শুভেন্দুর কৌশলে বদলাচ্ছে বাংলার রাজনীতি৷ বাংলার রাজনীতিতে প্রতীক কখনও শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী চিহ্ন নয়, প্রতীক মানে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সংগঠনের বৈধতা, কর্মীদের আবেগ এবং জনসমর্থনের পরিচয়। সেই কারণেই ‘জোড়াফুল’কে ঘিরে চলা বর্তমান সংঘাত কেবল একটি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের আগামী রাজনৈতিক মানচিত্র নির্ধারণের লড়াই। এই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এনসিপিআই এবং সেই দলের সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক নিয়ে একাধিক জল্পনা। সম্প্রতি দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, কেন্দ্রীয় নেতা ভূপেন্দ্র যাদব এবং এনসিপিআই-র সাংসদদের বৈঠক সেই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বৈঠকের তাৎপর্য তাৎক্ষণিক কোনও দলবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা সেখানে উঠে এসেছে। বিজেপি যে পশ্চিমবঙ্গে আবেগের বদলে পরিকল্পনা ও ধৈর্যের রাজনীতি করছে, সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে।
সূত্রের দাবি, ওই বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী সাংসদদের আশ্বস্ত করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র আজকের রাজনৈতিক অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। সামনে রয়েছে ডিলিমিটেশন বা লোকসভা কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা। সেই পুনর্বিন্যাসের পরে পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা আসনের সংখ্যা বর্তমান ৪২ থেকে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে, এমন রাজনৈতিক মূল্যায়নের কথাও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন আসন সৃষ্টি হলে বর্তমান এনসিপিআই সাংসদদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান বা প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। অর্থাৎ, বিজেপি তাৎক্ষণিক লাভের রাজনীতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থাপত্য নির্মাণের দিকেই নজর দিচ্ছে, এমন বার্তাই বৈঠক থেকে উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।
রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকে এই বার্তার গুরুত্ব অপরিসীম। দলবদলের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয় রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলে বড় নেতা বা সাংসদদের নতুন রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করা সহজ হয় না। সেই সংশয় দূর করতেই শুভেন্দু অধিকারীর এই আশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
গত কয়েক বছরে শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জেলা থেকে দিল্লি, বিধানসভা থেকে সংসদ, প্রতিটি স্তরে দলের শক্তিকে একত্রিত করার চেষ্টা তিনি ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই সাংগঠনিক পরিশ্রমের ফলেই আজ বিভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমি থেকে আসা নেতাদের মধ্যে একটি নতুন সমন্বয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি। একই সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক ধৈর্যও লক্ষণীয়। দলটি এখনও কোনও তাড়াহুড়ো করে এনসিপিআই-কে বিজেপিতে একীভূত করার পথে হাঁটেনি। কারণ তারা বুঝেছে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতা অন্য রাজ্যের তুলনায় ভিন্ন। এখানে মানুষের গ্রহণযোগ্যতা, সংগঠনের বিস্তার এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সব পথ খোলা রেখে পরিস্থিতির বিকাশের অপেক্ষা করাই দলের কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সমীকরণটি সম্পূর্ণ সহজ নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী তিনজন সাংসদের অবস্থান, দলত্যাগ-বিরোধী আইনের বিধান এবং নির্বাচন কমিশনের সামনে থাকা প্রতীক-সংক্রান্ত প্রশ্ন, সব মিলিয়ে এনসিপিআই-এর ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত ‘জোড়াফুল’ প্রতীক কার হাতে যাবে, সেই সিদ্ধান্তই রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যদি বিদ্রোহী শিবির প্রতীকের স্বীকৃতি পায়, তবে বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। আর যদি তা না-ও হয়, তবুও বিজেপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যেই শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে সাংগঠনিক বিস্তার, রাজনৈতিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সমান তালে এগোচ্ছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক সাফল্যের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি নির্মাণ অনেক বেশি কঠিন। বিজেপি সেই কঠিন পথই বেছে নিয়েছে বলে তাদের সমর্থকদের মত। আর শুভেন্দু অধিকারীর ভূমিকা, কেবল বঙ্গ-বিজেপির শীর্ষ নেতা-ই শুধু নয়, তিনি এমন একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের চেষ্টা করছেন, যেখানে বিভিন্ন মত ও পটভূমি থেকে আসা নেতৃত্ব একসঙ্গে কাজ করতে পারেন।শেষ পর্যন্ত এই লড়াই শুধু প্রতীকের নয়, বিশ্বাসেরও। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত একটি আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি করবে, কিন্তু রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বাংলার মানুষ। বিজেপির কৌশল, শুভেন্দু অধিকারীর সাংগঠনিক পরিশ্রম এবং এনসিপিআই-কে ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন সমীকরণ আগামী দিনের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তার উত্তর মিলবে সময়ের হাত ধরেই।
শুভেন্দুর কৌশলে বদলাচ্ছে বাংলার রাজনীতি
CM Suvendu Adhikari At Nabanna (ANI)