তীজন বাঈ, পাণ্ডবানী ও এক অসামান্য নারীজীবনের গল্প

Photo: ANI

একটি কণ্ঠ থেমে গেলে প্রথমে বোঝা যায় না ঠিক কী হারালাম। শব্দ থামে, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি কিছুক্ষণ বাতাসে ভেসে থাকে, যেন দূরের কোনও অরণ্য থেকে ভেসে আসা ঢোলের শব্দ হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেছে, অথচ এখনও কানে তার কম্পন লেগে আছে। তেমনই এক কণ্ঠ ছিল তীজন বাঈ, যিনি মহাভারতের গল্প শুধু শোনাতেন না, তাকে বিনির্মাণ করতেন নিজের জীবনের গল্প দিয়ে। তাঁর চলে যাওয়া তাই নিছক একটি মৃত্যুসংবাদ নয়, এটি যেন এক জীবন্ত মহাকাব্যের হঠাৎ থেমে যাওয়া, একটি দীর্ঘ উচ্চারণের শেষে গভীরতর নীরবতা।

ছত্তিশগড়ের দুর্গ জেলার ছোট্ট গ্রাম গনিয়ারির মাটিতে তাঁর জন্ম, ১৯৫৬ সালে। মাটির ঘর, অভাবের সংসার, আর সেই অভাবের মধ্যেই গল্পের অদ্ভুত এক ঐশ্বর্য— এই ছিল তাঁর শৈশব। তাঁর মাতামহ ব্রিজলাল পারধি মহাভারতের কাহিনি গাইতেন, বলতেন, অভিনয় করতেন। ছোট্ট তীজন সেই গল্প শুনতে শুনতে বুঝে গিয়েছিলেন, শব্দের ভেতরে আরেকটি পৃথিবী লুকিয়ে থাকে। সেই পৃথিবীতে ঢুকে পড়লে বাস্তবের দারিদ্র্য, অভাব, অপমান, সব কিছু যেন অন্য অর্থ পায়। তিনি শুনতেন, মুখস্থ করতেন, তারপর নিঃশব্দে নিজের মধ্যে সেই কাহিনি পুনর্গঠন করতেন, যেন এক অদৃশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেই ভীম, নিজেই দ্রৌপদী, নিজেই অর্জুন হয়ে উঠছেন।

কিন্তু বাস্তবের পৃথিবী এত সহজে স্বপ্নকে গ্রহণ করে না। মাত্র ১২ বছর বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। সমাজের নিয়ম ছিল কঠোর, বিশেষ করে নারীদের জন্য। গান গাওয়া, মঞ্চে ওঠা— এসব গ্রহণযোগ্য ছিল না সেই সমাজে। তবু তীজন থামেননি। ১৩ বছর বয়সে তিনি প্রথম মঞ্চে ওঠেন, বিনিময়ে পান মাত্র ১০ টাকা। সেই ১০ টাকার মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক বিপ্লবের সূচনা। কারণ তিনি যে ভঙ্গিতে পাণ্ডবানী গাইলেন, তা ছিল প্রচলিত নিয়মের সম্পূর্ণ বিরোধী।


পাণ্ডবানীর দুটি প্রধান ধারা— ‘বেদমতী’ ও ‘কাপালিক’। নারীরা সাধারণত বসে, সংযত ভঙ্গিতে ‘বেদমতী’ শৈলীতে গান করতেন। কিন্তু তীজন দাঁড়ালেন। তাঁর শরীর হয়ে উঠল ভাষা, তাঁর চোখ হয়ে উঠল আগুন, তাঁর কণ্ঠ হয়ে উঠল যুদ্ধের ঘোষণা। তিনি ‘কাপালিক’ শৈলী বেছে নিলেন, যেখানে শিল্পী শুধু গায় না, অভিনয় করে, চরিত্রে প্রবেশ করে, গল্পকে মঞ্চে জীবন্ত করে তোলে। এই সিদ্ধান্তই তাঁকে সমাজচ্যুত করল। তাঁকে ত্যাগ করা হল, একঘরে করা হল।

একটি কুঁড়েঘর, কিছু ধার করা বাসন, আর চারপাশে অবিশ্বাস— এই ছিল তাঁর জীবনের বাস্তবতা। কিন্তু তাঁর ভিতরে যে আগুন ছিল, তা নিভল না। বরং সেই অস্বীকৃতি তাঁর শিল্পকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুললো। তিনি গাইতে থাকলেন, আরও জোরে, আরও গভীরভাবে। তাঁর কণ্ঠে তখন শুধু গল্প নয়, হয়ে উঠল প্রতিবাদ; শুধু সুর নয়, বেঁচে থাকার এক মরিয়া আকাঙ্ক্ষাও।

ধীরে ধীরে তাঁর কণ্ঠ পৌঁছে গেল বৃহত্তর মঞ্চে। নাট্যব্যক্তিত্ব হাবিব তনবীর তাঁর প্রতিভা চিনতে পারলেন। সেই থেকে তাঁর যাত্রা নতুন মোড় নিল। তিনি পৌঁছলেন বড় মঞ্চে, শহরে, তারপর দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশে। একসময় তিনি গান শোনালেন ইন্দিরা গান্ধীর সামনে— সেই মুহূর্ত যেন তাঁর জীবনের এক প্রতীকী স্বীকৃতি। গ্রাম থেকে উঠে আসা এক শিল্পী, যাঁকে সমাজ একদিন অস্বীকার করেছিল, তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গেলেন তাঁর কণ্ঠের জোরে।

তাঁর পরিবেশনা ছিল এক বিস্ময়। একটি মাত্র তম্বুরা— কখনও সেটি ভীমের গদা, কখনও অর্জুনের ধনুক, কখনও দ্রৌপদীর অসহায়তার প্রতীক। তিনি যখন ভীম হন, তখন তাঁর শরীরী ভাষায় এক অদম্য শক্তি দেখা যায়; যখন দ্রৌপদী, তখন তাঁর চোখে জলের রেখা; যখন অর্জুন, তখন তাঁর কণ্ঠে দ্বিধা ও সংকল্পের মিশ্রণ। দর্শকরা শুধু দেখতেন না, তাঁরা যেন সেই কাহিনির ভিতরে ঢুকে পড়তেন। পাণ্ডবানী তাঁর হাতে হয়ে উঠেছিল এক সম্পূর্ণ নাট্যমাধ্যম— যেখানে সঙ্গীত, কবিতা, নাটক, শরীরী ভাষা, সব একাকার।

এই শিল্পই তাঁকে নিয়ে গেল বিশ্বমঞ্চে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, তুরস্ক— বিভিন্ন দেশে তিনি পাণ্ডবানী পরিবেশন করলেন। ভাষা ছিল ভিন্ন, সংস্কৃতি ছিল ভিন্ন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের আবেগ কোনও অনুবাদ চাইত না। দর্শকরা বুঝতে পারতেন— এটি শুধু একটি গল্প নয়, এটি মানবজীবনের এক চিরন্তন অভিজ্ঞতা।

এই আন্তর্জাতিক যাত্রার এক উজ্জ্বল শিখর ২০১৮ সালে জাপানে। সেই বছর তিনি পান ফুকুওকা পুরস্কার— এশিয়ার সংস্কৃতি ও শিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য দেওয়া এক মর্যাদাপূর্ণ সম্মান। জাপানের ফুকুওকা শহরে সেই অনুষ্ঠানের এক দৃশ্য কল্পনা করলে মনে হয় যেন ইতিহাসের দুই প্রান্ত একে অপরকে স্পর্শ করছে। একদিকে ছত্তিশগড়ের মাটির গন্ধ, অন্যদিকে জাপানের সুশৃঙ্খল আধুনিকতা— আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক নারী, তাঁর কণ্ঠে মহাভারতের গল্প।

সেই মঞ্চে তিনি যখন গাইছিলেন, তখন ভাষা ছিল অচেনা, কিন্তু আবেগ ছিল একেবারে পরিচিত। তাঁর কণ্ঠের ওঠানামা, তাঁর চোখের ভাষা, তাঁর হাতের ভঙ্গি— সবকিছু মিলিয়ে এমন এক নাট্যমুহূর্ত তৈরি হয়েছিল, যা কোনও ভাষার সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। জাপানের দর্শকরা হয়তো প্রতিটি শব্দ বুঝতে পারেননি, কিন্তু তাঁরা অনুভব করেছিলেন— এই শিল্প মানবিকতার, সংগ্রামের, ন্যায়ের। সেই মুহূর্তে পাণ্ডবানী শুধু ছত্তিশগড়ের শিল্প ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল বিশ্বমানবের গল্প।

তাঁর প্রাপ্ত সম্মানের তালিকা দীর্ঘ– পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ, সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার— এ সবই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। কিন্তু এই সব পুরস্কারের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তিনি দেখিয়েছেন, লোকশিল্প কোনও প্রান্তিক শিল্প নয়; এটি সভ্যতার মূল স্রোতের অংশ। তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারীও এই শিল্পের কেন্দ্রে থাকতে পারেন, নেতৃত্ব দিতে পারেন, নতুন ভাষা তৈরি করতে পারেন।

তাঁর জীবনের শেষ পর্বেও সেই শিল্প থামেনি। শরীর ক্রমশ দুর্বল হয়েছে, কিন্তু কণ্ঠের ভিতরের আগুন নিভে যায়নি। তিনি যতদিন পেরেছেন, মঞ্চে উঠেছেন, গেয়েছেন, গল্প বলেছেন। তাঁর কণ্ঠে তখন সময়ের ছাপ ছিল, অভিজ্ঞতার ভার ছিল, কিন্তু সেই সঙ্গে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি— যেন তিনি জানেন, তাঁর কাজ শেষ হয়ে আসছে, কিন্তু তাঁর গল্প শেষ হবে না। গত ৫ জুলাই তাঁর কণ্ঠ থেমে গেল। তিনি আর নেই। কিন্তু এই ‘না থাকা’ কথাটা যেন তাঁর ক্ষেত্রে পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ তাঁর কণ্ঠ এখনও বেঁচে আছে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে, তাঁর অনুকরণে, তাঁর প্রভাবিত অসংখ্য শিল্পীর মধ্যে।

তাঁর জীবন এক অদ্ভুত সমীকরণ— দারিদ্র্য ও ঐশ্বর্য, অস্বীকৃতি ও স্বীকৃতি, প্রান্ত ও কেন্দ্র। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিল্প কখনও শুধুমাত্র বিনোদন নয়; এটি এক ধরনের অস্তিত্বের ঘোষণা। তাঁর কণ্ঠে পাণ্ডবানী শুধু মহাভারতের পুনর্কথন ছিল না; তা ছিল এক নারীর নিজের গল্প, নিজের সংগ্রাম, নিজের জয়ের কাহিনি। একটি কণ্ঠ, একটি তম্বুরা আর একটি মঞ্চ, এত সামান্য উপকরণ নিয়েও তিনি তৈরি করেছিলেন এক বিশাল জগৎ। সেই জগতে ছিল যুদ্ধ, প্রেম, অপমান, প্রতিবাদ, ন্যায়, ইতিহাস — সবকিছু। তিনি সময়কে অতিক্রম করেছিলেন নিজের কণ্ঠ দিয়ে। তিনি দেখিয়েছেন— দারিদ্র্য বাধা নয়, সমাজের বাঁধন শেষ কথা নয়, শিল্পই শেষ সত্য। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ রয়ে গেছে পাণ্ডবানীর প্রতিটি সুরে, প্রতিটি গল্পে। গল্প কখনও মরে না, আর গল্পের মধ্যেই অমর হয়ে থাকেন শিল্পী।