এক দুঃস্বপ্নের বর্ষপূর্তি

ফাইল চিত্র

কাশ্মীরের পহেলগামের বৈসরণ উপত্যকায় ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার এক বছর পূর্তি হলো। সময়ের ব্যবধানে ক্ষত কিছুটা শুকোলেও স্মৃতি এখনও তাজা। আর সেই স্মৃতি শুধু ২৬টি প্রাণহানির নয়, বরং একটি অঞ্চল, একটি সমাজ এবং একটি সম্ভাবনার ওপর আঘাতের স্মৃতি। ২৫ জন পর্যটক ও এক স্থানীয় ঘোড়া-মালিকের মৃত্যু যেন কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি কাশ্মীরের শান্তি-প্রক্রিয়ার ওপর এক গভীর আঘাতের প্রতীক।

এই ঘটনাকে ঘিরে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক মহল এক বিরল ঐক্যের ছবি তুলে ধরেছে। ফারুক আবদুল্লাহর বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি একে শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা নয়, বরং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অর্জিত শান্তি ও উন্নয়নের গতিকে বিপর্যস্ত করে দেওয়া এক বড় ধাক্কা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর কথায়, এই ধরনের হিংসা শুধু প্রাণ কাড়ে না, মানুষের মনোজগতে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে, যার অভিঘাত দীর্ঘমেয়াদি।

একই সুর শোনা গেছে বিজেপি নেতা রবীন্দর রায়নার কণ্ঠেও। তাঁর ভাষায়, এই হামলা কেবল পর্যটকদের ওপর নয়, ‘কাশ্মীরের আত্মার ওপর আঘাত।’ রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও এই ধরনের অভিন্ন প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটি স্পষ্ট যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই কোনও একক দলের নয়, এটি সমগ্র সমাজের দায়।


এই ঘটনার বহুমাত্রিক প্রভাব বিশ্লেষণ করলে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক অভিঘাত। কাশ্মীরের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ পর্যটন। দীর্ঘদিনের অস্থিরতার পর যখন ধীরে ধীরে পর্যটকদের আস্থা ফিরছিল, তখন এই হামলা সেই পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেয়। পহেলগাম, গুলমার্গ কিংবা সোনমার্গ— এইসব পর্যটনকেন্দ্রের প্রাণভোমরা হল বাইরের মানুষের আগমন। সেই প্রবাহে ভাটা পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হন স্থানীয় ব্যবসায়ী, হোটেলকর্মী, গাড়িচালক, এমনকি ক্ষুদ্র বিক্রেতারাও।

তবে আশার কথা, এক বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতি আবার কিছুটা বদলাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর নেতৃত্বে প্রশাসনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় পর্যটনশিল্প ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিরাপত্তা জোরদার করা, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যটকদের আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ— এই সব মিলিয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই পুনরুদ্ধার কতটা স্থায়ী?

কারণ সন্ত্রাসবাদ শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও। একবার ভয় ঢুকে গেলে তা দূর করতে সময় লাগে। পহেলগামের ঘটনায় সেই ভয় নতুন করে মাথা তুলেছিল। তাই শুধুমাত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরদার করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আস্থার পুনর্গঠন, যা রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির সমন্বয়ে সম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে পহেলগামে নির্মিত স্মারকটির তাৎপর্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি শুধু নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক স্মৃতি নির্মাণ। এই স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শান্তি কোনও স্থায়ী অবস্থা নয়, বরং এক নিরন্তর প্রয়াস। একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তাও— যে কোনও অসতর্ক মুহূর্তে হিংসা আবার ফিরে আসতে পারে।

প্রশাসনের তরফে বাড়তি নিরাপত্তা— চেকপোস্ট, টহলদারি, নজরদারি— নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হল স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। কারণ কাশ্মীরের প্রকৃত শক্তি তার মানুষের মধ্যেই নিহিত। যদি সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকেন, তবে বাহ্যিক শক্তির পক্ষে অশান্তি ছড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।

সবশেষে বলা যায়, পহেলগাম হামলার প্রথম বর্ষপূর্তি শুধু শোকের মুহূর্ত নয়, এটি আত্মসমীক্ষারও সময়। গত এক বছরে কী শিখলাম? কীভাবে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— কীভাবে শান্তি ও উন্নয়নের পথকে আরও সুদৃঢ় করা যায়?

কাশ্মীর বহু ঝড়-ঝঞ্ঝার সাক্ষী। তবুও তার সৌন্দর্য, তার সংস্কৃতি, তার মানবিকতা কখনও সম্পূর্ণভাবে মুছে যায়নি। পহেলগামের সেই রক্তাক্ত স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— শান্তি রক্ষা করা যত কঠিন, তা হারানো তত সহজ। তাই আজ প্রয়োজন আরও বেশি সতর্কতা, আরও বেশি সংহতি এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিকতার প্রতি
অটল বিশ্বাস।