের ফলে সাধারণ মানুষের একাংশের মনে সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং ঘৃণার বীজ বপন হয়েছে। ফলে, কোনও ব্যক্তি তাঁর নাম, ভাষা বা ধর্মের কারণে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে— এ যেন এক অদৃশ্য সামাজিক বিচারব্যবস্থা, যেখানে প্রমাণের প্রয়োজন নেই, কেবল পরিচয়ই অপরাধ।
এই প্রেক্ষাপটে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যও আলোচনার দাবি রাখে। বিভিন্ন সময়ে তাদের নেতাদের ঘৃণাভাষণ, বিভাজনমূলক মন্তব্য এবং ইতিহাস ও ভাষা সম্পর্কে বিকৃত ধারণা জনসমক্ষে এসেছে। এমনকি দলের আইটি সেলের প্রধান অমিত মালবীয়র মতো ব্যক্তির ‘বাংলা ভাষা বলে কিছু নেই’— এই ধরনের মন্তব্য কেবল ভাষাগত অজ্ঞতার পরিচয় নয়, বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত বহন করে। যখন একটি ভাষা ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা হয়, তখন সেই ভাষাভাষী মানুষের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।
মনে রাখা দরকার, পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক বিন্যাস বহুত্ববাদী। এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমান নাগরিক বসবাস করেন, যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের ভাষা বাংলা, তাঁদের সংস্কৃতি এই মাটিরই অংশ। তাঁদের ‘বহিরাগত’ বলে চিহ্নিত করা মানে ইতিহাস, ভূগোল এবং বাস্তবতাকে অস্বীকার করা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এই ধরনের আচরণ এখন আর কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আচরণে প্রতিফলিত হচ্ছে। এক সাধারণ যুবক, কোনও প্রশাসনিক ক্ষমতা ছাড়াই, অন্য নাগরিককে জেরা করছে, পরিচয় জানতে চাইছে, এমনকি হুমকি দিচ্ছে। এটি আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি।
প্রশাসনের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তেঘরিয়ার ঘটনায় পুলিশ এসে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— এই ধরনের মানসিকতার বিরুদ্ধে কি যথেষ্ট কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক সমস্যা মেটানো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বার্তা দেওয়া জরুরি— যে কোনও নাগরিককে তাঁর ধর্ম, ভাষা বা নামের ভিত্তিতে হেনস্থা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলিরও দায়িত্ব রয়েছে। বিভাজনের রাজনীতি স্বল্পমেয়াদে ভোট আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজকে ভেঙে দেয়। বাংলার ঐতিহ্য ছিল সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মান এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের। সেই ঐতিহ্যকে রক্ষা করা আজ একান্ত জরুরি।
সবশেষে, এই প্রশ্ন আমাদের সবার— একটি গণতান্ত্রিক দেশে, একজন নাগরিক কি তাঁর পরিচয়ের জন্য প্রতিনিয়ত প্রমাণ দিতে বাধ্য হবেন? যদি তার উত্তর ‘না’ হয়, তবে তেঘরিয়ার মতো ঘটনাকে কেবল ‘অভিযোগ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। এর বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রশাসনিক— উভয় স্তরেই কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি।
কারণ, ‘বাংলাদেশি’ তকমা শুধু একটি শব্দ নয়; এটি একটি অস্ত্র, যা দিয়ে নাগরিকত্ব, মর্যাদা এবং মানবিকতাকে একসঙ্গে আঘাত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা যদি রোখা না যায়, তবে আগামী দিনে আরও অনেক সাদ্দাম ও এনামুল নিজেদের দেশেই পরবাসী হয়ে পড়বেন।