অত্যাধুনিক প্রযুক্তিবিজ্ঞানে কৃত্রিম হীরা

Photo: Pexels

আজকাল খবরের কাগজ খুললেই দেখতে পাই পাতা জুড়ে হীরার গয়নার বিজ্ঞাপন। একসময় হীরা ছিল, রাজা-মহারাজা আর ধনী মানুষদের অলংকার। আজ সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানেও হীরার আংটি, নেকলেস, কানের দুল ক্রমশ স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন হল কীভাবে একটা অতি সাধারণ রাসায়নিক উপাদান কার্বন, পৃথিবীর সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত বিলাসপণ্যে পরিণত হল? এর উত্তর শুধু হীরার কঠিনতা বা সৌন্দর্যে নেই। এর পিছনে রয়েছে— ভূতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান, বিজ্ঞাপন, শ্রম আর নতুন প্রযুক্তির এক অসাধারণ মেলবন্ধন।

১৯৪৭ সালে কপিরাইটার ফ্রান্সিস গেরেটি একটি হীরার কোম্পানি ডি বেয়ার্স-এর জন্য একটা স্লোগান তৈরি করেন— ‘হীরা চিরন্তন’। এই ছোট্ট একটা বিজ্ঞাপনের কথা হীরাকে শুধু পণ্য হিসেবে বিক্রি করেনি, হীরাকে একটা অনুভূতিতে পরিণত করেছিল। ধীরে ধীরে হীরার চাহিদা বাড়তে শুরু হল। এই চাহিদাকে ব্যবসায়িক লাভে পরিবর্তনের জন্য শুরু হল গবেষণা— পরীক্ষাগারে হীরাকে কীভাবে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা যায়। আবার হীরাকে সবার কাছে পৌঁছতে হলে একে এতটা দামি করেও রাখা যাবে না।

ভূগর্ভস্থ কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে, ১৯৫৪ সালে মার্কিন নিউইয়র্কের শেনেকটাডিতে জেনারেল ইলেকট্রিকের গবেষণাগারে প্রথম সফল কৃত্রিম হীরা তৈরি করা হল। দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ট্রেসি হল। তিনি প্রথম বেল্ট প্রেসের নকশা তৈরি করেন, যা ছিল হীরা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চচাপ ও তাপমাত্রায় উৎপন্ন করার সক্ষম প্রথম যন্ত্র। এই সাফল্য থেকেই শুরু হয় বাণিজ্যিক কৃত্রিম হীরা উৎপাদনের প্রারম্ভিক সূচনা। রাসায়নিক বাষ্প জমা (কেমিক্যাল ভেপার ডিপোজিশন বা সিভিডি) পদ্ধতিতে হীরা তৈরি হয়েছিল ১৯৮০-র দশকে। এভাবেই হীরা উৎপাদন প্রযুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে শুরু হয়। পরীক্ষাগারে উৎপন্ন কৃত্রিম হীরা সাধারণত প্রাকৃতিক হীরার চেয়ে অনেক সস্তা হতে শুরু হল।


ভারতের সবচেয়ে বড় হীরা কাটিং আর পলিশিংয়ের কেন্দ্র হল সুরাট। ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী হীরাশিল্পে প্রায় ৮ লক্ষ কারিগর যুক্ত ছিলেন। প্রাকৃতিক হীরা থেকে কৃত্রিম হীরায় পরিবর্তনের ফলে কারিগরদের মজুরি ৫০-৭৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। রিপোর্টে প্রকাশ এক ক্যারেট প্রাকৃতিক হীরা কাটিং ও পলিশিংয়ের জন্যে যেখানে কারিগরেরা ১২০০ টাকা পেতেন, সেখানে কৃত্রিম হীরার ক্ষেত্রে মজুরি পান মাত্র ৩৫০ টাকা। কিন্তু সময় ও পরিশ্রম দুটির ক্ষেত্রে একই।

সুরাটের হীরা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলিতে যেখানে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ হীরা কাটিং ও পলিশিং করা হয় সেখানকার হীরা কারিগরেরা এক বিশাল সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন।

ভূ-রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের এক ভয়াবহ সংমিশ্রণের প্রতিফলন হল হাজার হাজার দক্ষ হীরা কারিগরেরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন, কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে, কারখানাগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। অটোমেশন এবং লেজার প্রযুক্তি এসে যাওয়ার ফলে স্বয়ংক্রিয় ত্রিমাত্রিক লেজার ম্যাপিং, স্বয়ংক্রিয় ব্লকিং এবং রোবোটিক কাটিং যন্ত্রপাতির অস্বাভাবিক অগ্রগতি হয়েছে। তার ফলে মানুষের হাতের চেয়ে আরও দ্রুত আর অধিক নির্ভুলতার সঙ্গে পাথরের অভ্যন্তরীণ অন্তর্ভুক্তিগুলির মানচিত্র তৈরি করতে অনেক কম সময় লাগছে আর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি আরও নিখুঁত হচ্ছে। তারপরে প্রতিটি কারখানায় প্রয়োজনীয় কারিগরের সংখ্যা কমে আসছে। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ আর সামাজিক নিরাপত্তা না থাকার দরুন স্বাভাবিক জীবনধারণ করাটাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সুরাটে হীরা শিল্পে কাটিং ও পলিশিংয়ের কাজে প্রায় দশ হাজার দক্ষ পরিযায়ী বাঙালী কারিগর যুক্ত আছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে একটা নতুন শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে— অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে কৃত্রিম হীরার ব্যবহার।

পশ্চিমবঙ্গে হীরার খনি বা কৃত্রিম হীরা তৈরির কোনও কারখানা নেই। কিন্তু আছে বিশাল পরিমাণ দক্ষ হীরা কারিগরের সম্ভার। যাঁরা সুযোগ পেলেই নিজেদের ঘরে ফিরে আসতে প্রস্তুত। এই কারিগরদের দক্ষতার উন্নতিকরণ আর অটোমেশনের সঙ্গে নিজেদের কারিগরি
শিল্প-সত্তার একটা মেলবন্ধনের যদি সুযোগ ঘটানো যায়— তাহলে পশ্চিমবঙ্গে একটা নতুন শিল্প গড়ে উঠতে পারে, সেটা হীরা দিয়ে গয়না তৈরি নয়, আধুনিক প্রযুক্তিতে কৃত্রিম হীরা ব্যবহারের সর্বপ্রথম পদক্ষেপ। এখানে তৈরি করা যেতে পারে হীরা ও রত্ন পাথরপ্রযুক্তি কেন্দ্র। এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে— সিভিডি হীরা উৎপাদন, রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি, হীরার বীজ প্রস্তুতিকরণ আর সমগ্র প্রক্রিয়ার আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ। কলকাতা ও অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের কাটিং ও পলিশিং কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কারিগরি গয়নার নকশার সঙ্গে কম্পিউটারের সাহায্যে নক্সিকরণ আর ত্রিমাত্রিক নক্সিকরণ যোগ করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, পরীক্ষাগারে উৎপন্ন কৃত্রিম হীরা শুধু গয়নার ক্ষেত্রে ব্যবহার করার জন্য নয়, এটা ব্যবহার করা যেতে পারে উচ্চশক্তি সম্পন্ন ইলেকট্রনিক্স, তেজস্ক্রিয়তা শনাক্তকরণ, কোয়ান্টাম সেন্সিং আর অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিতেও। পশ্চিমবঙ্গ শিল্পমন্ত্রক চাইলে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু দক্ষ বাঙালি কারিগরদের হীরার গয়নার শিল্প থেকে কৃত্রিম হীরাকে প্রযুক্তি শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন আঙ্গিকে ব্যবহার করার কথা ভাবতে পারে।

২০২৫-২৬ আর্থিক বর্ষে ভারত মোট রত্ন আর গয়না রপ্তানি করেছে ২ লক্ষ ৪৪ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। তার মধ্যে প্রাকৃতিক হীরা কাটিং ও পলিশিং করে রপ্তানি করেছে ১ লক্ষ ০৭ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। পরীক্ষাগারে তৈরি হীরা কাটিং ও পলিশিং করে রপ্তানি করেছে ১০ হাজার ১৩ কোটি টাকা। কৃত্রিম হীরা সেটিং গয়না রপ্তানি করেছে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু মজার ব্যাপার হল হীরাকে প্রযুক্তিবিজ্ঞানে কাজে লাগিয়ে সেই জাতীয় ব্যবসার কোনও উল্লেখ নেই। তাই হীরার ব্যবহার শুধুমাত্র গয়নার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, উচ্চ প্রযুক্তিগত উৎপাদন ইকোসিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে। যদিও রত্নমানের হীরার গহনা দ্যুতি ছড়ায়, কিন্তু এর ভৌত বৈশিষ্ট্যগুলো অসাধারণ। যেকোনও পদার্থের থেকে সর্বোচ্চ তাপ পরিবাহিতা, বিস্তৃত আলোকীয় স্বচ্ছতা পরিসর, উচ্চ কাঠিন্য, কোয়ান্টাম স্পিন অবস্থা— একে পরবর্তী প্রজন্মের প্রকৌশলের জন্য একটা ‘সুপার মেটেরিয়াল’ বা ‘বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন উপাদানে’ পরিণত করে।

ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর তাপীয় ব্যবস্থাপনায় পাওয়ার ইলেক্ট্রনিক্স, ৫জি /৬জি বেস স্টেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্ভার চিপ প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে। হীরের মধ্যে তামার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি তাপ স্থানান্তরকরণ ক্ষমতা আছে। আমাদের দেশে পরীক্ষাগারে যারা হীরা তৈরি করছে তারা পলিক্রিস্টালাইন হীরার থার্মাল ওয়েফার আর হিট স্প্রেডার তৈরি করছে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোপ্রসেসের, রাডার সিস্টেম এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির পাওয়ার মডিউলের ঠিক নিচে এই পাতলা হীরার ওয়েফারগুলি লাগানো হয় যাতে অতিরিক্ত গরম না হয়। ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি ঠান্ডা করার জন্য সিভিডি হীরার প্লেট বসানো হয়। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন শিল্প লেজারের প্রভাবে সাধারণ কাচ বা কোয়ার্টজ গলে যায়। কিন্তু হীরার তৈরি অপটিকাল উইন্ডোগুলি অতি উচ্চমাত্রার লেজার বিকিরণের পরেও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং অক্ষত থাকে।

উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কার্বন ডাই-অক্সাইড লেজার, প্লাজমা চেম্বার এবং মহাকাশ সেন্সরে আউটপুট উইন্ডো হিসেবে ব্যবহারের জন্য সিভিডি হীরার প্লেট পালিশ করে লাগানো হচ্ছে। যখন হীরার ল্যাটিসে কোনও ফাঁকা স্থানের (ভ্যাকুয়াম) পাশে একটি নাইট্রোজেন পরমাণু একটি কার্বন পরমাণুকে প্রতিস্থাপন করে, তখন এটি একটি নাইট্রোজেন ভ্যাকেন্সি (এনভি) কেন্দ্র তৈরি করে। এই আণুবীক্ষণিক ত্রুটিটি ঘরের তাপমাত্রায় ইলেকট্রনের স্পিন বা ঘূর্ণন আটকে রাখতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সক্ষম কিউবিট বা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের তথ্য সংরক্ষণের একক হিসেবে এনভি সেন্টার নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। এনভি সেন্টার হীরেগুলো অতি সংবেদনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র সেন্সর (ম্যাগনেটোমিটার) এবং ঘরের তাপমাত্রায় কোয়ান্টাম প্রসেসরের জন্য সলিড স্টেট কিউবিট হিসেবে কাজ করে। ডিপটেক স্পিন-অফগুলোর পাশাপাশি, কোয়ান্টাম নেভিগেশন, বায়োলজিক্যাল ইমেজিং এবং পারমাণবিক স্তরের সেন্সিংয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট এনভি সেন্টারযুক্ত একক স্ফটিক সিভিডি হীরা তৈরি করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স ব্যাঙ্গালোর আর বিভিন্ন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির মত শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণার জন্যে এগিয়ে এসেছে।

সম্প্রতি আইআইটি চেন্নাইতে ইন্ডিয়া সেন্টার ফর ল্যাব গ্রোন ডায়মন্ড তৈরি হয়েছে। ভারতে হীরার গহনা শিল্পের বাইরে উচ্চ প্রযুক্তির উৎপাদনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রক ২৪২ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। এই গবেষণাগারটির মূল লক্ষ্য হল, দেশীয় পদ্ধতিতে সিভিডি হীরা তৈরি করার জন্য রিঅ্যাক্টর, বিশুদ্ধ একক স্ফটিক হীরার বীজ এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী হীরার ব্যবহার।

অত্যাধুনিক ও আধুনিক প্রযুক্তিবিজ্ঞানে কৃত্রিম হীরার যে বিশাল প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে, তা আমাদের অনেকের কাছে অজানা ছিল। নতুন সরকার বিভিন্ন ধরনের শিল্প নিয়ে নতুন নতুন ভাবনা চিন্তা করছে। শিল্পমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, ভাবুন না, এ ধরনের একটা শিল্প পশ্চিমবঙ্গে গড়ে তোলা যায় কিনা? হীরার ঝলক শোরুমের গয়নার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না— তার মধ্যে সুপ্ত প্রতিভার বিশাল ব্যপ্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ বাঙালি হীরার কারিগরদের জীবনেও সেই আলোর দ্যুতি জ্বলে উঠুক।