চিনি-কথা : যে সাদা দানা পৃথিবী বদলেছিল, আজ তার দাম ঊর্ধ্বমুখী

Sugar Price Hike For Ethanol (Magnific)

আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে মানুষের রসনা নিবারণের জন্য যত রকমের খাবার তৈরি করা হয় তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চিনি দ্বারা সমৃদ্ধ। কয়েক হাজার বছর আগেও ইউরোপ-আমেরিকা জানতই না চিনি বলে কিছু হয়। মধুই ছিল একমাত্র মিষ্টি। অথচ আজ সকালের চায়ে, উৎসবের মিষ্টিতে, কোল্ড ড্রিংক থেকে ওষুধে— চিনি ছাড়া একটা দিনও ভাবা যায় না।
সম্প্রতি সেই চিনিই আবার খবরের শিরোনামে। দেশে চিনির দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে বলে কেন্দ্রীয় সরকার বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফরেন ট্রেড’ (ডিজিএফটি )-এর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত ১০ লক্ষ মেট্রিক টন কাঁচা চিনি শুল্ক-মুক্ত ভাবে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে চিনি আমদানিতে ১০০% শুল্ক লাগে, এবার ‘ট্যারিফ রেট কোটা’ (টিআরকিউ)-তে তা পুরোপুরি মকুব।
এই সিদ্ধান্তের কারণ বাজারে চিনির দাম আগুন। ক্রমবর্ধমান চিনির দাম রান্নাঘরের খরচ বাড়িয়ে তুলছে। এক বছরে এক্স-মিল দাম ৩৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫৪০০-৫৫০০ টাকা প্রতি কুইন্টাল হয়েছে। সরকারের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কম অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, উৎসবের মরসুমের আগে বর্ধিত চাহিদা, আবহাওয়ার কারণে আখের ফসলের ক্ষতি, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ঘাটতি এবং মজুতদারি অন্যতম।
বিশ্লেষকরা ২০২৬-২৭ সালে বিশ্বব্যাপী চিনির ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছেন, যা ২০২৭-২৮ সালে আরও বাড়তে পারে। সামনে গণেশ চতুর্থী, দুর্গাপূজা, দীপাবলি— উৎসবের মরসুমে চাহিদা আরও বাড়বে বলেই সরকার বাল্ক ক্রেতাদের জন্য ১৫ দিনের বেশি স্টক রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু এই সাদা দানার যাত্রা শুরু হয়েছিল কোথা থেকে তা অনেকেরই অজানা।
কিছু গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মতে আখের আদি বাড়ি নিউ গিনি হলেও তাকে চিনিতে পরিণত করার প্রযুক্তি প্রথম আবিষ্কার হয় ভারতেই, প্রায় ২৫০০ বছর আগে। নিউ গিনির মানুষই প্রথম প্রায় ১০ হাজার বছর আগে আখ চাষ শুরু করে। তারা তখনও চিনির দানা বানাতে জানত না, শুধু আখ চুষে মিষ্টি রস খেত। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে এই জ্ঞান পৌঁছয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে ভারতে। সুদূর নিউ গিনি থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে আখ ভারতে কীভাবে প্রবেশ করল তা এখন গবেষকদের গবেষণার বিষয়। প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে আখ চাষ ও এর ব্যবহার সম্পর্কে বিভিন্ন বৈদিক ও আয়ুর্বেদিক গ্রন্থে বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়।
ভারতের উর্বর জমি ও অনুকূল জলবায়ু আখ চাষের জন্য আদর্শ ছিল। প্রথমে এখানেও মানুষ আখ চিবিয়ে রস খেত। কিন্তু প্রায় ৩৫০ খ্রিস্টাব্দে, গুপ্ত যুগে ভারতীয়রাই প্রথম আখের রসকে ফুটিয়ে দানাদার ক্রিস্টালে পরিণত করার কৌশল আবিষ্কার করে। এই আবিষ্কারই চিনিকে বহনযোগ্য ও বাণিজ্যযোগ্য করে তোলে এবং ভারতই প্রথম সারা পৃথিবীকে চিনির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ভারতে ভ্রমণকারী বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা এই পদ্ধতি শিখে চিনে প্রচার করেন। ঐতিহাসিক তথ্য মতে, হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে তাং সম্রাট তাইজং-এর আগ্রহে ভারতীয় দূতরা চিনে আখ চাষের পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন।
সপ্তম শতাব্দীতে আরব বণিকরা ভারত থেকে এই প্রযুক্তি পারস্যে নিয়ে যায়। তারাই ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আখ চাষ শুরু করে। তখন চিনি ছিল বিলাসদ্রব্য— ‘সাদা সোনা’। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে চিনি সরাসরি উৎপাদন করা যেত না। আরব ও ভেনিসীয় বণিকদের মাধ্যমে এশিয়া থেকে সামান্য পরিমাণে চিনি আমদানির কারণে এটি অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। কয়েকটি সূত্র মতে ১৩১৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে লন্ডনে এক পাউন্ড চিনির দাম ছিল প্রায় দুই শিলিং, যা বর্তমান বাজারমূল্যের হিসাবে কেজিতে প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি।
ভারত থেকে মশলার সঙ্গে যখন এই নতুন জিনিস বিদেশে গেল, তখন এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে একে বলা হত নতুন মশলা বা মিষ্টি মশলা। ইউরোপে এর নাম হয়েছিল সুগার সল্ট। ক্রুসেডাররা মধ্যপ্রাচ্য থেকে চিনি ইউরোপে নিয়ে আসে। তারপর কলম্বাস আমেরিকায় পৌঁছতেই ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে শুরু হয় বিশাল
আখের বাগান।
১৭৪৭ সালে জার্মান বিজ্ঞানী আন্দ্রেয়াস মার্গগ্রাফ বিট থেকে চিনি বানানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যা নেপোলিয়নের অবরোধের সময় ইউরোপে আখের জোগান বন্ধ হয়ে গেলে জনপ্রিয় হয়। ব্যাস, চিনি সস্তা হলো, সাধারণ মানুষের নাগালে এলো। এরপর চা-কফির সংস্কৃতি, চকলেট, বিস্কুট, জ্যামের বিপ্লব
শুরু হলো।
চিনি শুধু খাবারের স্বাদ বদলায়নি, বদলে দিয়েছে ইতিহাসের গতিপথ। আজ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম চিনি ভোক্তা এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক। তাই ১০ লক্ষ টন আমদানির এই খবরটা শুধু বাজারদরের খবর নয়, সভ্যতার সেই দীর্ঘ যাত্রারই আরেকটা বাঁক।

তবে বর্তমানে চিনির দাম বৃদ্ধি যথেষ্টই উদ্বেগের বিষয়। বাংলায় চিনি বলতে গেলে তৈরিই হয় না। প্রায় পুরোটাই আনতে হয় মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ বা কর্ণাটক থেকে। চিনির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে, এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে চিনি-ভিত্তিক পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলির ওপর৷ যেমন, মিষ্টি, বিস্কুট এবং অন্যান্য মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরির শিল্প ও উৎপাদনকেন্দ্রগুলি চিনির দাম বৃদ্ধিতে সবচেয়ে প্রভাবিত হবে। উৎসবের মরসুমে দীপাবলি পর্যন্ত মিষ্টির চাহিদা অনেক বেশি থাকে। তাই, মিষ্টির দামও বাড়তে পারে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে টান ধরাবে। এছাড়াও, বেকারি সামগ্রী, চকোলেট এবং আইসক্রিমের সঙ্গে জড়িত মাঝারি ও ছোট আকারের ব্যবসাগুলিও চিনির দাম বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।