যুদ্ধ মানেই কি বন্দুক, বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র? একুশ শতকে এসে যুদ্ধের সংজ্ঞা অনেকটাই বদলে গেছে। আজ একটি দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান না চালিয়েও তার অর্থনীতি, শিল্প ও প্রযুক্তিকে বিপন্ন করতে পারে। অস্ত্র হতে পারে আমদানির ওপর শুল্ক, গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা, উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরে বাধা কিংবা বিরল কাঁচামালের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ। এই নতুন সংঘাতের নাম ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’।
কিন্তু নামটি যতটা অর্থনৈতিক, সংঘাতটি তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। লড়াইটা কেবল কে কত পণ্য বিক্রি করবে, কিংবা কার বাণিজ্য ঘাটতি কত— তা নিয়ে নয়। আসল প্রশ্ন, ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। অর্থাৎ বাণিজ্যযুদ্ধের গভীরে রয়েছে আধিপত্যের লড়াই।
এখানেই বর্তমান বিশ্বের একটি বড় পরিবর্তন ধরা পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় সাত দশক ধরে ধীরে ধীরে যে মুক্ত-বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার মূল বিশ্বাস ছিল পারস্পরিক নির্ভরতা। দেশগুলি সবকিছু নিজেরা উৎপাদন করবে না; যে দেশে যে পণ্য বা প্রযুক্তি তুলনামূলক ভালো ও সস্তায় তৈরি হয়, সেখান থেকে তা আমদানি করবে। পণ্য, পুঁজি ও প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ পৃথিবীর অর্থনীতিকে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে দেবে। এই ব্যবস্থার পেছনে ছিল একটি আশাবাদ— অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল দেশগুলির মধ্যে বড় সংঘাতের সম্ভাবনাও কমবে।
আজ সেই আশাবাদে বড় ধাক্কা লেগেছে। সাম্প্রতিক বাণিজ্যযুদ্ধের কথা উঠলেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম সামনে আসে। শুল্ককে তিনি অর্থনৈতিক নীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার করেছেন। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত শুধু ট্রাম্পের নীতিতে খুঁজলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। সুমাইয়া কেইনস ও চ্যাড পি বাউন তাঁদের ‘হাউ টু উইন আ ট্রেড ওয়ার : অ্যান অপটিমিস্টিক গাইড টু অ্যান অ্যাংশাস গ্লোবাল ইকনমি’ বইয়ে দেখিয়েছেন, বিশ্ব বাণিজ্যের পুরনো কাঠামো দুর্বল হওয়ার পেছনে চিনের শিল্পনীতিও গুরুত্বপূর্ণ।
চিনের ‘মেড ইন চাইনা ২০২৫’ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে বিশ্বনেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। পরে ‘দ্বৈত সঞ্চালন’ বা ‘ডুয়েল সার্কুলেশন’ নীতি চিনের অর্থনীতিকে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিশ্বের অন্য দেশগুলির চিনের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পথকে গুরুত্ব দেয়। ফলে পারস্পরিক নির্ভরতার পুরনো মডেল ক্রমশ বদলে যেতে থাকে। নির্ভরতা আর সমান দু’পক্ষের সম্পর্ক থাকে না, তা হয়ে ওঠে কৌশলগত শক্তির উৎস।
চিনের বিপুল উৎপাদন ক্ষমতা এই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করেছে। সাধারণ বাজারব্যবস্থায় কোনও পণ্যের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি হলে দাম কমে যায়। উৎপাদক ক্ষতির মুখে পড়ে এবং উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের বিপুল সহায়তা, ভর্তুকি এবং সস্তা ঋণের কারণে চিনের কিছু শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে। কম দামের পণ্য তখন বিশ্ববাজারে ঢুকে পড়ে।
ইউরোপের গাড়ি শিল্প এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। চিনা বৈদ্যুতিক গাড়ির কম দাম ইউরোপীয় নির্মাতাদের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। সমস্যাটি শুধু বাজারের অংশ হারানোর নয়। এর সঙ্গে জড়িত কারখানা, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান, শিল্প-প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। একই ধরনের চাপ সৌরশক্তি, ব্যাটারি, ইস্পাতসহ বিভিন্ন শিল্পেও দেখা যাচ্ছে।
এখানেই অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। যে দেশ কোনও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের জন্য সম্পূর্ণভাবে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল, সংকটের সময় সে দুর্বল হয়ে পড়ে। অতিমারির সময় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, সেমিকন্ডাক্টর এবং নানা শিল্পপণ্যের সরবরাহে যে বিঘ্ন ঘটেছিল, তা এই দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ফলে ‘সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে’— এই যুক্তির পাশাপাশি এখন আর একটি প্রশ্নও করা হচ্ছে: ‘সংকটের সময় পাওয়া যাবে তো?’
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি সমস্যার উত্তর শুল্ক। শুল্ক অনেকটা শক্তিশালী ওষুধের মতো। প্রথমে তার প্রভাব দৃশ্যমান হয়— দেশীয় শিল্প কিছুটা সুরক্ষা পায়, বিদেশি পণ্য তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই শুল্কের মূল্য দিতে হয় ভোক্তাকে। আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ে, দেশীয় উৎপাদকও প্রতিযোগিতার চাপ কমে যাওয়ায় দাম কমানোর উৎসাহ হারাতে পারে। ফলে শুল্ক শেষ পর্যন্ত শিল্পকে রক্ষা করলেও সাধারণ মানুষকে রক্ষা নাও করতে পারে।
আরও বড় সমস্যা হল পাল্টা শুল্ক। একটি দেশ শুল্ক বসালে অন্য দেশও বসায়। শুরু হয় প্রতিশোধের চক্র। রপ্তানি কমে, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। যে দেশ যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার নিজের শিল্পও তখন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। আজ আমেরিকা উন্নত প্রযুক্তির চিপের ওপর চিনের প্রবেশাধিকার সীমিত করছে, চিন আবার বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনও দেশের ওপর দীর্ঘদিন প্রযুক্তিগত বা সরবরাহগত বাধা চাপিয়ে রাখা সহজ নয়।
ব্রিটেন একসময় টেলিগ্রাফ ব্যবস্থায় নিজের প্রভাব ব্যবহার করে জার্মানির বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ার পথ সংকুচিত করেছিল। জার্মানি শেষ পর্যন্ত বেতার প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ বাধা কখনও কখনও প্রতিপক্ষকে আরও দ্রুত বিকল্প প্রযুক্তি খুঁজতে বাধ্য করে।
তাহলে বাণিজ্যযুদ্ধের মোকাবিলা কীভাবে? প্রথমেই দরকার নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা। কোন শিল্প কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কোন কাঁচামাল বা প্রযুক্তির জন্য বিদেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে, কোন পণ্য সংকটের সময় অপরিহার্য হয়ে উঠবে— তার তালিকা করতে হবে। যা দেশে উৎপাদন করা সম্ভব, তার উৎপাদন বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হলে ভর্তুকি দিতে হবে। যা দেশীয়ভাবে উৎপাদন করা কঠিন, তার জন্য একাধিক সরবরাহকারী দেশ তৈরি করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় মজুত গড়ে তুলতে হবে।
এখানে ভারতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আত্মনির্ভরতার অর্থ বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। বরং এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে কোনও একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে না হয়। ‘নিজের দেশে তৈরি’ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ ‘বহু উৎস থেকে সংগ্রহ’। একক নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করাই হতে পারে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার
অন্যতম চাবিকাঠি।
আর মানুষকে ভুলে গেলে চলবে না। বাণিজ্যনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেই এসে পৌঁছয়। সাধারণ মানুষ সস্তা পণ্য, সহজলভ্য ওষুধ, সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং কর্মসংস্থান চায়। কোনও দেশ দীর্ঘদিন ধরে তাদের বোঝাতে পারবে না যে, বেশি দামে পণ্য কেনাই দেশপ্রেমের প্রমাণ। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তাই বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাব্য লাভের পাশাপাশি তার খরচ সম্পর্কেও মানুষকে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।
মিত্রদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একা কোনও দেশ বিশ্ববাজারে সব ধরনের সরবরাহ ও প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে পারে না। তাই একই মূল্যবোধ ও স্বার্থের দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে গিয়ে নিজের মিত্রদেরও ক্ষুব্ধ করা হলে কৌশলগত লাভ উল্টো ক্ষতিতে পরিণত হতে পারে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, বাণিজ্যযুদ্ধে প্রকৃত বিজয় বলে কিছু নেই। এখানে জয় মানে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা নয়, বরং নিজের ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম রাখা। দু’পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু যে দেশ নিজের শিল্প, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও সরবরাহব্যবস্থাকে বেশি স্থিতিশীল রাখতে পারবে, শেষ পর্যন্ত তার অবস্থান শক্তিশালী হবে।
বিশ্ব এখন মুক্ত বাণিজ্যের পুরনো আদর্শ ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের নতুন বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে। সম্পূর্ণ মুক্ত বাজার হয়তো আর আগের মতো থাকবে না, আবার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার পথও কোনও দেশের জন্য টেকসই নয়। প্রয়োজন এমন এক নতুন ভারসাম্য, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা থাকবে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দরজাও বন্ধ হবে না।
কারণ শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সত্যটি বদলায়নি: কোনও দেশ একা সবকিছু তৈরি করতে পারে না। প্রশ্ন হল— আমাদের নির্ভরতা কি সহযোগিতার ভিত্তিতে হবে, নাকি অন্যের আধিপত্যের হাতিয়ার হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্র নির্ধারণ করবে।