এআইএডিএমকে-র সঙ্কট

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বহু দশক ধরে যে দ্বৈত আধিপত্যের ছবি আমরা দেখেছি— একদিকে দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (ডিএমকে), অন্যদিকে অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম (এআইএডিএমকে)— তা আজ স্পষ্টভাবে টালমাটাল। সাম্প্রতিক নির্বাচনে পরাজয়, তার ওপর দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব— সব মিলিয়ে এআইএডিএমকে এখন অস্তিত্বের এক গভীর সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে। দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভাঙেনি বটে, কিন্তু বাস্তবে একাধিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু একটি দলের সমস্যা নয়; এটি তামিলনাড়ুর সামগ্রিক রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এই সঙ্কটের মূল কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে নেতৃত্বের প্রশ্ন। এআইএডিএমকের ইতিহাসে এম জি রামচন্দ্রন (এমজিআর) এবং পরে জে জয়ললিতা— এই দুই ব্যক্তিত্বই ছিলেন দলের প্রাণশক্তি। তাঁদের ব্যক্তিগত আকর্ষণ, সংগঠনের ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ এবং জনমানসে গভীর প্রভাব— এই তিনের সমন্বয়েই দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেছে। বিশেষ করে জয়ললিতা, যিনি ‘আম্মা’ নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি দলকে এক সুসংগঠিত ও শক্তিশালী কাঠামো দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালে তাঁর মৃত্যু শুধু একটি নেতৃত্বের অবসান ঘটায়নি, বরং একটি যুগেরও ইতি টেনেছে।

জয়ললিতার মৃত্যুর পর থেকেই এআইএডিএমকের ভিতরে বিভাজনের বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। প্রথমে একাধিক গোষ্ঠীতে বিভক্তি, তারপর জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা— সব মিলিয়ে দলটি ক্রমাগত অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। যদিও ই কে পালানিস্বামী (ইপিএস) কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে তাঁর নেতৃত্বে দলটি স্থায়ী ঐক্য গড়ে তুলতে পারেনি। সাম্প্রতিক বিদ্রোহ এবং নতুন গোষ্ঠীর উত্থান দেখিয়ে দিচ্ছে, দলের ভিতরে আস্থার সঙ্কট কতটা গভীর।


এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সঙ্কট শুধুমাত্র নির্বাচনী পরাজয়ের ফল নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বহীনতার প্রতিফলন। একটি রাজনৈতিক দল শুধু ভোটে জয়লাভের মাধ্যমে টিকে থাকে না; তার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আদর্শ, সুসংহত সংগঠন এবং সর্বোপরি এমন এক নেতৃত্ব, যা কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগাতে পারে। এআইএডিএমকের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই তিনটি উপাদানেরই ঘাটতি স্পষ্ট।

এই অবস্থার রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। এআইএডিএমকের দুর্বলতা তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই তামিলাগা ভেত্রি কাঝাগম (টিভিকে)-এর মতো নতুন দল রাজনৈতিক পরিসরে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় স্তরের দলগুলিও এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবে, যা এতদিন তামিল রাজনীতিতে খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে এআইএডিএমকের দুর্বলতা শুধুমাত্র তার নিজের ক্ষতি নয়; এটি গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্যও এক ধরনের সতর্কবার্তা। দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, তা রাজনীতিতে একধরনের জবাবদিহি ও ভারসাম্য বজায় রেখেছিল। একটি শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে ক্ষমতাসীন দলের ওপর সেই চাপ কমে যায়, যা গণতন্ত্রের জন্য মোটেই শুভ নয়।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সঙ্কট থেকে এআইএডিএমকে কি বেরিয়ে আসতে পারবে? তার জন্য প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো দলীয় ঐক্য পুনর্গঠন। ব্যক্তিগত ক্ষমতার লড়াই ছেড়ে একটি সমন্বিত নেতৃত্ব গড়ে তোলা ছাড়া এই মুহূর্তে অন্য কোনও পথ নেই। পাশাপাশি দলের আদর্শিক অবস্থান এবং সংগঠন কাঠামো পুনর্বিবেচনা করাও জরুরি। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে পৌঁছতে হলে শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানের প্রয়োজন ও ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরতে হবে।

সবমিলিয়ে এআইএডিএমকের বর্তমান সঙ্কট একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। এই পরিবর্তন কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে শুধু এই দলের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের ওপর নয়, বরং তামিলনাড়ুর সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপরও। তবে এটা স্পষ্ট— যদি এই সঙ্কট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা না যায়, তাহলে তামিল রাজনীতির দীর্ঘদিনের পরিচিত সমীকরণ খুব শীঘ্রই অতীত হয়ে যেতে পারে।