গণতন্ত্রের পরীক্ষা

প্রতীকী চিত্র

পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শেষ করে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। প্রায় ৭ কোটি ৪৬ লক্ষ ভোটারকে রেখে ৬৪ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ গিয়েছে। পাশাপাশি তথ্যগত অসঙ্গতি বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ শিরোনামে প্রায় ৬০ লক্ষ নাম বিচারাধীন, যাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন প্রায় ৫০০ বর্তমান ও প্রাক্তন বিচারিক আধিকারিক। ইতিমধ্যেই এই বিপুল সংখ্যক বর্জন ও অনিশ্চয়তা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বহু নাগরিকের আশঙ্কা, যোগ্য হয়েও তাঁদের নাম তালিকায় নেই।

সবচেয়ে বেশি বর্জন হয়েছে কলকাতা, পশ্চিম বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও দার্জিলিং জেলায়; আবার সবচেয়ে কম পুর্ব মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও কোচবিহারে। কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রে বর্জনের হার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি বা তারও বেশি, যা স্বাভাবিক সংশোধন প্রক্রিয়ার তুলনায় অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়। অন্যদিকে ৮২টি আসনে খসড়া থেকে চূড়ান্ত পর্যায়ে ভোটার সংখ্যা বেড়েছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৃদ্ধির হার অর্ধ শতাংশের কম। এই পরিসংখ্যানের বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, সমগ্র প্রক্রিয়াটি একরৈখিক নয়, বরং অঞ্চলভেদে তার প্রভাব ভিন্ন।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ ধারা, যা পশ্চিমবঙ্গেই প্রথম প্রয়োগ করা হয়েছে। বিচারাধীন ৬০ লক্ষ নামের চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট নয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হলেও সম্পূরক তালিকা কবে প্রকাশিত হবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ফলে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জটিলতা বাড়তে পারে। গণতন্ত্রে ভোটাধিকার কেবল আইনি অধিকার নয়, নাগরিক মর্যাদার মূল ভিত্তি। সেই অধিকারের উপরে অনিশ্চয়তার ছায়া পড়লে আস্থা নষ্ট হয়।


রাজনৈতিক তরজাও কম নয়। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তুলেছে, বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যই এই বর্জন। বিজেপি পাল্টা বলছে, ভুয়ো ভোট রুখতেই কঠোরতা। আরও তাৎপর্যপূর্ণ— এসআইআর শুরুর আগেই বিজেপি নেতাদের ‘১ কোটি ২৫ লক্ষ নাম বাদ যাবে’ মন্তব্য এবং বর্তমান সংখ্যার মধ্যে সাদৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, তাদের নিরপেক্ষতার উপর আস্থা থাকাই কাম্য। কিন্তু যখন রাজনৈতিক পূর্বাভাস ও প্রশাসনিক ফলাফলের মধ্যে মিল দেখা যায়, তখন সন্দেহের অবকাশ তৈরি হয়, যা কমিশনের ভাবমূর্তির পক্ষে শুভ নয়।

তবে পরিসংখ্যানের আরেকটি দিকও বিবেচ্য। দীর্ঘদিন ভোটার তালিকায় মৃত, স্থানান্তরিত বা দ্বৈত নাম থেকে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশোধন প্রক্রিয়ায় কিছু বর্জন অনিবার্য। প্রশ্ন হল, সেই বর্জন কি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে হয়েছে? বিচারাধীন নামগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রত্যাখ্যাতদের আপিলের সুযোগ এবং তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে কমিশনই এই সন্দেহ দূর করতে পারে। ইতিমধ্যে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, যাঁদের নাম খসড়ায় ছিল কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় নেই, তাঁরা জেলা নির্বাচন আধিকারিকের কাছে আপিল করতে পারবেন, নতুন অন্তর্ভুক্তির জন্য ফর্ম-৬-ও খোলা আছে। কিন্তু গ্রাম থেকে শহর— সর্বত্র কি সেই তথ্য ও প্রক্রিয়া সমানভাবে পৌঁছেছে?

গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যায় নয়, আস্থায়। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে সজাগ রাজ্যে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সাড়া ফেলবে। তাই প্রয়োজন স্বচ্ছতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড। বিচারাধীন ৬০ লক্ষ নামের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য নিষ্পত্তি, জেলা-ভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য উন্মোচন, এবং রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে সর্বদলীয় আলোচনার মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন, এই মুহূর্তে সেটাই জরুরি।

ভোটের আগে ভোটার তালিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ নয়। নির্বাচন কমিশনেরই দায়িত্ব— সন্দেহের মেঘ সরিয়ে প্রমাণ করা যে, তারা কেবল আইন ও সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ, কোনও রাজনৈতিক পূর্বাভাসের প্রতি নয়। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর তাই কেবল প্রশাসনিক অনুশীলন নয়, এটি গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতার এক কঠিন পরীক্ষা।